ঢাকা, ০২ অক্টোবর শুক্রবার, ২০২৬ || ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
good-food
১১

গয়না ছাড়াও যেসব কাজে ব্যবহার হয় সোনা

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:৩৭ ২ অক্টোবর ২০২৬  

‘সোনা মানেই গহনা’ সাধারণ মানুষের ধারণা মূলত এই গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিয়ে, উৎসব বা সাজসজ্জা মানেই হলুদ ধাতুর ঝলক এটাই চিরন্তন দৃশ্য। কিন্তু আপনি কি জানেন, ঝিলমিল করা এই মূল্যবান ধাতুটির আসল কারুকাজ কেবল অলংকারেই আটকে নেই? আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, চিকিৎসা খাত থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা পর্যন্ত মানবসভ্যতার এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে সোনার নিরব উপস্থিতি নেই।

সোনা কেবল একটি মূল্যবান সম্পদ বা আভিজাত্যের প্রতীকই নয়, বরং এর অনন্য কিছু ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি আজ আধুনিক প্রযুক্তির এক অপরিহার্য উপাদান।

কেন সোনা এত বহুমুখী?

সোনা ব্যবহারে মানুষের এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে এর চমৎকার কিছু বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য। সোনা অত্যন্ত নমনীয় ও প্রসারণীয় ধাতু, যা সহজে বায়ুর সংস্পর্শে নষ্ট হয় না বা মরিচা ধরে না। সবচেয়ে বড় কথা, এটি বিদ্যুৎ ও তাপের অন্যতম সেরা পরিবাহী। তামা বা রূপার মতো সোনা সহজে ক্ষয় বা নষ্ট হয় না বলেই আধুনিক শিল্পকারখানায় এর চাহিদা আকাশচুম্বী। চলুন জেনে নেওয়া যাক, গহনার বাইরে ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে সোনা তার জাদুকরী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে:

বিলাসবহুল রন্ধনশিল্পে ‘এডিবল গোল্ড’ 

খাবারেও যে সোনা ব্যবহার করা যায়, তা হয়তো অনেকেরই অজানা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে খাওয়ার উপযোগী বিশেষ ধরনের সোনা বা ‘এডিবল গোল্ড’  ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। উচ্চবিত্তদের ভোজনবিলাস বা আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে আজকাল বিশ্বের নামিদামি রেস্তোরাঁয় খাবার ও পানীয়তে সোনার ব্যবহার বেশ জনপ্রিয়।

খাবারে ব্যবহৃত এই সোনা অত্যন্ত পাতলা পাত, ফ্লেকস বা গুঁড়ার আকারে তৈরি করা হয়। সাধারণত দামি কেক, পেস্ট্রি, আইসক্রিম, সুস্বাদু ককটেল, শ্যাম্পেন বা বিখ্যাত কোনো বিশেষ ডিসের ওপর সোনার এই মিহি আস্তরণ বা ফ্লেকস ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এটি শরীরের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাদহীন, কারণ এটি জৈবিকভাবে নিষ্ক্রিয় অর্থাৎ এটি হজম হয় না বা শরীরে কোনো বিক্রিয়াও করে না, কেবল চোখের তৃষ্ণা ও আভিজাত্য বাড়াতে এটি ব্যবহার করা হয়। (অবশ্য গহনার সোনা বা সাধারণ সোনা খাওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক, এর জন্য বিশেষভাবে পরীক্ষিত ফুড-গ্রেড সোনা ব্যবহার করা হয়)।

আধুনিক ইলেকট্রনিকস ও স্মার্ট ডিভাইস

আপনার হাতে থাকা স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট কিংবা ঘরের এলইডি টেলিভিশন সবকিছুতেই রয়েছে সোনার ব্যবহার। শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে, বর্তমান বিশ্বের মোট উৎপাদিত সোনার ১০ থেকে ১২ শতাংশ ব্যবহৃত হয় ইলেকট্রনিকস শিল্পে। ফোন বা কম্পিউটারের ভেতরের মাইক্রোচিপ, প্রসেসর, সিম কার্ড, ক্যামেরা সেন্সর এবং বিভিন্ন কানেক্টরে সূক্ষ্ম তার বা আস্তরণ হিসেবে সোনা ব্যবহার করা হয়। কারণ, সোনা অতি দ্রুত ও নিরাপদে ডেটা বা বিদ্যুৎ সংকেত পরিবহন করতে পারে এবং এতে কখনো জং ধরে না। সোনা ব্যবহার করা না হলে আমাদের প্রিয় ডিভাইসগুলো এত দীর্ঘস্থায়ী ও দ্রুতগতির হতো না।

চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ডেন্টাল কেয়ার

মানবদেহের চিকিৎসায় সোনার ব্যবহার বেশ প্রাচীন এবং দিন দিন এর পরিধি বাড়ছে। দন্ত চিকিৎসায় দাঁতের ক্রাউন, ব্রিজ বা ফিলিংয়ের কাজে বহু বছর ধরে সোনা ব্যবহার করা হচ্ছে কারণ এটি মানবদেহের টিস্যুর সঙ্গে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং বিষাক্ত নয়।
এছাড়া হৃদরোগীদের ‘পেসমেকার’-এর মতো জীবন রক্ষাকারী মেডিকেল ডিভাইসে সংযোগ রক্ষায় সোনার তার ব্যবহার করা হয়। এমনকি আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসায় (ন্যানোটেকনোলজি) সোনার অতি ক্ষুদ্র কণা বা ন্যানো পার্টিকেল ব্যবহার করে টিউমার বা ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার সফল গবেষণা চলছে।

মহাকাশ গবেষণা ও উপগ্রহ

মহাকাশের চরম প্রতিকূল পরিবেশ থেকে নভোচারী ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি রক্ষা করতে সোনার জুড়ি মেলা ভার। মহাশূন্যে প্রচণ্ড সূর্যরোদ ও ক্ষতিকর মহাজাগতিক রশ্মি থেকে মহাকাশযান এবং স্যাটেলাইটকে রক্ষা করতে এর গায়ে সোনার খুব পাতলা ফয়েল বা আস্তরণ ব্যবহার করা হয়।

মহাকাশচারীদের হেলমেটের ভাইজারেও (মুখের সামনের কাঁচ) সোনার পাতলা প্রলেপ দেওয়া থাকে, যা সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মিকে প্রতিফলিত করে চোখকে সুরক্ষিত রাখে। বিখ্যাত ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’-এর বড় আয়নাগুলোও সোনা দিয়ে প্রলেপযুক্ত করা হয়েছে, যাতে ইনফ্রারেড রশ্মি নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হতে পারে।

উন্নত কাচ ও জানালার আস্তরণ

বড় বড় আধুনিক অট্টালিকা এবং বিশেষ কিছু বিলাসবহুল গাড়ির কাচে সোনার অতি সূক্ষ্ম প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। এটি দেখতে চমৎকার লাগার পাশাপাশি সূর্যের তাপ ও ইনফ্রারেড রশ্মি ভেতরে প্রবেশ করতে বাধা দেয়। ফলে গরমের দিনে ঘরের ভেতর ঠান্ডা থাকে এবং শীতের দিনে ভেতরের তাপ বাইরে বের হতে পারে না, যা এনার্জি বা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে দারুণ কার্যকরী।

শিল্প ও মহাকাশ প্রযুক্তির লুব্রিকেন্ট

মহাকাশের মতো চরম তাপমাত্রার পরিবেশে সাধারণ তেল বা গ্রিজ কাজ করে না, জমে বা শুকিয়ে যায়। তাই মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ কমাতে এবং মসৃণ রাখতে অনেক সময় অত্যন্ত সূক্ষ্ম সোনার পাউডার বা লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা হয়।

সোনাকে আমরা মূলত সম্পদ হিসেবেই বেশি মূল্যায়ন করি। কিন্তু একটু গভীরভাবে খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমাদের হাতের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে মাথার ওপর মহাকাশে ঘুরতে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ সবকিছুর ভেতরেই লুকিয়ে আছে এই সোনালি ধাতুর অবদান। গহনার বাক্সবন্দি রূপ ছাড়িয়ে সোনা আজ হয়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতার প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অন্যতম এক চালিকাশক্তি।