ঢাকা, ০৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ২০ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৪

রঙিন আতশবাজির পেছনের বিজ্ঞান

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০২:০৭ ৫ নভেম্বর ২০২৬  

অন্ধকার রাতের আকাশে হঠাৎ বিকট এক শব্দ, আর চোখের পলকেই চারপাশ ভেসে যায় লাল, নীল, সবুজ কিংবা সোনালি আলোর রোশনাইয়ে। কোনো উৎসব, নতুন বছর বরণ কিংবা খেলাধুলার বড় কোনো আসরে আতশবাজির ঝলকানি ছাড়া এখন যেন পূর্ণতাই আসে না। চোখের নিমেষে মিলিয়ে যাওয়া এই মোহনীয় আলোর মেলা দেখতে যতটা সহজ মনে হয়, এর তৈরির পেছনের কারিগরি ঠিক ততটাই জটিল। মূলত রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের নিখুঁত প্রকৌশলেই রাতের আকাশ সাজে রঙের মায়ায়।

যেভাবে শুরু হয়েছিল ইতিহাস

আতশবাজির ইতিহাসের সূচনা প্রাচীন চীনে, প্রায় দুই হাজার বছর আগে। সে সময় বাঁশের নলের মধ্যে কাঠকয়লা, গন্ধক (সালফার) ও পটাশিয়াম নাইট্রেটের মিশ্রণে তৈরি বারুদ ভরে আগুনে ছুড়ে দেওয়া হতো অশুভ শক্তি তাড়াতে। তবে সেই প্রাচীন আতশবাজিতে কেবল বিকট শব্দ আর ধোঁয়া ছাড়া রঙের কোনো উপস্থিতি ছিল না। উনিশ শতকে এসে ইউরোপীয় রসায়নবিদদের হাত ধরে বিভিন্ন ধাতব যৌগ ব্যবহারের মাধ্যমে আতশবাজিতে বৈচিত্র্যময় রঙের বিপ্লব ঘটে।

একটি এরিয়াল শেলের ভেতর যা থাকে

আকাশে গিয়ে যেসব আতশবাজি রঙিন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, সেগুলোকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘এরিয়াল শেল’। দেখতে এটি সাধারণত ছোট কামানের গোলা বা চোঙাকৃতির হয়ে থাকে। এর ভেতরে থাকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

লিফট চার্জ: শেলের একদম নিচে থাকে গানপাউডার বা সাধারণ বারুদের স্তর। এতে আগুন দেওয়ার পর দ্রুত উৎপন্ন হওয়া গ্যাসের ধাক্কায় পুরো শেলটি রকেটের মতো তীব্র গতিতে কয়েকশ ফুট ওপরে উঠে যায়।

টাইম ডিলে ফিউজ: এটি একটি সময়নিয়ন্ত্রিত পলিতা। শেলটি মাটি থেকে ঠিক কতটা উঁচুতে ওঠার পর বিস্ফোরিত হবে, তা নির্ধারণ করে এই ফিউজ। ফলে মাটিতে নয়, আকাশেই ঘটে বিস্ফোরণ।

বার্স্টিং চার্জ: শেলের কেন্দ্রস্থলে থাকে এই বিস্ফোরক অংশ। আকাশচূড়ায় পৌঁছানোর পর ফিউজের আগুন এখানে পৌঁছামাত্র মূল বিস্ফোরণটি ঘটে।

স্টারস: আতশবাজির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এই ‘স্টার’। মার্বেল বা ছোট ছোলার দানার আকৃতির এই পিণ্ডগুলোই মূলত রাতের আকাশে ছড়িয়ে গিয়ে বর্ণিল আলো তৈরি করে।

রঙের আসল রসায়ন

বিস্ফোরণের পর কোন আলো ফুটবে, তা নির্ভর করে স্টারগুলোর মধ্যে কোন ধাতুর লবণ বা যৌগ মেশানো হয়েছে তার ওপর। আগুনের তাপে ধাতব পরমাণুর ইলেকট্রনগুলো অতিরিক্ত শক্তি গ্রহণ করে এবং পরক্ষণেই সেই শক্তি নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যের রঙিন আলো হিসেবে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন রঙের জন্য নির্দিষ্ট ধাতুর ব্যবহার করা হয়।

লাল: স্ট্রনশিয়াম কার্বনেট বা স্ট্রনশিয়াম নাইট্রেট ব্যবহারে গাঢ় লাল আলো পাওয়া যায়।

কমলা: ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড বা ক্যালসিয়াম সালফেট তৈরি করে চমৎকার কমলা রং।

হলুদ: সোডিয়াম নাইট্রেট বা খাবার লবণের মতো সাধারণ সোডিয়াম যৌগ থেকে আসে তীব্র হলুদ আভা।

সবুজ: বেরিয়াম নাইট্রেট বা ক্লোরাইডের দহনে ফুটে ওঠে উজ্জ্বল সবুজ আলো।

নীল (সবচেয়ে কঠিন রং): আতশবাজির জগতে নীল রং তৈরি করা বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর জন্য তামার যৌগ (কপার ক্লোরাইড) ব্যবহার করা হয়। তাপমাত্রা সামান্য এদিক-সেদিক হলে নীল রং নষ্ট হয়ে সাদা বা বিবর্ণ হয়ে যায়।

বেগুনি: লাল সৃষ্টিকারী স্ট্রনশিয়াম এবং নীল সৃষ্টিকারী তামার যৌগের সুনির্দিষ্ট মিশ্রণে তৈরি হয় মায়াবী বেগুনি আলো।

সোনালি ও রূপালি ঝলক: ম্যাগনেসিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম বা টাইটানিয়ামের গুঁড়ো পোড়ালে ঝিলমিল করা রূপালি বা উজ্জ্বল সাদা আলো তৈরি হয়। লোহার কণা পোড়ালে দেখা যায় সোনালি আলোর ফুলকি।

আকাশে তৈরি নানা নকশা ও শব্দ

কখনও আকাশে ফুটে ওঠে ফুল, কখনো হৃদয়, আবার কখনো বৃত্তাকার বলয়। শেলের ভেতরে বিভিন্ন রঙের স্টারগুলোকে যেভাবে সাজিয়ে রাখা হয়, ঠিক সেই নকশাতেই সেগুলো আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি আতশবাজির সাঁই সাঁই শব্দ বা শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ রাসায়নিক গ্যাস ও বায়ুচাপের কৌশল।

ক্ষণিকের আলোর খেলা মনে হলেও একটি সফল ও নিরাপদ রঙিন আতশবাজির পেছনে কাজ করে শতভাগ নিখুঁত রাসায়নিক পরিমাপ। সামান্য ভুল হলে কেবল রঙই নষ্ট হয় না, ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও। তাই আতশবাজির রোশনাই কেবল আনন্দের উৎস নয়, এটি মানুষের বৈজ্ঞানিক সৃজনশীলতার এক অপূর্ব নিদর্শন।