ঢাকা, ১৯ জুন বুধবার, ২০২৪ || ৫ আষাঢ় ১৪৩১
good-food
৪৫৭

সিএমএইচে ৭২ ঘণ্টা 

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০০:০৪ ১৯ অক্টোবর ২০২৩  

১. শেষতক ভর্তি হলাম। রোগী হিসেবে। বরাদ্দকৃত রুমের নাম কীর্তণখোলা। ছবির মতো আঁকানো। এসি মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। টিভির পরিষ্কার স্ক্রিন,ঝকঝকে ছবি। ছোট্ট রিফ্রিজারেটর। দুগ্ধ ফেননিভ বিছানা। এক টুকরো বারান্দা। আহা ,কী সুন্দর চাঁদ দেখা যাচ্ছে। গাছগুলো অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। এই রুমেই বছর পাঁচের আগে কিডনিতে পাথর নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। হিস্ট্রি রিপিটস। মেডিকেল এসিসট্যান্ট ব্লাড প্রেসার মেপে স্বাভাবিক পেলো। ওর মুখের হাসি দেখে সব কষ্ট ভুলে গেলাম।

 

২. সকাল ৭-৩০.। নার্স ব্লাড সুগার মাপলো, স্বাভাবিক। অপারেশন থিয়েটারের পোশাক পরানো হলো। ওটির রিসেপশনে আনা হলো। আমার সিরিয়াল দুই। আমার স্ত্রী,পুত্র আগে থেকেই সেখানে ছিল। বুঝি অশ্রু মুছবার চেষ্টা চলছে। পৃথিবী বড় মায়ার জগত। 

 

৩. রোগী নয় , খোদ সার্জনরা যেখানে বসেন সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। বরেণ্য ইএনটি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর কর্নেল তৌহিদ স্বভাবসুলভ হাস্যরসে আমাকে সাহস দিলেন। সেখানে আরেক বন্ধু প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাইম উপস্থিত ছিলেন। এনেস্থেসিওলজির প্রফেসর ব্রিগেডিয়ার নাদিমও অভয় বাণী দিলেন। কর্নেল তৌহিদ আমাদের তিনজনকে হাসিমুখে সেলফিতে বন্দী করলো। আমার ভয় অর্ধেক কমে গেলো। 

 

ওটির টেবিলে তোলা হলো। অপারেশনের গালভরা নাম। Septoplasty with Autologus Graft (RT)with inferior and middle terbinctomy। দুই নাকে এনেস্থেসিয়া দেয়ার ইঞ্জেকশনের নিডিল ঢোকার সময় যথেষ্ট ব্যথাই লাগলো। আস্তে আস্তে ডিপ সিডেশনে চলে যাচ্ছি। তারপর আর মনে নাই। 


৪. ঘুম ভেঙে দেখি পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে। স্যালাইন চলছে। এনেস্থেসিয়ার ঘোর কাটছে। মাথাব্যথা, ঘোরা দুই-ই হচ্ছে। স্যালাইনের ভেতর ইনঞ্জেকশনের মাধ্যমে এন্টিবায়োটিক এবং ব্যথার ওষুধ দেয়া হলো। আমার মুখ শুকিয়ে কাঠ। মুখে খাওয়া বারণ। নাকে - মুখ থেকে ফোটা ফোটা রক্ত পড়ছে। ঘুম পাচ্ছে। বড্ড ঘুম।


৫.মনে হলো খুব কাছে কেউ দাঁড়িয়ে ।দেখি অনুজ ইঞ্জিনিয়ার Shourov Samad Khurrom পাশে আমার স্ত্রী। তাদের মুখে অভয় দেয়ার অভিব্যক্তি থাকলেও ভেতরে ভেতরে ভীতির চিহ্ন স্পষ্ট। ওরা ডাবের পানি নিয়ে এসেছে। গলা ভেজালাম।আমার বাবা সকালে এসেছিলেন। তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন আমার সঙ্গে কথা বলবেন। তাকে মোবাইল ফোনে কুশল বলতে গিয়ে নাক দিয়ে বেশ খানিকটা রক্ত বেরিয়ে এলো। 

 

রাতে জাউ ভাত। আবার রক্তপাত যেন না হয় তাই খাবার ঠান্ডা করে খেলাম। রাতের ইনঞ্জেকশন দেয়া হলো। ঘুম আসছে। তন্দ্রা ভাঙলো। ভাবলাম সকাল। ঘড়ি দেখি রাত ৪টা। পোস্ট অপারেটিভে রোগী সবই অপারেশনের। ইন্টেনসিভ কেয়ার এসিস্ট্যান্ট আমার নাক মুখের রক্ত মুছিয়ে দিলো। হালকা ফলাহার হলো। ব্যথার ওষুধ দেয়া হলো।

৬. সকাল ৮-৩০ নাগাদ কর্নেল তৌহিদ এলো। সদা ব্যস্ত। নাকের প্যাক খুলে ফেললো। বেশ খানিকটা ব্লিডিং হলো। সে কিছু ব্যয়াম শিখিয়ে দিলো। মাথাব্যথা কমছে না। আমার বোন ডা. Khurshida Samad এসেছে। আমাদের দুই ভাইবোনের অনেক স্মৃতি। আমি যখন মেডিকেলের শেষবর্ষের ছাত্র, তখন সে প্রথম বর্ষে এসে ভর্তি হলো। কড়া ডোজের ওষুধেও যে মাথাব্যথা কমছে না সহোদরার সঙ্গে কথা বলে সেটি ভালো হয়ে গেলো। 


৭. দুপুরের খাবারের পর পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড থেকে আবার কীর্তণখোলা। গিজার্ডের গরম পানিতে গোসল ক্লান্তি মুছিয়ে দিলো। স্বাভাবিক খাবার। কলিজা ভুনা। সিএমএইচের কুকের তারিফ করতেই হয়। ইএনটি স্পেসালিস্ট মেজর মুনির ফলোয়াপ দিলো। নাকে- মুখে অল্প অল্প রক্ত এখনও আসছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখি চোখ -মুখ সব ফোলা দেখাচ্ছে। নিজেকেই চিনতে পারছি না। ব্লিডিং আরও কদিন থাকতে পারে। শুনে কষ্ট ও বিরক্তি দুই-ই লাগলো। প্রিয়জনরা কেউ রিং কলে, ম্যাসেজ, ম্যাসেঞ্জারে, হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকে খোঁজ নিচ্ছেন।

 

৮. রাতের ওষুধ খেলাম। বারান্দা খুলে বাহিরে এলাম। মাতাল হাওয়া। কতদিন এখানে কাজ করেছি।  কত রথী মহারথী চিকিৎসা পেয়ে কত জটিল রোগেও পূর্ণ আরোগ্য নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেছে। শুধু আমার স্নেহময়ী মাকে আর ফেরানো যায়নি। পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহভরা কোলে তব মা গো বল কবে শীতল হব---

 

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ 
ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট বাংলাদেশ আর্মড ফোর্সেস।