ঢাকা, ০৫ আগস্ট বুধবার, ২০২০ || ২১ শ্রাবণ ১৪২৭
good-food
৯২

করোনাকালে মোটা হয়ে যাচ্ছে ঘরবন্দী শিশুরা

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৩:৪৪ ৩০ জুলাই ২০২০  

ভয়ংকর কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গেল ১৬ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। আর তখন থেকেই অভিভাবকেরা শিশুদের ঘরে রাখার চেষ্টা করেছেন। এর ফলে দীর্ঘদিন স্কুলের মাঠে বা ফাঁকা জায়গায় বন্ধু-সহপাঠীদের সঙ্গে ছোটাছুটি নেই। খেলাধুলা নেই। হাঁটাচলাও নেই বাবা-মায়ের হাত ধরে বাইরে। তাই ঘরের চারদেয়ালে একরকম বন্দিজীবন কাটছে তাদের। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বাধ্য হয়ে প্রায় ঘরবন্দী জীবন কাটাতে হচ্ছে শিশুদের।

 

এদিকে করোনা প্রতিহত করতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিত্সকেরা। কিন্তু সেই চাহিদা মেটাতে গিয়ে মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরা। এভাবে শিশুরা শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিকভাবেও অনেক সময় অবসাদে ভুগছে। ঘরে বসে খাওয়া, ঘুম আর মোবাইল ফোন নিয়ে পড়ে থাকা ছাড়া এখন তাদের আর কোনো কাজ নেই। ঘরে থাকার কারণে বাইরের খাবার খাওয়ার সুযোগ না থাকলেও ঘরে বসেও তাদের নানা খাবারের আবদার মেটাতে গিয়ে বাড়ছে ওজন।

 

অনেক মা-বাবা হোম অফিস করছেন, বাচ্চারাও ঘরবন্দি৷ লকডাউনে পুরো পরিবার লম্বা সময় একসাথে থাকায় কিছু বাবা-মা দেখছেন তাদের বাচ্চা প্রতিদিন কত বেশি খায়৷ বাচ্চাদের কেউ কেউ সারাক্ষণ খেয়েই চলেছে, যা দেখে অভিভাবকরা আতঙ্কিত৷
    

মা-বাবা হোম অফিস করায় শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই বিরক্ত বোধ করে৷  শিশুদের শান্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে বেছে নেন তারা পিৎসা, বার্গার বা এ ধরনের ওজন বাড়ানোর মতো তৈরি খাবার৷ 


‘‘করোনা সংকটে খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কায়ই যে শুধু  অনেকে অতিরিক্ত খাবার ঘরে রেখেছে তা নয়৷ অনেক বাড়িতে নানা ধরনের প্রচুর খাবার সবসময়ই মজুদ রাখা হয়৷ তবে বাচ্চারা কি খায় সেটা জরুরি নয়, খাবারের পরিমাণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷'' - একথা বলেন বাড ওয়েনহাউজেনের করসো ক্লিনিকের ‘ইটিং ডিসঅর্ডার' রোগ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ থোমাস হুবার৷


অনেক পরিবার আছে যারা কখনো তাদের বাচ্চাদের অতিরিক্ত মোটা বা ওজনের ব্যাপারটি খেয়াল করেনি৷ এবার তারা বুঝতে পারলেও এর সমাধানের পথ তাদের জানা নেই৷ বাচ্চাদের সামনে থেকে খাবার সরিয়ে রাখা কোনো ভালো সমাধান নয়৷ বরং সবাই মিলে আলোচনা করাই বেশি উপকারী৷ এবং এ ক্ষেত্রে শিশুদের প্রফেশনাল থেরাপি প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞ থোমাস হুবার৷

 

স্থুল শিশু-কিশোররা করোনা পরিস্থিতিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ শরীরচর্চা বা  খেলাধুলা ছাড়া খাওয়া, টিভি দেখা এবং  স্যোশাল মিডিয়ায় নানাভাবে সম্পৃক্ত থাকায় ওজন বাড়ার সুযোগ অনেকটাই বেশি থাকছে৷ টিভি বা  ল্যাপটপ দেখার সময় বাচ্চারা নেশার মতো কত চিপস, চকলেটের প্যাকেট শেষ করছে বা কোক পান করছে তার হিসেবও নেই৷

 

এই মুহূর্তে অতিরিক্ত মোটা কিশোর-কিশোরীদের ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে টেলিফোনে পরামর্শ দিচ্ছেন বার্লিনের চারিটে শিশু ক্লিনিকের সুজানা ভিগান্ড৷


‘‘ রান্না, খাওয়া দাওয়া বা গল্প করার মতো কাজগুলো মিলেমিশে করা উচিত৷ এসবই বাচ্চাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে৷ যেসব পরিবারে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো রুটিন বা নিয়ম-কানুন মানা হয় না, সেসব পরিবারের শিশুদের সমস্যা সবসময়ই বেশি হয়ে থাকে৷''

 

অতিরিক্ত মোটা শিশু-কিশোররা প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েও মোটাই থেকে যায়৷ এবং পরবর্তীতে তাদের কার্ডিওভাসকুলার, জয়েন্টের সমস্যা বা বিষন্নতার মতো অসুখ দেখা দেয়৷

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যাভ্যাসের অনিয়ম আর শারীরিক পরিশ্রমের অভাব শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে স্থূলতার দিকে। লকডাউনে বাইরে কাজ না থাকায় ঘুম ও খাওয়ার সময়েও অনিয়ম দেখা দিয়েছে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই, যা স্থূলতার ঝুঁকি আরো বাড়াচ্ছে বলে জানান তারা। সম্প্রতি এক গবেষণায় এর ক্ষতিকর প্রভাব উঠে এসেছে।


‘শৈশবে ওজন বাড়ার কারণে কুপ্রভাব পড়তে পারে পরিণত বয়সে’ শিরোনামে এই গবেষণার সহ-লেখক, যুক্তরাষ্ট্রেও ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর মাইলস ফেইথ বলেছেন, করোনা ভাইরাস মহামারির ক্ষতিকর প্রভাব শুধু ভাইরাস সংক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। লকডাউনের কারণে শিশু-কিশোর সবাই স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস অনুসরণের ক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার। সাধারণত স্কুলের গরমের ছুটিতে শিশু-কিশোরদের ওজন বাড়তে দেখা যায়। এ থেকেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, এই লম্বা সময় ঘরে আটকে থাকায় তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা কী হতে যাচ্ছে? 

 

এই গবেষণার জন্য খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম আর ঘুম সম্পর্কিত তিন সপ্তাহের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ইতালির বাধ্যতামূলক দেশব্যাপী লকডাউনের সময়। আর তার তুলনা করা হয় ২০১৯ সালে নেওয়া তথ্যের সঙ্গে।

 

বৈদ্যুতিক পর্দার সামনে সময় কাটানোর মাত্রা, মাংস, স্ন্যাকস, ফল ও সবজি খাওয়ার মাত্রা নিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয় এই গবেষণায়। ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব প্রমাণিত হয়। দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গৎবাঁধা রুটিনের মাঝেও যেসব শিশু স্থূলতায় ভুগছিল, তাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার সমস্যাগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আরো প্রকট আকার ধারণ করেছে।

 

সবাই জানেন, মোটা হলে শরীরে রোগ বাসা বাঁধে৷ বাসাটা যে মানুষ বড় হলেই বাঁধে তা কিন্তু নয়৷ জার্মান গবেষকরা দেখেছেন, অল্প বয়সি শিশুরাও আজকাল শুধু মোটা হওয়ার কারণে অল্প অল্প করে এগিয়ে যাচ্ছে জটিল রোগে আক্রান্ত জীবনের দিকে৷


    
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাক্টা পেডিয়াট্রিকা'-য় প্রকাশিত হয়েছে একটি নিবন্ধ, সেখানে ১০০ জন মোটা শিশুকে নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে জার্মানির ইয়েনা এবং হোহেনহাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, মুটিয়ে যাওয়া শিশুদের অনেকের পিতা-মাতাও শুরুতে বুঝতে পারেন না তাঁদের সন্তানরা ক্রমশ বড় বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে৷ 

 

গবেষক দলের প্রধান ইনা ব্যার্গহাইম জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো হলেও শিশুদের বেশি ওজনের কারণে যেসব রোগ হতে পারে সেগুলো নিয়ে ভাবাই হয় না, ফলে রোগনির্ণয়েও ব্যর্থ হন চিকিৎসকরা৷

 

ইউরোপে অতিরিক্ত ওজনের মানুষের সংখ্যা দিনদিন বেড়ে চলেছে৷ দেখা দিচ্ছে মোটা মানুষের মধ্যে নানা অসুখ-বিসুখ – যা অবশ্যই চিন্তার বিষয়৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবগুলো দেশেই গত কয়েক শতক ধরে এই সমস্যা শুরু হয়েছে৷ জাতিসংঘ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অতিরিক্ত মোটা হওয়ার সমস্যার বিরুদ্ধে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছে৷


গবেষকরা শুধু মোটা শিশুদের নিয়েই কাজ করেননি৷ ১০০ জন মোটা শিশুর পাশাপাশি ৫১ জন স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের শিশুরও কিছু পরীক্ষা করেছেন তাঁরা৷ শিশুদের বয়স ছিল পাঁচ থেকে আট বছরের মধ্যে৷

 

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গবেষকরা দেখেছেন স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের শিশুদের শতকরা মাত্র ১৬ ভাগ অন্তত একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে রয়েছে৷ মোটা শিশুদের অবস্থা অনেক খারাপ৷ তাদের শতকরা ৭৩ ভাগ ছিল একই রকমের ঝুঁকিতে৷ গবেষকরা জানান, মোটা হবার কারণে শিশুদের মধ্যে উচ্চরক্তচাপ, রক্তে চর্বি এবং কোলেস্টরেল বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হয়।