ঢাকা, ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার, ২০২৬ || ১১ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৯

বার্গার এলো কীভাবে?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০০:০৯ ২৭ অক্টোবর ২০২৬  

স্কুলের ক্যান্টিনে পনেরো টাকায় একটা বার্গার মিলত। বানটা একটু শক্ত। ভেতরে চ্যাপ্টা করা আলুর চপ। ওপরে এক চিলতে সস। নব্বইয়ের দশকের অনেক ঢাকাইয়া শিশুর কাছে এটাই ছিল বার্গারের প্রথম স্বাদ। আসলে ওটা বার্গার ছিল না। ছিল বার্গারের একটা অনুকরণ। বাংলাদেশে বার্গারের গল্প শুরু হয় ওই অনুকরণ থেকেই। এই গল্পের মূল কথা একটাই। বার্গার এদেশে এসেছে নকল হয়ে, তারপর ধীরে ধীরে নিজের হয়ে উঠেছে।

নব্বইয়ের শুরুতে ঢাকায় ফাস্টফুডের হাওয়া লাগে। কোনো কোনো বিবরণ অনুযায়ী বেইলি রোডে খুলেছিল প্রথম ফাস্টফুডের দোকান। ক্রেতা ছিল মূলত তরুণেরা আর করপোরেট অফিসের কর্মীরা। তখনো বিদেশি ব্র্যান্ড আসেনি। ফাঁকটা ভরেছিলেন দেশি উদ্যোক্তারা। সুইস, হেলভেশিয়ার মতো নাম তখনই শোনা যেত।

সেই সময়ের বার্গার ছিল পুরোপুরি দেশি হিসাবের বার্গার। কুপারস, সুইস বেকারি আর স্কুলের ক্যান্টিনে বানের ভেতর থাকত আলুর চপ। কোথাও থাকত কাবাবের মতো একটা পাটি, দুই টুকরো রুটির মাঝখানে। কোথাও কুচানো মুরগি, সাদা সস আর এক স্লাইস চিজ। প্রায় সবখানে দু-এক টুকরো শসা থাকত। বিদেশি খাবার এখানে এসে দেশি রুচির সঙ্গে আপস করছিল। শসার ওই পাতলা টুকরা ছিল সেই আপসের চিহ্ন।

দাম ছিল সাধ্যের মধ্যে। স্বাদ নিয়ে কেউ বেশি প্রশ্ন তুলত না। নতুন কিছু খাওয়ার আনন্দটাই তখন যথেষ্ট ছিল।

১৯৯৫ সালের আগে আসল বার্গার পাওয়া কঠিন ছিল। সেই বছরের দিকে দুটি নাম পাওয়া যায়, উইম্পি আর গোলপিয়া। তারা বিফ ও চিকেন বার্গার আনল। সঙ্গে চিজ, সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। ঢাকার মানুষ প্রথমবার আন্তর্জাতিক মানের বার্গারের স্বাদ পেল।

কিন্তু বাজার তখনো প্রস্তুত ছিল না। উইম্পির দাম ছিল আন্তর্জাতিক মানের, ক্রেতা ছিল সীমিত। শেষ পর্যন্ত টিকতে পারেনি তারা। একজন লেখক ঠিকই বলেছেন, তারা সময়ের আগে এসে পড়েছিল। এখানে একটা শিক্ষা আছে। শুধু ভালো খাবার দিলেই বাজার তৈরি হয় না। ক্রেতার পকেট আর অভ্যাসকেও সঙ্গে নিতে হয়।

২০০১ সালে এলো আমেরিকান বার্গার। এবার আগুনে ঝলসানো মাংসের পাটি। ঢাকার মানুষ আর প্রবাসী বিদেশিরা দ্রুত এটিকে আপন করে নিল। কেউ কেউ বলেন, ২০০০-এর দশকের শেষ দিকে তাদের প্রথম আসল বার্গার ছিল এরকম কোনো দোকানেরই।

তারপর এলো এক লম্বা স্থিরতা। প্রায় দেড় দশক ঢাকার বার্গার-বাজার একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকল। দোকান বাড়ল, শাখা বাড়ল, কিন্তু স্বাদে নতুনত্ব এলো না। মাশরুম, বিফ বেকন বা সসেজের মতো উপকরণ তখনো অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। অন্যদিকে ফাস্টফুডের বড় ব্র্যান্ডগুলো মুরগির দিকেই ঝুঁকেছিল। কেএফসি আর পিৎজা হাট এসেছিল ২০০০-এর শুরুর দিকে। বাংলাদেশে ফাস্টফুডের আন্তর্জাতিক পরিচয় তৈরি হলো ভাজা মুরগি আর পিৎজা দিয়ে। বার্গার তখনো অপেক্ষায়।

পরিবর্তন এলো রাস্তা থেকে। ২০১৩ সালের দিকে ঢাকায় ফুড কার্টের জোয়ার আসে। অসাম বার্গারের মতো কিছু কার্ট এই ঢেউয়ের শুরুর দিকের নাম। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠল ছোট ছোট ঠেলাগাড়ি। এরাই এনে দিলো কিমা করা গরুর মাংসের পাটি, রসালো টপিং আর নতুন নতুন সসের স্বাদ।

এই সময়ের সবচেয়ে বড় নাম টেকআউট। ধানমন্ডির সীমান্ত স্কয়ারে ছোট একটা স্টল দিয়ে শুরু। প্রতিটি বার্গারের জন্য আলাদা সস। ফ্রাইয়ের জন্য আলাদা মশলার মিশ্রণ। তারা ব্যবসা করেনি শুধু, একটা মানদণ্ড ঠিক করে দিয়েছে। পাঠকের মনে থাকতে পারে, ভালো বার্গার কেমন হবে, তা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা তখন থেকেই বদলাতে শুরু করে।

তবে ঠেলাগাড়ির একটা দুর্বলতা ছিল। স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে দুশ্চিন্তা। খোলা রাস্তায় মাংস, ধুলো, অনিশ্চিত পানি। ক্রেতা স্বাদ চাইছিল, কিন্তু নিরাপত্তাও চাইছিল। এই চাওয়াটাই পরের ধাপের পথ খুলে দিল।

মহাখালীতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্টোদিকে একটা ছোট কার্ট ছিল। অনেকেরই মনে থাকবে। সেটিই পরে চিলক্স নামের ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে। তিন বন্ধু মিলে শুরু করেছিলেন। তাদের একজন বলেছেন, শুরুতে কোনো বড় স্বপ্ন ছিল না। শুধু বার্গার বেচে মানুষকে খুশি করতে চেয়েছিলেন। ২০১৭ সালে মহাখালীতেই তাদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আউটলেট খোলে।

চিলক্সের গল্পটা এই যাত্রার প্রতীক। রাস্তার স্বাদ থেকে বসার জায়গা, পরিচ্ছন্ন রান্নাঘর, নির্দিষ্ট মান। ঠেলাগাড়ির উদ্ভাবন আর রেস্টুরেন্টের নিয়মকানুন এক জায়গায় এলো। এই মিলনেই বার্গার সত্যিকারের দেশি ফাস্টফুড হয়ে উঠল।

দেশি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি এলো বিদেশি নামও। বার্গার কিং ঢাকায় নিজের পরিচিত ঝলসানো হুপার নিয়ে এলো। ২০১৯ সালের শেষে তাদের আউটলেট ছিল আটটি। ২০১৭ সালের ২২ ডিসেম্বর সৌদি চেইন হারফি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে তাদের প্রথম শাখা খুলল ঢাকায়। গুলশানের শাখাটি ছিল তাদের প্রধান।

মজার ব্যাপার, ২০২০ সালেও ঢাকায় ম্যাকডোনাল্ডসের সোনালি তোরণ ছিল না। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত বার্গার ব্র্যান্ডটি এদেশের বাজারে না এলেও বার্গার-সংস্কৃতি থেমে থাকেনি। এখানেই বোঝা যায়, বাংলাদেশে বার্গারের বিস্তার কোনো একক ব্র্যান্ডের হাত ধরে হয়নি। ঘটেছে অসংখ্য ছোট উদ্যোগের মিলিত ধাক্কায়। কেউ হারিয়েছে, কেউ টিকেছে।

আজ ঢাকার প্রায় প্রতিটি পাড়ায় বার্গারের দোকান। অ্যাপে অর্ডার দিলে আধঘণ্টায় বাড়িতে পৌঁছে যায়। বিফ, চিকেন, ডাবল চিজ, স্পাইসি, সবই আছে। পনেরো টাকার সেই ক্যান্টিন-বার্গার আজ স্মৃতি।

তবু স্মৃতিটা মুছে যায়নি। পুরোনো ঢাকার কিছু দোকানে আজও পাওয়া যায় শসার টুকরাওয়ালা চিকেন বার্গার। অনেকে গিয়ে সেটাই খান, স্বাদের জন্য নয়, নস্টালজিয়ার জন্য। কারণ ওই শসার টুকরাটাই বলে দেয়, বার্গার এখানে কীভাবে এসেছিল। এসেছিল আমাদের রুচি মেনে, আমাদের পকেট মেনে। সময় লেগেছে তিন দশক। ভুল হয়েছে, দোকান বন্ধ হয়েছে, আস্থা টলেছে। তারপরও বার্গার এখন আর বিদেশি খাবার নয়। সে এখন বাংলাদেশের নিজের ফাস্টফুড।

সুমির রান্নাঘর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর