শনিবার   ১৬ নভেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ১ ১৪২৬  

ছোট নবনীতাকে বড় নবনীতার শুভেচ্ছা 

নবনীতা চক্রবর্তী

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত : ১০:৫৭ এএম, ৮ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

বাসন্তী দেবী কলেজের ঠিক উল্টো দিকে সোজা রাস্তা ধরে হেঁটে গেলে হাতের ডান দিকে একটা কদম গাছ। গাছের কাছ ঘেঁষেই  "ভালোবাসা"। 
ঘড়িতে তখন চারটে বেজে পঞ্চাশ। দেবলীনা দিদির জন্য অপেক্ষা করছি। দিদি এলেই প্রবেশ করব ভালোবাসার " ভালোবাসা"তে। 
মনে তখন উঁকিঝুঁকি মারছে নানান কথা। কখনো হয়ত শতেক বচনের বচনগুলো মনে পড়ছে, কখনো হয়তো সীতা থেকে শুরুর দু-একটি গল্পের কথা মনে করে অজান্তেই হেসে উঠছি। আবার কখনো ভাবছি সই-এর অনুষ্ঠানে কেমন হবে তার কথা। সব আকাশ পাতাল ভাবনা। সবটা কেমন খেই হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে নবনীতা ডাক শুনতেই চমকে ফিরে তাকাতেই দেখি দিদি (দেবলীনা) হাসি হাসি মুখে গাড়ি থেকে আমায় ডাকতে ডাকতে নামছেন। 
"হ্যাঁ গো নবনীতা দিদি তো বাড়িতে, তাকে এই রাস্তা থেকে ডাকলে শুনবে নাকি " - বাড়ির সামনের ফুলওয়ালির কথা শুনে দেবলীনা দিদি আর আমি দুজনেই হেসে কুটিপাটি। পরে দেবলীনা দিদি বলল ওর নামও নবনীতা। বেচারার চেহারা দেখে মনে হল, এই পুঁচকে ছুড়ির নামও নবনীতা, ছ্যা ছ্যা। 
সে যাই হোক আমরা পা বাড়ালাম বিখ্যাত লেখিকা নবনীতা দেবসেন এর "ভালোবাসা"র বাড়িতে। যার লেখা পড়েছি, রেফারেন্স হিসেবে নিয়েছি, অনুষ্ঠানে দেখেছি, কথা শুনেছি আজ তার সাথে একান্ত সাক্ষাৎ পেতে চলেছি। শুধু সাক্ষাৎ বললে ভুল হবে সামনে "সই" ( মেয়েদের নিয়ে করা তার একটি পত্রিকা) এর অনুষ্ঠান, সেটার রিহার্সাল। কে কি করবে, কিভাবে করবে, তার লেখার কোন অংশ পাঠ করবে, সেটা উনি দেখবেন। আমার কাজ হল মিউজিক করা। কেমন জানি ঘোর ঘোর লাগছে। গায়ে চিমটি কেটে দেখলাম স্বপ্ন দেখছি নাতো! 
প্রথমে বসবার ঘরে বসলাম, ঘর তো নয় আস্ত লাইব্রেরি। এত পরিপাটি আর রুচিশীল বলার কথা নয়। যাই হোক আর কিছু পরেই ওপরতলা থেকে ডাক এলো। 
উনার অসুস্থতার খবর আগেই জানতাম। তখন নিয়মিত কেমোথেরাপি চলছিলো। নিচে নামতে অসুবিধে। আমরা ওপরে উঠে এলাম। এসেই ডাইনিং চেয়ারে বসলাম। সবাই গল্প করছে। টুকটাক স্মৃতিচারণ হচ্ছে। তবে বেশিরভাগ কথাই গল্প কবিতা নিয়ে। আমি ভাবছি এর মধ্যে রিহার্সালটা হবে কোথায়? উনি অসুস্থ মানুষ তার সামনে এমন হুল্লোড় করা কি ঠিক হবে! এই সাত পাচঁ ভাবতে ভাবতেই নবনীতা দেবসেন দরজা খুলে ডাইনিং-এ এসে দাড়াঁলেন। আমি ভীষণ বিস্ময়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছি। ক্যান্সার রোগী দেখবার অভিজ্ঞতা থেকেই একটি ধারনা ছিল রোগে জরাগ্রস্থ একটি মানুষকে হয়ত দেখতে হবে। কিন্তু সমস্ত ধারণাকে ফেল করিয়ে দিয়ে সেই একরাশ চুল খোলা, কপালে বড় লাল টিপ পরা, মুখে ঝকঝকে হাসি নিয়ে নবনীতা এসে দাঁড়ালেন। সারা মুখে কোথাও এতটুকু মলিনতা নেই । আমি কিছু বুঝে উঠবার আগেই আমার পাশে চেয়ারটা টেনে বসলেন। কথা বলতে লাগলেন। দেখে কে বলবে রাজরোগ তার শরীরে। নবনীতা দেবসেনরা বুঝি এমনই হন। কোন ক্লান্তি, জরা, দহন তাদের স্পর্শ করে না। 
আমাদের রিহার্সাল শুরু হলো। রিহার্সালের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের সাথে বসে হালুয়া আর চা খেলেন। আমি আর কি রিহার্সাল করব। কেল্টুসের ( নবনীতা দিদির আদরের পোষ্য কুকুর) ভয়ে আমি কাঁটা হয়ে রয়েছি। সে টেবিলের নিচ দিয়ে ঘোরাফেরা করছে। আমি পা গুটিয়ে চেয়ারে তুলে বসেছি। কাউকে বলতেও পারছি না। আর ভুল করে চলেছি সমানে। 
নবনীতা দিদিই যেন প্রথম বুঝলেন। বুঝে কেল্টুসকে বকা দিয়ে নিজের কাছে রাখলেন। সারাটা সময় ওকে কাছে রেখেছেন। আমায় বললেন, আর ভুল করনা কিন্তু। নয়তো কেল্টুসকে ডেকে দেব। 
তারপর জুড়ে দিলেন গপ্পো। মাথায় উঠলো রিহার্সাল। গল্প শুরু করলে তা যেন শেষ করতে চাইতেন না। ভুলে যেতেন তার বেশি কথা বলা বারণ। আর কি যে মন দিয়ে কথা শুনতে পারেন। বাধা নিষেধের মধ্যে অনেক কথা হলো তাঁর সাথে। বাংলাদেশের অনেক গল্প করলেন, বিশেষ করে বললেন তার দুই প্রিয় বন্ধু সেলিনা হোসেন আর শামসুজ্জামান স্যারের কথা। এত কথা হয়তো লিখে শেষ করা যায় না।। উনার লেখা একটি বই নিয়ে গিয়েছিলাম, আসবার সময় বললাম, এই স্মৃতিটুকু ধরে রাখতে চাই, সোৎসাহে বইয়ে লিখে দিলেন,
" ছোট নবনীতাকে
বড় নবনীতার শুভেচ্ছা "। 
এত সহজ সরল ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ বড়ই অমূল্য। বড় অমূল্য তাঁর দেখা, তাঁর সান্নিধ্য।
বড্ড বেশি মনে পড়ছে আপনাকে। মনে হচ্ছে এই বুঝি আপনি এসে বসবেন, গল্প জুড়ে দেবেন সমস্ত ক্লান্তিকে ছুড়ে ফেলে, আপনার প্রাণখোলা হাসিতে স্নিগ্ধ হয়ে উঠবে চারপাশ, আর আমরা আন্দোলিত হব বারংবার।
ভালো থাকুন নবনীতা দেবসেন,
ভালো থাকুন মিতা।।