ঢাকা, ১৮ জুলাই শনিবার, ২০২৬ || ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
good-food
৩২১

যেভাবে ছড়াচ্ছে হাম

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৮:০৫ ৩০ মার্চ ২০২৬  

সম্প্রসারিত টিকাদান (ইপিআই) সূচি অনুযায়ী, শিশুকে ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। তাহলে কী ৯ মাসের আগে শিশুরা হাম (মিজলস) ভাইরাসে আক্রান্ত হয় না? চিকিৎসকদের মতে, ৯ মাস বয়সের আগেও তারা হামে আক্রান্ত হতে পারে। বিশেষ করে যদি ঝুঁকিপূর্ণ কোনো গ্রুপের মধ্যে পড়ে।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সিয়াম মোয়াজ্জেম বলেন, “যেসব শিশু এখনো টিকা নেয়নি, বিশেষ করে ১৫ মাসের কম বয়সী বা যারা এক কিংবা দুই ডোজের কোনোটি নেয়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু কিংবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।”

তিনি বলেন, “বুকের দুধ পান করার মাধ্যমে শিশুর শরীরে মায়ের কাছ থেকে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। তবে এই সুরক্ষা সব শিশুর ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর হয় না। যেসব শিশু এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং পায় না বা যাদের পুষ্টিহীনতা রয়েছে, তাদের ইমিউনিটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকে। ফলে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।”

৯ মাসের আগে হামের টিকা

ডা. মো. সিয়ামের মতে, যেহেতু এখন বিভিন্ন এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে (আউটব্রেক পরিস্থিতি)। এতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় কোনো বাচ্চা যদি সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে নিশ্চিতভাবে এসে যায়, সেক্ষেত্রে ছয় মাস বয়সী শিশুকেও বিশেষ বিবেচনায় টিকা দেওয়া যেতে পারে।

দেশে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সরকার এখন ৯ মাসের পরিবর্তে ছয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠকে নতুন এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশিদ এসব তথ্য জানিয়েছেন।

এতদিন দেশে ৯ মাস বয়সে শিশুদের হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হতো। হালিমুর রশিদ জানিয়েছেন, হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ পরিস্থিতিতে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার বয়স ৯ মাস থেকে নামিয়ে ছয় মাস করা হলো।

নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে একটি বিশেষ ক্যাম্পেইন চালু করার উদ্যোগও নিয়েছে সরকার। আগামী জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া মাসব্যাপী কর্মসূচির আওতায় প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

টিকা নিলেও হাম কেন হচ্ছে? 

বলা হয়, হামের টিকা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ হতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, দীর্ঘদিন পুষ্টির অভাবে আছে, ভিটামিন এ-এর ঘাটতি রয়েছে অথবা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত-তাদের ক্ষেত্রে টিকার পরও হাম হতে পারে। তবে টিকা নেওয়া থাকলে রোগের জটিলতা অনেকটাই কম থাকে। 

ডা. মো. সিয়াম বলেন, “টিকা না নেওয়া বা দুর্বল ইমিউনিটির শিশুদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক আকার নিতে পারে। হামের জটিলতা হিসেবে পরবর্তী সময়ে প্রায়ই নিউমোনিয়া ও মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে। শিশু শরীরে ভিটামিন এ–এর মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে যায়। এছাড়া মধ্যকর্ণের ইনফেকশন, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে সংক্রমণও দেখা যায়।

অন্যদিকে, টিকা নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল এবং ভিটামিন-এ এর সহায়তাতেই রোগ সেরে যায়।

যেভাবে হাম শনাক্ত করা যায় 

ডা. মো. সিয়াম বলেন, “সমস্যা হলো, আমরা আসলে র‍্যাশটা দেখে বুঝি যে হাম হয়েছে। কিন্তু এই র‍্যাশ হওয়ার আরও ৩-৫ দিন আগেই এই হাম শুরু হয়েছে। সেসময় রোগী যাদের সংস্পর্ষে এসেছে তারাও ইতোমধ্যে এতে আক্রান্ত হয়েছে।”

চিকিৎসকদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। র‍্যাশ ওঠার জন্য অপেক্ষা করলে অনেক দেরি হয়ে যায়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যখনই কোনো শিশুর মধ্যে জ্বর-কাশি-সর্দির মতো উপসর্গ দেখা যাবে, তখনই তাকে আলাদা রাখতে হবে। পাশাপাশি গলা ব্যাথা থাকতে পারে, থাকতে পারে শুকনো কাশি, কঞ্জাংক্টিভাইটিস মানে চোখ লাল হওয়া, চোখ থেকে পানি পরাড় মতো উপসর্গ।

এই লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ ঠাণ্ডা-জ্বর ভেবে অবহেলা করা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে যদি এসব উপসর্গ দেখা যায়, বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের ক্ষেত্রে, তাহলে তাকে বাড়িতে রাখা এবং অন্যদের থেকে আলাদা করা জরুরি।

যেভাবে ছড়ায় হাম 

হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মিজলস ভাইরাসের মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায়। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি আশেপাশের ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। এটি মূলত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে, অর্থাৎ রেসপিরেটরি ড্রপলেট দিয়ে ছড়ায়।

সচেতনতা 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ সর্দি কাশি হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সেই শিশুদের অন্য কারও সংস্পর্শে আসতে দেওয়া যাবে না। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিশুদের হাঁচি কাশির এটিকেট যেমন, মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে কাশি দেওয়া, হাঁচি কাশির সময় রুমাল ব্যবহার করা, বারবার হাত ধুয়ে ফেলা ইত্যাদি শেখানো প্রয়োজন।