ঢাকা, ০৪ নভেম্বর বুধবার, ২০২৬ || ১৯ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
৯

প্রেম-বিয়ে-মৃত্যু, সবকিছুতেই মানুষ ফুল দেয় কেন?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০৩:৪০ ৪ নভেম্বর ২০২৬  

ফুল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর একটি। ভালোবাসার মানুষ হোক কিংবা প্রিয় কোনো মানুষ তার জন্য ফুল কেনেন। কিন্তু কেন? অন্য কিছু নয় কেন? দু-তিন দিন পরেই তো ফুলটি শুকিয়ে যাবে, পাপড়ি ঝরে পড়বে, রং হারাবে। অথচ পৃথিবীর প্রায় সব সংস্কৃতিতে মানুষ আনন্দ, ভালোবাসা, প্রার্থনা কিংবা বিদায়ের মুহূর্তে ফুল হাতে তুলে নেয়। যে ফুলের আয়ু এত ছোট, মানুষের অনুভূতি প্রকাশে তার আবেদন এত দীর্ঘস্থায়ী কেন?

একটি হাসপাতালের কক্ষে শুয়ে থাকা মানুষটির পাশে ফুলের তোড়া। হয়তো তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, কিংবা কোনো কঠিন অস্ত্রোপচার শেষে ফিরেছেন জীবনের পরিচিত পথে। ফুলগুলো তার অসুস্থতা সারিয়ে তুলবে না, ব্যথা কমাবে না। তবু ফুলের দিকে তাকিয়ে তার মনে হতে পারে, পৃথিবী এখনো সুন্দর, বাইরে এখনো বসন্ত আসে, আর কেউ একজন তার কথা ভাবছে। ফুলের এই ক্ষমতাই তাকে সাধারণ উপহারের চেয়ে আলাদা করে তোলে।

ফুলের সৌন্দর্য তার রং, গন্ধ কিংবা কোমলতায় সীমাবদ্ধ নয়। ফুল মানুষের অনুভূতির সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেন তার নিজস্ব একটি ভাষা রয়েছে। যে ভাষায় কথা বলতে শব্দের প্রয়োজন হয় না, ব্যাকরণ জানার দরকার পড়ে না। ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, অনুশোচনা, সান্ত্বনা কিংবা বিদায়ের মতো অনুভূতি সেখানে অনায়াসেই প্রকাশিত হয়।

নবজাতকের আগমনে হাসপাতালে ফুল নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য আমাদের কাছে খুব পরিচিত। নতুন একটি প্রাণের পৃথিবীতে আসা যেন প্রকৃতির নিজস্ব কোনো উৎসব। ফুল সেই উৎসবের নীরব অংশীদার। তার উপস্থিতি বলে, এই পৃথিবীতে তোমাকে স্বাগত। তোমার আগমনে কারো আনন্দ হয়েছে, কেউ তোমাকে ঘিরে নতুন স্বপ্ন দেখছে।

দুজন মানুষের প্রেমের উদযাপনেও ফুলের উপস্থিতি আলাদা মাত্রা তৈরি করে। জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী কিংবা প্রথম দেখা, ফুল যেন অনুভূতিকে দৃশ্যমান করে। মুখে বলতে না পারা কথাগুলো কখনো একটি গোলাপের মধ্যেই জায়গা পেয়ে যায়। ফুল দেওয়ার মধ্যে থাকে কাউকে আলাদা করে ভাবার, তার জন্য সময় নেওয়ার এবং তাকে আনন্দিত করার চেষ্টা।

প্রিয় মানুষের সঙ্গে অভিমান হলে একটি ফুল হয়তো সব সমস্যার সমাধান করবে না। ছবি লেখকের সৌজন্যে

প্রিয় মানুষের সঙ্গে অভিমান হলে একটি ফুল হয়তো সব সমস্যার সমাধান করবে না। ছবি লেখকের সৌজন্যে

তবে ফুল শুধু প্রেমের প্রতীক নয়। কখনো একটি ফুল ক্ষমা চাওয়ার ভাষা, কখনো কৃতজ্ঞতার। প্রিয় মানুষের সঙ্গে অভিমান হলে একটি ফুল হয়তো সব সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু সম্পর্কের দরজায় আবারও আলতো করে কড়া নাড়তে পারে।

আমাদের সামাজিক জীবনেও ফুলের ব্যবহার বহুমাত্রিক। শিক্ষকের হাতে ফুল তুলে দিয়ে সম্মান জানানো, অতিথিকে ফুল দিয়ে বরণ করা, কোনো অর্জনে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো কিংবা জাতীয় দিবসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই ফুল হয়ে ওঠে অনুভূতির বাহক। বাংলাদেশের শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার দৃশ্যটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে ফুল ব্যক্তিগত আবেগের সীমা ছাড়িয়ে ভাষা, ইতিহাস ও সম্মিলিত স্মৃতির প্রতীক হয়ে ওঠে।

মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কথা বলার ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রিয়জনের মৃত্যু, দীর্ঘ অসুস্থতা কিংবা জীবনের কোনো বড় সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনার শব্দগুলো অনেক সময় অসহায় মনে হয়। তখন একটি ফুলের তোড়া, কয়েকটি সাদা ফুল কিংবা ছোট্ট একটি গাছও মানুষের পাশে থাকার বার্তা দিতে পারে।

ফুলের এই ভূমিকার পেছনে মানুষের মনস্তত্ত্বও কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিনেট হাভিল্যান্ড-জোনস ও তার সহকর্মীদের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ফুল উপহার পাওয়ার সঙ্গে মানুষের ইতিবাচক আবেগ ও সামাজিক সংযোগের সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণায় ফুল গ্রহণকারীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক আনন্দের পাশাপাশি সামাজিক আচরণেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা হয়েছিল। অর্থাৎ ফুল কেবল চোখের আনন্দ নয়, মানুষের অনুভূতি ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।

অবশ্য ফুল যে সব দুঃখ মুছে দিতে পারে, এমন নয়। শোকের মুহূর্তে ফুলের অর্থ সান্ত্বনা, উপস্থিতি এবং সহমর্মিতা। সেখানে ফুলের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তা দেওয়ার পেছনের অনুভূতি। কেউ হয়তো বলতে চেয়েছেন, আপনার কষ্ট আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছি না, কিন্তু এই সময়ে আপনার পাশে আছি।

কদমফুল হাতে লাইজু আক্তার। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

কদমফুল হাতে লাইজু আক্তার। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ধর্মীয় আচারেও ফুলের ব্যবহার বহু পুরোনো। মন্দিরে দেবতার উদ্দেশে ফুল নিবেদন, গির্জায় সাজসজ্জা কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ফুলের উপস্থিতি পবিত্রতা, শ্রদ্ধা ও সৌন্দর্যের ধারণাকে প্রকাশ করে। ইসলামে ফুলকে ঘিরে নির্দিষ্ট কোনো সর্বজনীন ইবাদতের বিধান না থাকলেও মুসলিম সমাজে ফুলের সৌন্দর্য ও সুগন্ধকে সম্মান, ভালোবাসা এবং শুভেচ্ছার প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। ধর্মীয় সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু ফুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বহু জায়গায় একই রকম।

আবার বিমানবন্দরে কারও অপেক্ষায় থাকা কিংবা বিদায়ের মুহূর্তেও ফুলের প্রয়োজন অনুভব করি আমরা। বহুদিন পর ফিরে আসা মানুষকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। বিদেশে পড়তে যাওয়া সন্তান কিংবা দূরদেশে কাজ করতে যাওয়া প্রিয়জনের হাতে ফুল তুলে দিয়ে বিদায় জানানো হয়। সেখানে ফুল যেন বলে, দূরত্ব বাড়লেও সম্পর্কের উষ্ণতা কমবে না।

বিদায়ের ফুলের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি থাকে একধরনের বিষণ্নতা। মানুষ জানে, এই মুহূর্তটি আর ফিরে আসবে না। তবু ফুল দিয়ে সে মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে চায়। ফুলের ক্ষণস্থায়িত্বই হয়তো এই অনুভূতিকে আরও গভীর করে। কারণ, সব সুন্দর মুহূর্তই তো চিরকাল থাকে না।

ফুলের আয়ু অল্প। এই সত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোও ধরে রাখা যায় না। একটি ফুল শুকিয়ে যায়, কিন্তু তা দেওয়ার স্মৃতি থেকে যায়। হাসপাতালের কক্ষে পাওয়া ফুলের কথা, প্রথম প্রেমের গোলাপ কিংবা বিদায়ের সময় হাতে পাওয়া ছোট্ট তোড়ার কথা মানুষ বহু বছর পরও মনে রাখতে পারে।

এখনকার ব্যস্ত জীবনে অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমও বদলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুভেচ্ছা, ডিজিটাল কার্ড কিংবা অনলাইন বার্তা সহজেই পাঠানো যায়। তবু হাতে তুলে দেওয়া একটি ফুলের আলাদা আবেদন রয়েছে। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কারও উপস্থিতি, যত্ন এবং সরাসরি অনুভূতি প্রকাশের আন্তরিকতা।

ফুল তাই নিছক সাজসজ্জা নয়, বরং মানুষের অনুভূতির এক নীরব সঙ্গী। যেখানে কথার প্রয়োজন হয় না, সেখানে ফুল নিজেই কথা বলে। আর কখনো কখনো একটি ফুলই যথেষ্ট হয়ে ওঠে বলতে, তুমি ছিলে বলেই এই কঠিন যাত্রায় বেঁচে গেলাম।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর