ঢাকা, ৩১ অক্টোবর শনিবার, ২০২৬ || ১৫ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৫

ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিকের জন্মশতবর্ষ

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২৩:৩৫ ৩০ অক্টোবর ২০২৬  

ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ ও জগন্নাথ কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী রফিক উদ্দিন আহমেদের জন্মদিন আজ। ৩০ অক্টোবর ১৯২৬ সালের এই দিনে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার পারিল বলধারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান এই তরুণ। ভাষার জন্য তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে রচিত হয় বাঙালির ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

রফিক উদ্দিন আহমেদ ছিলেন তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। তার স্মৃতি ধরে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ভবনের নামকরণ করা হয়েছে ‘ভাষাশহীদ রফিক ভবন’। বর্তমানে ভবনটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

১৯৪৯ সালে স্থানীয় বায়রা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন রফিক। পরে মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। তবে পারিবারিক প্রয়োজনে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে ঢাকায় এসে বাবার মুদ্রণশিল্পের ব্যবসায় যুক্ত হন। পাশাপাশি জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনা শুরু করেন। ভাষার দাবিতে আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তিনি সক্রিয়ভাবে এতে যুক্ত হন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভেঙে মিছিল বের করেন। সেই আন্দোলনে অংশ নেন রফিকও। মিছিলটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্রাবাস এলাকায় পৌঁছালে পুলিশ গুলি চালায়। এসময় পুলিশের একটি গুলি সরাসরি তার মাথায় লাগে। এতে তার মাথার খুলি চূর্ণ হয়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই শহীদ হন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৫ বছর।

মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসের ১৭ নম্বর কক্ষের পূর্ব পাশে পড়ে ছিল রফিকের নিথর দেহ। তার মাথার খুলি উড়ে গিয়ে মস্তিষ্কের অংশ ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশে। আন্দোলনকারীরা তার মরদেহ উদ্ধার করে অ্যানাটমি হলের পেছনের বারান্দায় নিয়ে যান। পরে পুলিশ মরদেহটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়।

ভাষাশহীদ রফিকের মরদেহের ছবি তোলার ঘটনাটিও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের আলোকচিত্রী আমানুল হক পুলিশের কঠোর নজরদারি এড়িয়ে হাসপাতালের পেছনের একটি গোপন কক্ষে প্রবেশ করে তার মরদেহের ছবি তোলেন। ছবিটি পরে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে পুলিশ পত্রিকার ছাপানো কপি বাজেয়াপ্ত করায় সেদিন ছবিসহ পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে ছবিটি ভাষা আন্দোলনে পুলিশের গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে সামনে আসে।

শহীদ রফিককে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। সে সময় তার কবরের কোনো স্থায়ী চিহ্ন রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে কবরটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদের সমাধিস্থল আজিমপুর কবরস্থানে হলেও তার নির্দিষ্ট কবরের অবস্থান অজানাই রয়ে গেছে।

ভাষা আন্দোলনে অসামান্য আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। তার জন্মস্থান পারিল গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রফিকনগর রাখা হয়েছে। এ ছাড়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তার নামে ভবনের নামকরণ করা হয়েছে, যা এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইতিহাসের সঙ্গে ভাষাশহীদ রফিকের আত্মত্যাগের সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেয়।

ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী রফিক উদ্দিন আহমেদ শুধু ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবেই নন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছেন অবিচ্ছেদ্যভাবে। তার আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।