বুধবার   ২৬ জুন ২০১৯   আষাঢ় ১২ ১৪২৬  

চাঞ্চল্যকর অডিও ফাঁস

ডিআইজি মিজান দুদক পরিচালককে ঘুষ দেন ৪০ লাখ!

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত : ০১:৪২ পিএম, ১০ জুন ২০১৯ সোমবার

দুই ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হবার পর চলছে নানা আলোচনা।

পুলিশের বিতর্কিত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমান মিজান দাবি করেছেন, ওই অডিও ক্লিপের দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন তিনি নিজে, অন্যজন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির।

 

তিনি অভিযোগ করেছেন, তার বিরুদ্ধে আনা অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তকালে ঘুষ বাবদ ৪০ লাখ টাকা নিয়েছেন এনামুল বাছির।

 

ডিআইজি মিজানের দাবি, গেল ১৫ জানুয়ারি থেকে ২ মে পর্যন্ত দুই দফায় (প্রথমে ২৫ লাখ, পরে ১৫ লাখ) ঘুষের এই টাকা লেনদেন হয়েছে রমনা পার্ক এবং পুলিশ প্লাজায় অবস্থিত ডিআইজি মিজানের স্ত্রীর কাপড়ের দোকানে। তিনি বলেছেন, দুদকের ওই পরিচালক ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেছিলেন। এর মধ্যে অবশিষ্ট ১০ লাখ টাকা ছাড়াও তিনি তার সন্তানের স্কুলে আসা-যাওয়ার জন্য একটি প্রাইভেট কারও চেয়েছেন। দুদকের ওই পরিচালক ঘুষের টাকা ব্যাংকে বেনামি অ্যাকাউন্টে রাখার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেছেন বর্তমানে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত ডিআইজি মিজান।

 

এদিকে ডিআইজির অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে দুদকের অপরাধলব্ধ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির বলেন, ডিআইজি মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের রিপোর্ট আনুমানিক ১৫ দিন আগে জমা দিয়েছি।

 

৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ডিআইজি মিজান আমাকে জড়িয়ে এ ধরনের অভিযোগ করাই তো স্বাভাবিক! কারণ তদন্ত রিপোর্টে তার বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে ওনার খুশি হওয়ার কথা নয়। মামলা করার প্রস্তাব করায় ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি হয়তো এমনটা করেছেন। এ ছাড়া সবাই জানেন, উনি কোন্ প্রকৃতির লোক। ডিআইজি মিজান সাহেব যে অভিযোগ করছেন, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

 

অডিও টেপে দুই ব্যক্তির কথোপকথন শোনা যায়। ডিআইজি মিজানের ভাষ্য, এ দুজনের মধ্যে একজন দুদকের পরিচালক এনামুল বাছির, অন্যজন তিনি নিজে।

সেই কথোপকথনের অংশবিশেষ হলো : প্রথম জন বলছেন, ‘নিয়া আসছেন টাকা? কোন ফর্মে আনছেন? বাজারের ব্যাগে, না?’

অন্যজন জবাব দেন, ‘বাজারের ব্যাগে। ওইটার মধ্যে বই-টইও আছে। আইনের বইয়ের মধ্যে এক হাজার টাকার নোটের বান্ডেল। অত বড় ভলিয়ুম না, টোয়েন্টি ফাইভ তো! ব্যাগে আছে। সমস্যা হবে না।’ ... প্রথম জন - ‘আমি ভাই আপনার ফ্রেন্ডশিপ চাই, এইটাই হইল কথা। বাকিগুলো?’

অন্য জন - ‘না না শোনেন, আর ২৫ লাখ টাকা আমাকে নেক্সট ৮/১০ দিন সময় দিলে আমি ম্যানেজ করে ফেলব।’

প্রথম জন - ‘অতদিন সময় দেওয়া যাবে না।’

অপর জন - ‘কয়দিন সময় দেবেন?’

প্রথম জন - ‘আগামী সপ্তাহে।’

ঘুষের টাকা ব্যাংকে বেনামে রাখতেও তাদের মধ্যে আলোচনা হয় বলে দাবি করেছেন ডিআইজি মিজান। তিনি বলেন, ওই পরিচালক বলেছিলেন, এমন একটা অ্যাকাউন্টে টাকা রাখা দরকার যেখানে আমি নেই বাট আই ক্যান অপারেট। এটা মোটামুটি পারমানেন্ট অ্যাকাউন্টই। এটা ফেক পারসনের নামে ফেক অ্যাকাউন্টও হতে পারে। আপনার মতো যদি আরও কেউ আসে, এ রকম চিপার মধ্যে পড়ি তখন তো আরেকজনের থেকেও আমার নিতে (ঘুষ) হবে। ইন আদার নেম দিয়ে আমি চেকটা সই করলাম। আমার নাম তো দেয়া যাবেই না। মিজান বলেন, এ সময় তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘কার নাম লিখবেন?’ এমন প্রশ্নে পরিচালক নাকি বলেছেন, ব্লাংক থাকবে।

ডিআইজি মিজানের অভিযোগ, এরপর গত ৩০ মে পুলিশ প্লাজায় ডিআইজি মিজানের স্ত্রীর দোকানে যান এনামুল বাছির। সে সময় তিনি জানান, অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এর ভেতরেও (প্রতিবেদন) কিছু পয়েন্ট রাখা হয়েছে। চাপে পড়েই প্রতিবেদন দিতে বাধ্য হয়েছেন দুদকের এ পরিচালক।

 

দুদক সূত্র জানায়, ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ২৫ মে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। দুদক আইনের ২০০৪ সালের ২৬(২), ২৭(১) এবং মানি লন্ডারিং আইনের ২০১২ সালের ৪(২) ধারায় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে এক নারীকে বিয়ে করার অভিযোগে গত ৯ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনারের (ডিআইজি) পদ থেকে মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এক সংবাদ উপস্থাপিকাকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও হত্যার হুমকি দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও ডিআইজি মিজানের নামে-বেনামে শতকোটি টাকার সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ পায় দুদক।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ডিআইজি মিজানের নামে-বেনামে বহু সম্পদ রয়েছে, যা তার আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

নারী নির্যাতনের অভিযোগে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হওয়া পুলিশের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদের তদন্ত শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কিন্তু এই তদন্ত করতে গিয়ে দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিজানুর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কথিত ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি নিয়ে অডিও টেপের সন্ধান মেলে।

অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করছেন এনামুল বাছির। তিনি বলেন, অডিও রেকর্ডটি বানোয়াট। তিনি টাকা-পয়সা নেননি। গত মাসের শেষ দিকে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন এবং মিজানুরের বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ করেছেন।

 

দুদক কর্মকর্তারা জানান, ডিআইজি মিজান পুলিশের উচ্চপদে থেকে তদবির, নিয়োগ, বদলিসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ পায় দুদক। অভিযোগ যাচাইবাছাই শেষে অনুসন্ধানের জন্য ২০১৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি কমিশনের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারীকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়।

 

পরে ফরিদ আহমেদকে বাদ দিয়ে পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়।

এনামুল বাছির অনুসন্ধানকালে ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ১৫ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি রমনাপার্কে ঘুষ নেন বলে তথ্য পেয়েছে কমিশন। পাশাপাশি ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মধ্যে কথোপকথনের তিনটি অডিও রেকর্ড পেয়েছে কমিশন।

 

পুরো অডিও রেকর্ডের কথোপকথন :

 

প্রথম রেকর্ড >

 

ডিআইজি মিজান : ... আপনার জন্য কিছু বই এনেছি, এগুলোয় আইনের বইটই আছে।

 

এনামুল বাছির : ... নিয়া আছেন টাকা .. কোন ফর্মে আনছেন? ... বাজারের ব্যাগে ... না ...

 

ডিআইজি মিজান : ... বাজারের ব্যাগে।

 

এনামুল বাছির : ... এগুলা কি ...

 

ডিআইজি মিজান : ... বই আছে এতে।

 

এনামুল বাছির : ... কী বই?

 

ডিআইজি মিজান : ... আইনের বইটই আছে ... আমি আজকে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আইনের বই কিনলাম ...।

 

এনামু বাছির : ... ও

 

ডিআইজি মিজান : ... বড় ভলিউম না, এই টুয়েন্টি ফাইভতো ... তেমন বড় ভলিউম না, সব এক হাজার টাকার নোট।

 

এনামুল বাছির : ... আচ্ছা।

 

অপর একটি অডিও রেকর্ডে বলা হয়েছে, অনুসন্ধানে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতির কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। চাইলেই কমিশনের অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেন।

 

দ্বিতীয় রেকর্ড >

 

ডিআইডি মিজান : ... কমিশন আমাকে হ্যারেস করছে।

 

এনামুল বাছির : ... জি ইনকোয়ারি রিপোর্ট আমি দেখেছি ... এটা একটা ভুয়া রিপোর্ট। আইওর রিপোর্ট আমি চাইলে কমিশনে দিতে পারি। আমি দিলে অফিসে কোনো কোশ্চেন হয় না। উনারাও (কমিশন) বুঝতেছে আপনাকে ধরা যাবে না।

 

ডিআইজি মিজান : ... জি ধরা যাবে না।

 

এনামুল বাছির : ... আমি আপনার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ চাই। এটা হইলো কথা। বাকিগুলো হইলো ...

 

ডিআআইজি মিজান : ... না না শুনেন, আর ২৫ লাখ টাকা আমাকে নেক্সট ৮-১০ দিন সময় দিলে আমি ম্যানেজ করে ফেলব।

 

এনামুল বাছির : ... এত সময় দেওয়া যাবে না, আগামী সপ্তায় ...

 

ডিআইজি মিজান : আচ্ছা

 

এনামুল বাছির : ... আর হইলো কি, আমার ছেলেটা উইলসে পড়ে ...

 

ডিআইজি মিজান : ... উইলসে পড়ে?

 

এনামুল বাছির : ওরে আনা-নেওয়ার জন্য একটা গাড়ি ...

 

ডিআইজি মিজান : ... গ্যাসের গাড়ি?

 

এনামুল বাছির : ... সকাল ৯টায় স্কুলে দিবে আর দুপুর ১২টায় বাসায় পৌঁছে দিবে, এটাই আমার চাহিদা আর কোনো চাহিদা নাই।

……..

এনামুল বাছির : ... এমন একটা অ্যাকাউন্টে রাখা দরকার যেখানে আমি বাট আই কেন অপারেট হেয়ার। এটা মোটামুটি একটা পারমান্যান্ট অ্যাকাউন্ট যেটা আমি ...। কারণ আপনার মতো আরও কেউ তো আসতে পারে।

 

ডিআইজি মিজান : ... জি

 

এনামুল বাছির : ...আমি বলতে চাইছি সেটা না, আপনার মতো যদি এ রকম চিপার মধ্যে পড়ি, তখনতো আরেকজনের কাছ থেকেও আমার নিতে হবে।

 

ডিআইজি মিজান : ... হা-হা-হা

 

এনামুল বাছির : ... চেকটা আমি সই করলাম

 

ডিআইজি মিজান : ...হ্যাঁ, হ্যাঁ

 

এনামুল বাছির : ... ইন আদার নেইম, দিয়ে আমি চেকটা সই করলাম, মনে করেন এটা ফেইক অ্যাকাউন্ট, ফেইক পারসনের হতে হবে।

 

ডিআইজি মিজান : ... আপনার নাম লিখে দিলে হবে

 

এনামুল বাছির : ... আমার নামতো লেখাই যাবে না

 

ডিআইজি মিজান : ... কার নাম থাকবে তাহলে?

 

এনামুল বাছির : ... ব্ল্যাঙ্ক থাকবে

 

ডিআইজি মিজান : ... ওকে ওকে ... ব্ল্যাঙ্ক

 

এনামুল বাছির : ... যার নামই থাকবে বেয়ারার গিয়ে নিয়ে আসবে অ্যাকাউন্ট থেকে।

 

তৃতীয় অডিও রেকর্ড >

 

এনামুল বাছির : ... অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে ... এর ভেতরেও কিছু পয়েন্ট রেখেছি। চেয়ারম্যান এবং কমিশনারের চাপে বাধ্য হয়েছি। এ রকম একটা রিপোর্ট।

 

ডিআইজি মিজান : ... মামলা কেন হবে? আপনি তো বললেন ....

 

এনামুল বাছির : ... আপনি একটা জিনিস বোঝেন! আমি কিন্তু এক সপ্তাহের বেশি সময় আগে রিপোর্ট দিছি। কোনো মিডিয়ায় কি কোনো কথা আসছে? আপনি যদি চান ওসব (ঘুষের টাকা) ফেরত নিতে পারেন।

 

ডিআইজি মিজান : ... দরকার নাই

 

এনামুল বাছির : ... আমি যখন চেয়ারম্যানকে বললাম, চেয়ারম্যান মানে পারে ... তো আমাকে মেরেই ফেলবে।