ঢাকা, ০৫ ফেব্রুয়ারি রোববার, ২০২৩ || ২২ মাঘ ১৪২৯
good-food
২০৮

চাঁপাই নবাবগঞ্জের সংস্কৃতি

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০১:১৯ ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২  

সংস্কৃতি একটি ব্যাপক শব্দ। দেশে দেশে অঞ্চলে অঞ্চলে একই অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় অথবা একই এলাকার নানা ধর্মে সংস্কৃতির অদল-বদল ঘটে। সব মিলিয়ে বলতে পারা যায়, সংস্কৃতি দেশাচার লোকাচার ও ধর্মাচারের ভেতরে থাকে। সংস্কৃতি যেমন একটি পরম্পরা, তেমনি সংস্কৃতি সেই এলাকার ঐতিহ্য। বাঙ্গালী সংস্কৃতির অনেক কিছুই সারাদেশের মানুষ পালন করে।

 

যেমন-আমরা একুশের গান এক সুরে করি। মেলায় যায়। আনন্দ উৎসবের অনেক কিছুই গোটা দেশ একসঙ্গে পালন করে। এটা দেশাচার সংস্কৃতি। কিন্তু জেলায় জেলায় বা কয়েকটি জেলা মিলে একটি এলাকায় ভিন্নতা দেখা দেয়। যেটুকু ভিন্ন সেটুকুই ওই এলাকার সংস্কৃতির নিজস্বতা।

 

চাঁপাই নবাবগঞ্জ, মালদহ আর বহরমপুর মিলে বিস্তৃত এলাকায় একই সংস্কৃতি বিদ্যমান দেখা যায়। এই সংস্কৃতি অখন্ড বাংলা থাকার কালে গড়ে উঠেছিল। আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে তার অনেক কিছু পেয়েছি। নিত্য জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমরা ভাত খায়। খাবার উপাচার একই ধরনের। রান্নাপদ্ধতি ও খাবার নিয়মও একই রকম। চাঁপাই নবাবগঞ্জের সব বাড়িতেই সকালে এককালে সকালের নাস্তায় কলাই রুটি থাকতো। এটি এলাকার সংস্কৃতি। এটি লোকাচার।

 

এখন এ কলাইয়ের রুটি হাটে বা শহরের রাস্তার মোড়ে বিক্রি হচ্ছে। যোগাযোগ সহজতর হওয়ার কারণে বাইরের মানুষ এসেও কলাইয়ের রুটি খাবার বায়না ধরে। দিয়াড়ের জমিতে বন্যায় প্রচুর পলি পড়ার পর সেখানে প্রচুর মাসকলাইয়ের ফলন হয়। তাই শত বছর ধরে এ এলাকার মানুষ এই বিশেষ ধরনের রুটি খায়। বরেন্দ্রের মানুষের ভেতরও এই আচার বিদ্যমান। এই কলাই রুটি পেঁয়াজকুচি, লবণ ও সরিসার তেলের মিশ্রণে চাটনিতে ভালো মজে। এছাড়া বেগুন ভর্তা ও অনেকেই গরুর মাংসের সঙ্গে কলাই রুটি খান। 

 

বছরে অগ্রায়ণের ধান কাটার পর যাত্রা উৎসবে মেতে ওঠে। পাড়ায় বা এলাকায় যাত্রাদল আসে। নবান্নের চালের গুঁড়োর সঙ্গে গুড় মিশিয়ে মেয়েরা মসজিদে সিন্নি পাঠায়। এই সিন্নির নাম জোড়া। এটি এই এলাকার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। শীতে মেলা বসে। গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন গানের দল থাকে। তারা পালা গান ও আলকাপ গানে মেতে ওঠে। আলকাপ গান হচ্ছে এমন এক ধরনের গান, যার ভেতর থাকে কবিত্বের মেধা, সহজাত রসবোধ, তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার মিশেল। এটিও চাঁপাই নবাবগঞ্জ এলাকার সংস্কৃতি। আলকাপের গান ভারতের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ছিল।
.

আলকাপের গানে ছোকরা নাচ থাকে। একজন জোকার থাকে। কবি গানের মাঝে নেমে সে আনন্দ দান করে। তাকে স্থানীয় ভাষায় কাইপাল বলে। এটি চাঁপাই মালদহের নিজস্ব সংস্কৃতি যা দেশের অন্য কোথাও নেই। এখানে বিয়ে ও গায়ে হলুদে গীতের প্রচলন খুব পুরাতন। এটিও সামাজিক সংস্কৃতির অঙ্গ। গীতগুলো মেয়েদের কন্ঠে কোরাশে গীত হয়। প্রতি ছত্রের শেষে 'আরে কে' কথাটি আসে। এই গীত চাঁপাইয়ের সংস্কৃতির বড় স্থান জুড়ে আছে।

 

মুহাররমে এখানে কৃষক ও মজুর কূল কাটা কাটা বাঁশের একটি ঠিটে একদিক ধরে গোল হয়েছে একজনের সঙ্গে আরেকজনের বাঁশে লাগিয়ে রাতে জ্যোৎস্নায় ঘুরে ঘুরে মুর্শিয়া গান গায়। এটিও এখানকার আদি সংস্কৃতির অংশ। এছাড়া আছে মনসার গান। মেলার ছোকরা নাচ। এভাবে একটা সময় শত বছর ধরে এসব সংস্কূতির চর্চা করে গেছেন। এতদ অঞ্চলে বীরভূমের গুমহানীর গানও ছিল প্রসিদ্ধ। চাঁপাইয়ের মেয়ের হাতে নকশী কাঁথা শিল্প বিখ্যাত। এটি চাঁপাইয়ের লোকজ শিল্পের অহংকার।

 

এই কাঁথার বিভিন্ন নকশা মেয়েরা নিজেরাই উদ্ভাবন আজও করে। চাঁপাইয়ের সংস্কৃতির মূল স্রোতে আছে গম্ভীরা গান। গম্ভীর শব্দের অর্থ শিব। শিবের বন্দনাকেই শব্দগতভাবে গম্ভীরা বলা হতো। পরে এটি কোনো সন্মানিত মানুষ এলে তার স্তুতি করে গম্ভীরা গান চলে। এখনও চাঁপাইয়ের গম্ভীরা গান বাংলাদেশ বিখ্যাত।
.

গম্ভীরা গানে নানা নাতির এক মজাদার অভিনয়ও আছে। প্রথমে মঞ্চে নাতি এসে নানাকে খুঁজে। দেখতে না পেলে গালি দেয়। এই সময় হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। তখন দর্শকদের মধ্য দিয়ে পথ করে মাথাল মাথায় পাকা দাড়ির কৃষক নানা মঞ্চে উঠেই নাতিকে গালি দিয়ে বলে, ক্যানো তাকে ডাকা হয়েছে। নাতি মঞ্চে উপবিষ্ট সন্মানিত অতিথিদের দেখিয়ে বলে, তার ডর করছে। তখন নানা নাতি বলে, ডর নাই। এরা অনেক সন্মানিত ব্যক্তি।
.
তারপর নানা নানীর গান নাচ আরম্ভ হয়। সন্মানিত ব্যক্তিদের বন্দনা করে তারা এলাকার কিছু সমস্যার কথা গানে নাচে বলে যায়। প্রচুর হাস্যকৌতুকের পর তারা যৌথভাবে গানের ভেতর দিয়েই তাদের কাছে কিছু সামাজিক উন্নয়নের দাবী তোলে। গম্ভীরা পরবর্তীকালে জাতীয় ও আন্তজার্তিকভাবে গাওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞাপনেও গম্ভীরার সুর ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি চাঁপাই নবাবগঞ্জের গর্বের ব্যাপার। আশা করা যায়, চেষ্টা করলে, মূল গম্ভীরাকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ছড়িয়ে দেয়া যেতে পার।

 

চাঁপাই নবাবগঞ্জের মাটির রূপ ভেদে বরেন্দ্র ও দিয়াড় অঞ্চলে বিভক্ত। এ অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার দেশ বিভাগের শত বছর আগে থেকেই আছে। তারপরেও বিস্তৃত বরেন্দ্রভূমি ও দিয়াড় অঞ্চলে কৃষক প্রচুর। অঘ্রানে ধান ওঠার পর চাঁপাই নবাবগঞ্জের সংস্কূতির সঙ্গে গল্প শোনার রাত বড় একটি ভূমিকা পালন করে এসেছে। এই গল্পকে স্থানীয় ভাষায় 'কাহানী' বলে। কাহানী বলার পেশাদার লোকও আছে।

 

গ্রামে কারো বাড়ির বাহিরের খোলা জায়গাই কৃষককূল ও ছেলে বৌরা সারারাত ধরে কাহানী শোনে। কাহানীর সাতটা মাথা থাকে। সাত রাত ধরেও কাহানী শোনা যায় এবং চলেও। যুগের পরিবর্তনে এখন অনেক কিছু পাল্টে গেছে। আকাশ সংস্কূতি ও প্রযুক্তি ধীর ধীরে এই পুরাতনকে বদলে দিয়ে একটি লন্ডভন্ড অবস্থার সৃষ্টি করলেও চাঁপাই নবাবগঞ্জের লোক শিল্প ও সংস্কৃতি বেঁচে আছে।

 

লেখক: ভাস্কর চৌধুরী

কবি, প্রাবন্ধিক ও সংস্কৃতিকর্মী

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর