ঢাকা, ০৩ নভেম্বর মঙ্গলবার, ২০২৬ || ১৮ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৩

কেউ দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন, আবার কারও দেরি হয়: নেপথ্যে কী

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০৪:১১ ৩ নভেম্বর ২০২৬  

আপনার পরিচিত এমন কেউ হয়তো আছেন, যিনি বালিশে মাথা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েন। তাকে দেখে হয়তো ভাগ্যবান মনে হতে পারে। আবার অনেকে আছেন, যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেন, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় কাটান। কিন্তু এই পার্থক্যের কারণ কী? 

সহজ কথায়, ঘুম আসা নির্ভর করে আপনার শরীর কতটা ক্লান্ত, মন কতটা শান্ত এবং আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি (body clock) কতটা সুসংহত তার ওপর। দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া সবসময় ভালো লক্ষণ নয়; এটি ‘স্লিপ ডেট’ বা ঘুমের ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে। 

মানুষ কেন দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে?

ঘুম আসা নির্ভর করে আপনার শরীর কতটা ক্লান্ত, মন কতটা শান্ত এবং আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি কতটা সুসংহত তার ওপর। কারও কারও ক্ষেত্রে ঘুমের তাড়না (sleep drive) খুব প্রবল থাকে এবং ঘুমানোর সময় তাদের মন শান্ত থাকে। আবার অনেকের শরীর বা মস্তিষ্ক এমন অবস্থায় থাকে যে, যখন তাদের বিশ্রাম নেওয়ার কথা, তখনও তারা সজাগ বা সতর্ক থাকে।

ঘুমাতে কত সময় লাগা স্বাভাবিক?

প্রায় ১০ থেকে ২০ মিনিট: অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য এটি স্বাভাবিক।
৫ মিনিটের কম সময়: এটি প্রায়শই ‘স্লিপ ডেট’ বা ঘুমের ঘাটতির লক্ষণ; অর্থাৎ ঘুম খুব একটা ভালো হচ্ছে না।
নিয়মিত ৩০ মিনিটের বেশি সময় লাগা: এটি ঘুমের কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

২০২৩ সালে ‘স্লিপ মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি মেটা-বিশ্লেষণে ১১০টি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক দলের ওপর একটি গবেষণা চালানো হয়, যেখানে দিনের বেলা ঘুমানোর (nap test) বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, ঘুমাতে যাওয়ার পর ঘুম আসতে গড়ে প্রায় ১২ মিনিট সময় লাগে।

গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া (খুব কম ‘স্লিপ ল্যাটেন্সি’) দিনের বেলা অতিরিক্ত তন্দ্রাচ্ছন্নতার ইঙ্গিত দেয়। ‘স্লিপ ল্যাটেন্সি’ (sleep latency) বলতে মূলত ঘুমাতে যাওয়ার পর ঘুম আসতে যে সময় লাগে, তাকেই বোঝায়।

কেন কেউ কেউ কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েন?

প্রবল ঘুমের তাড়না (High sleep pressure): আপনি যত দীর্ঘ সময় জেগে থাকেন, মস্তিষ্কে ‘অ্যাডেনোসিন’ (adenosine) নামক রাসায়নিক উপাদান তত বেশি জমা হয়, যা আপনাকে ঘুমকাতুরে করে তোলে।
‘স্লিপ ডেট’ বা ঘুমের ঘাটতি: দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব থাকলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ে।

শারীরিক ক্লান্তি: সারাদিনের কঠোর পরিশ্রম বা শরীরচর্চা দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে।

শান্ত মন: মানসিক চাপ কম থাকলে মস্তিষ্ক দ্রুত বিশ্রাম নেওয়ার অবস্থায় চলে যেতে পারে।

সুশৃঙ্খল রুটিন: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে (body clock) প্রশিক্ষিত করে তোলে।

জিনগত কারণ ও বয়স: কিছু মানুষ প্রাকৃতিকভাবেই খুব দ্রুত এবং কার্যকরভাবে ঘুমাতে পারেন। শিশু এবং তরুণ-তরুণীদের ক্ষেত্রে খুব দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়।

দ্রুত ঘুমিয়ে পড়া কি সবসময় স্বাস্থ্যকর?

না। যদি আপনি প্রায় প্রতি রাতেই এক-দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন এবং দিনের বেলাও ঝিমুনি অনুভব করেন, তবে হতে পারে আপনার পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে না। হঠাৎ করে ঘুমিয়ে পড়া, বিশেষ করে দিনের বেলায় কোনো কাজ করার সময়, ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ (sleep apnoea) বা ‘নারকোলেপসি’ (narcolepsy)-এর মতো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। আপনার ক্ষেত্রে এমনটা ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

কেন কিছু মানুষের ঘুমাতে সমস্যা হয়?

মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত চিন্তাভাবনা এর প্রধান কারণ। উদ্বেগ শরীরে কর্টিসল এবং অ্যাড্রেনালিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা মস্তিষ্ককে সজাগ বা সতর্ক রাখে।

গবেষণাও এটি সমর্থন করে। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকিয়াট্রি’ (Frontiers in Psychiatry) জার্নালে ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইতিবাচক বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করাও (positive rumination) ঘুমের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি আনন্দদায়ক বা উত্তেজনাকর চিন্তাও আপনার মনকে জাগিয়ে রাখতে পারে।

অন্যান্য সাধারণ কারণ

শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির (body clock) অসামঞ্জস্য: যারা রাত জাগতে পছন্দ করেন (night owls), তাদের অনেক রাত পর্যন্ত ঘুম নাও আসতে পারে।

ক্যাফেইন: এটি অ্যাডেনোসিন (adenosine) নামক রাসায়নিকের কার্যকারিতা আটকে দেয় এবং দীর্ঘ সময় শরীরে থেকে যায়।

অনিয়মিত সময়সূচী: সপ্তাহান্তে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা বা শিফট অনুযায়ী কাজ করা শরীরের স্বাভাবিক ঘড়িকে বিভ্রান্ত করে ফেলে।

দিনের বেলায় দীর্ঘক্ষণ ঘুমানো (naps): এটি রাতের ঘুমের চাহিদাকে কমিয়ে দেয়।
ভারী রাতের খাবার, অ্যালকোহল বা নিকোটিন: অ্যালকোহল হয়তো সাময়িকভাবে ঝিমুনি আনতে পারে, কিন্তু এটি পরবর্তীতে ঘুমের মান নষ্ট করে।

অস্বস্তিকর পরিবেশ: ঘরের তাপমাত্রা, অতিরিক্ত শব্দ বা আলো ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে।
ঘুমের জন্য অতিরিক্ত চেষ্টা করা: ঘুম না আসার দুশ্চিন্তা মস্তিষ্ককে আরও বেশি সজাগ করে তোলে।

কী ধরনের শারীরিক সমস্যার কারণে ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে?

* উদ্বেগ (anxiety), বিষণ্ণতা (depression) এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ।
* স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম (পা অস্থির লাগা) এবং দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক ব্যথা।
* থাইরয়েড সংক্রান্ত সমস্যা, বিশেষ করে অতিরিক্ত সক্রিয় থাইরয়েড (overactive thyroid)।

* অ্যাসিড রিফ্লাক্স (বুক জ্বালাপোড়া) এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা।
* হরমোনের পরিবর্তন, যেমন পেরিমেনোপজ (menopause-এর আগের পর্যায়) এবং গর্ভাবস্থা।
* কিছু ওষুধ, যার মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, স্টেরয়েড এবং ডিকনজেস্ট্যান্ট (নাক বন্ধ হওয়া কমানোর ওষুধ)।

কীভাবে দ্রুত ঘুমানো যায়?

* প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন, এমনকী ছুটির দিনগুলোতেও।
* সকালের সূর্যের আলো গায়ে লাগান এবং দিনের বেলা সক্রিয় থাকুন।
* ঘুমানোর অন্তত ছয় থেকে আট ঘণ্টা আগে ক্যাফেইন গ্রহণ বন্ধ করুন।

* ঘুমানোর ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ঘরের আলো কমিয়ে দিন এবং মোবাইল, কম্পিউটার বা টিভির স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।
* আপনার শোবার ঘরটি ঠান্ডা, অন্ধকার এবং শান্ত রাখুন। উষ্ণ পানিতে গোসল করা, বই পড়া বা ধীরগতিতে শ্বাস নেওয়ার মতো বিষয়গুলো চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

* সন্ধ্যাবেলাতেই আপনার দুশ্চিন্তার বিষয়গুলো লিখে রাখুন।
* ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাওয়া বা অ্যালকোহল পান করা থেকে বিরত থাকুন।
* বিছানাটি কেবল ঘুমানোর জন্যই ব্যবহার করুন।

* যদি ২০ মিনিট পার হওয়ার পরও জেগে থাকেন, তবে বিছানা থেকে উঠে পড়ুন; মৃদু আলোয় শান্ত কোনো কাজ করুন এবং ঘুম পেলে আবার বিছানায় ফিরে আসুন।
* বারবার ঘড়ির দিকে তাকাবেন না।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর