ঢাকা, ১৯ জুলাই রোববার, ২০২৬ || ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
good-food
১৫৬

কোরবানির পশু যত বড় তত বেশি কি সওয়াব?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৫:০১ ৮ মে ২০২৬  

ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ এলেই আমাদের সমাজে এক ধরনের অঘোষিত প্রতিযোগিতা শুরু হতে দেখা যায়। কার গরু কত বড়, কার গরুর দাম কত বেশি, হাটের সবচেয়ে বড় পশুটি কে কিনল এ নিয়ে চলে বিস্তর আলোচনা। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলে বড় পশুর প্রদর্শনী। এই উৎসবমুখর পরিবেশের মাঝে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই হারিয়ে যায়, কোরবানির পশু যত বড় বা দামি হয়, সওয়াব কি সত্যিই তত বেশি হয়?

ইসলামি শরিয়ত ও কোরআন-হাদিসের আলোকে এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য কী।

ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানির মূল উদ্দেশ্য নিছক গোশত খাওয়া, বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন নয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং বান্দার ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি প্রমাণ করা। পবিত্র কোরআনের সূরা হজের ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই বিভ্রান্তির অবসান ঘটিয়েছেন:

“আল্লাহর কাছে কখনো ওগুলোর গোশত পৌঁছে না এবং রক্তও না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া (খোদাভীতি)।”

এই আয়াত প্রমাণ করে, আল্লাহর কাছে পশুর আকার, ওজন বা দামের কোনো মূল্য নেই। তার কাছে একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হলো বান্দার অন্তরের অবস্থা এবং নিয়তের বিশুদ্ধতা।

বড় পশু কেনা কি তাহলে দোষের?

না, সামর্থ্য থাকলে বড়, হৃষ্টপুষ্ট ও সুন্দর পশু কেনা মোটেও দোষের নয়; বরং এটি উত্তম। মহান আল্লাহর রাস্তায় নিজের উপার্জিত সম্পদ থেকে সবচেয়ে প্রিয় ও উৎকৃষ্ট বস্তুটি উৎসর্গ করা মুস্তাহাব। নবী করিম (সা.) নিজেও হৃষ্টপুষ্ট, নিখুঁত ও দৃষ্টিনন্দন পশু কোরবানি করতে পছন্দ করতেন।

এখানে মূল পার্থক্য গড়ে দেয় 'নিয়ত' বা উদ্দেশ্য। যদি বড় পশু কেনার পেছনে একমাত্র উদ্দেশ্য থাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাকে ভালোবেসে নিজের সেরাটা দেওয়া, তবে তাতে অবশ্যই সওয়াব বেশি।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন বড় পশু কেনার নিয়তের সাথে সামাজিক অহংকার বা লোক-দেখানো প্রবৃত্তি যুক্ত হয়। যদি উদ্দেশ্য হয় মানুষকে দেখানো, সমাজে নিজের বড়ত্ব জাহির করা, পত্রিকা বা টিভিতে খবর হওয়া কিংবা ‘এলাকার সবচেয়ে বড় গরুটা আমি দিয়েছি’ এমন অহংকার করা, তবে ইসলামের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘রিয়া’ বা লৌকিকতা।

ইসলামে ‘রিয়া’ বা লোক-দেখানো ইবাদতকে ছোট শিরক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। লোক-দেখানো কোনো ইবাদতই আল্লাহ কবুল করেন না। নিয়তে সামান্যতম অহংকার বা প্রদর্শনীর ইচ্ছে থাকলে, লাখ টাকা দামের বিশাল পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যায়। তখন এটি কেবলই একটি ‘পশু জবাই’ বা গোশত খাওয়ার উৎসবে পরিণত হয়, কোরবানি নয়।

তাকওয়াই কোরবানির একমাত্র মাপকাঠি

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের শরীর, আকৃতি বা সম্পদের দিকে তাকান না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।” (সহিহ মুসলিম)।

এই হাদিস অনুযায়ী, একজন স্বল্প আয়ের মানুষ যদি তার সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট একটি ছাগল বা গরুর একটি ভাগ অত্যন্ত ইখলাস, ভালোবাসা বা একনিষ্ঠতার সঙ্গে কোরবানি করেন, তবে আল্লাহর কাছে তা লোক-দেখানো কোটি টাকার পশুর চেয়েও কোটি গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ ও সওয়াবের কারণ হতে পারে।

‘কোরবানি’ শব্দের অর্থই হলো নৈকট্য অর্জন, ত্যাগ বা উৎসর্গ। হযরত ইব্রাহিম (আ.) যেমন আল্লাহর প্রেমে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু নিজ সন্তানকে কোরবানি করতে প্রস্তুত হয়েছিলেন, আমাদেরও সেই চেতনা বুকে ধারণ করতে হবে। পশুর গলায় ছুরি চালানোর আগে নিজের ভেতরের অহংকার, লোক-দেখানো প্রবৃত্তি আর পশুত্বের গলায় ছুরি চালানো জরুরি।

তাই হাটে গিয়ে পশু বড় হোক বা ছোট, আমাদের একমাত্র চিন্তা হওয়া উচিত আমার নিয়ত কি শতভাগ শুদ্ধ? আমার এই ত্যাগ কি কেবলই আমার রবের সন্তুষ্টির জন্য? যদি উত্তর 'হ্যাঁ' হয়, তবে আপনার কোরবানিই হবে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আল্লাহ আমাদের ইখলাসের সঙ্গে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন।

ধর্ম বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর