ঢাকা, ০২ অক্টোবর শুক্রবার, ২০২৬ || ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩
good-food
৭

শামিমার হস্তশিল্পে ঘুচছে ৩০ নারীর বেকারত্ব

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:১৯ ২ অক্টোবর ২০২৬  

বৈশ্বিক মহামারি করোনার সেই স্থবির দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনো শিউরে ওঠেন অনেকে। চার দেয়ালে বন্দি জীবন, চারিদিকে শুধুই হতাশা। কিন্তু সংকটই যে কখনো কখনো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়, তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন দিনাজপুরের তরুণী শামিমা নাসরিন। 

২০২০ সালে বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময়ে সেই অবরুদ্ধ দিনগুলোতে ঘরে বসে মাত্র ৩ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যে স্বপ্নের বীজ তিনি বুনেছিলেন, চার বছরের মাথায় তা আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। ঘরের ড্রয়িংরুম সাজানোর ব্যক্তিগত শখকে তিনি রূপ দিয়েছেন এক সফল বাণিজ্যিক উদ্যোগে।

সুতা, দড়ি, পালক আর বেতের জাদুকরী বুননে শামিমা আজ শুধু নিজেই লাখোপতি হননি, তার হাত ধরে স্বাবলম্বী হয়েছেন স্থানীয় প্রায় ৩০ জন নারী। দিনাজপুর শহরের এক সাধারণ ভাড়াবাড়ি থেকে তৈরি হওয়া তার হস্তশিল্পের পণ্য এখন কেবল দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নেই, পাড়ি জমাচ্ছে সুদূর বিদেশেও।

লক্ষ্মীপুর থেকে দিনাজপুর: শখ থেকে পেশা

শামিমা নাসরিনের শৈশব ও কৌশোর কেটেছে লক্ষ্মীপুরে। ছোটবেলা থেকেই সূচিশিল্প ও হস্তশিল্পের প্রতি তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। আর এই শিল্পের হাতেখড়ি হয়েছিল মায়ের কাছ থেকেই। বিয়ের পর স্বামী সুজন মিয়ার হাত ধরে দিনাজপুরে আসা। দিনাজপুর শহরের পশ্চিম রামনগর লালবাগ এলাকার একটি ভাড়া বাড়িতে তাদের সংসার। ঘর সাজানোর তীব্র ঝোঁক থেকে নিজের হাতেই সুতা ও দড়ি দিয়ে নানা ধরনের শৌখিন জিনিস তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। স্বামী তা দেখে মুগ্ধ হন এবং ঘরের চার দেয়ালের এই শিল্পকে বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুপ্রেরণা যোগান।

শামিমা স্মৃতিচারণ করে বলেন, শুরুটা হয়েছিল একেবারেই নিজের ঘরটা একটু অন্যরকমভাবে সাজানোর শখ থেকে। ২০২০ সালে করোনার লকডাউনের সময় বাইরে বের হওয়া বন্ধ ছিল। ওই সময় মাত্র ৩ হাজার টাকা দিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় কাঁচামাল কিনে আনি। সুতার বুনন দিয়ে কাজ শুরু করি। তখন ভাবতেও পারিনি যে আমার এই শখ একদিন ৩০টি পরিবারের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়াবে।

কাঁচামালের রূপান্তর ও বৈচিত্র্যময় পণ্যসম্ভার

শামিমার তৈরি করা হস্তশিল্পের মূল আকর্ষণ হলো ‘ম্যাক্রামে’ (গধপৎধসল্ক) এবং ‘ড্রিমক্যাচার’ (উৎবধসপধঃপযবৎ)। সুতা ও দড়ির গিঁট দিয়ে আধুনিক নান্দনিক নকশার পণ্য তৈরি করাই ম্যাক্রামে শিল্পের মূল বৈশিষ্ট্য।

তার প্রতিষ্ঠানে তৈরি পণ্যসমূহের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ঘর সাজানোর রুচিশীল পণ্যের মধ্যে রয়েছে— ড্রিমক্যাচার ও লাক্সারি ক্যানভাস ড্রিমক্যাচার, ম্যাক্রামে ওয়ালম্যাট ও প্ল্যান্ট হ্যাঙ্গার, ম্যাক্রামে সেলফ, টেবিল রানার ও বুনন টেবিল, জায়নামাজ হ্যাঙ্গার ও কোরআন হ্যাঙ্গার, কুশিকাঁটার কাজ, বেতের ঝুড়ি এবং ম্যাক্রামে আয়না অন্যতম। 

এসব শৌখিন সামগ্রী তৈরিতে মূলত সুতা, পাখির পালক, বেত ও ভালো মানের মালয়েশিয়ান বোর্ড ব্যবহার করা হয়। একেকটি পণ্যের ফিনিশিং এবং নকশার স্বাতন্ত্র্যের কারণে এগুলো সাধারণ ক্রেতাদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

‘চতুর্ভুজ’ ও অনলাইন বাণিজ্যের সাফল্য

ব্যবসার প্রসারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়েছেন শামিমা। তার ফেসবুক পেজ ‘চতুর্ভুজ’-এর মাধ্যমে দেশের কোণায় কোণায় পৌঁছে যাচ্ছে তার তৈরি পণ্য। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার পণ্যের অর্ডার পাচ্ছেন তিনি। পেজের মাধ্যমেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রেতারা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী পণ্যের ফরমায়েশ দেন। কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে ক্যাশ অন ডেলিভারি ভিত্তিতে পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয় ক্রেতার দোরগোড়ায়।

পণ্যের দাম রাখা হয়েছে সর্বসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই। সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে শুরু করে জটিল নকশার বড় সাইজের লাক্সারি পণ্যের দাম রাখা হয়েছে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। পণ্যের চাহিদা সম্পর্কে শামিমা নাসরিন বলেন, আমাদের পেজে যারা একবার আসেন, তারা কেবল একটি পণ্য কিনে থেমে থাকেন না। কারণ আমরা প্রতিটি পণ্য এমন একটি থিম ধরে তৈরি করি, যাতে একাধিক পণ্য একসঙ্গে ব্যবহার করলে পুরো ঘরের আবহটাই বদলে যায়। পণ্যগুলোর ডিজাইন ও মানের কারণেই গ্রাহকরা বারবার ফিরে আসে।

বিষাদ ঘুচিয়ে আলোর দিশা: ৩০ নারীর কর্মসংস্থান

শামিমার এই উদ্যোগ কেবল ব্যবসায়িক সফলতার গল্প নয়, এটি দিনাজপুরের একদল নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির গল্প। তার প্রতিষ্ঠানটি এখন স্থানীয় বহু অসচ্ছল নারী, গৃহিণী ও ছাত্রীদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন এবং আয়ের এক বড় প্ল্যাটফর্ম। বর্তমানে এখানে প্রায় ৩০ জন নারী কর্মী নিয়মিত কাজ করছেন।

চার বছর ধরে এখানে কাজ করছেন স্থানীয় কামরুন্নাহার কাকলি। তিনি নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে বলেন, এখানে কাজ শেখার পর আমার জীবনের দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন আমি প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করতে পারি। স্বামী যা আয় করেন, তার পাশাপাশি আমার এই উপার্জনের টাকায় দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচ অনায়াসে চালিয়ে নিচ্ছি। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আনন্দটাই আলাদা।
লেখাপড়ার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকা কলেজছাত্রীদেরও আশার আলো দেখিয়েছে শামিমার এই হস্তশিল্প কারখানা। দিনাজপুর আদর্শ মহাবিদ্যালয়ের ছাত্রী মনীষা আক্তার জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি অবসর সময়ে আমি এখানে কাজ করি। ওয়ালম্যাট তৈরির বিভিন্ন জটিল ও আধুনিক ডিজাইন শেখার সুযোগ পেয়েছি। এখন নিজের খরচ নিজেই চালাতে পারি। ভবিষ্যতে আমি নিজে একটি বুটিক ও হস্তশিল্পের প্রতিষ্ঠান দিয়ে সফল উদ্যোক্তা হতে চাই।

প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কাজের তদারকি করেন প্রোডাকশন ম্যানেজার আয়েশা সিদ্দিকা। তিনি চার বছর ধরে এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আয়েশা বলেন, আমি এখানে কাজ করে মাসে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা বেতন পাই। নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি একটা বড় টিম সামলানোর অভিজ্ঞতা হচ্ছে। শামিমা আপার কাছ থেকে কাজের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো শিখে নিজেকে একজন পরিপূর্ণ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আন্তর্জাতিক বাজারে প্রসার ও সরকারি সহায়তার আশ্বাস

দেশীয় বাজারে সুনাম কুড়ানোর পর শামিমা নাসরিনের তৈরি এসব নান্দনিক ড্রিমক্যাচার ও ওয়ালম্যাট এখন পাড়ি জমাচ্ছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। প্রবাসীদের হাত ধরে এবং অনলাইনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত অর্ডারে বিদেশেও এগুলো নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।

শামিমার এই অসামান্য সাফল্য নজর কেড়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোরও। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) দিনাজপুরের উপমহাব্যবস্থাপক জাহেদুল ইসলাম শামিমার উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

তিনি বলেন, শামিমা নাসরিন দিনাজপুরের হস্তশিল্প খাতে নারী নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০ জন নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করা সাধারণ কথা নয়। বিসিকের পক্ষ থেকে আমরা তাকে সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তার ব্যবসাকে আরও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দিতে স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বায়ারদের (বিদেশি ক্রেতা) সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং বিসিক আয়োজিত দেশি-বিদেশি মেলায় তার পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হবে।

আগামীর স্বপ্ন ও প্রেরণা

পাঁচ বছর আগে যে স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন শামিমা, তা আজ এক সবুজ বৃক্ষে রূপ নিয়েছে। শত বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রমাণ করেছেন, সদিচ্ছা, মেধা আর পরিশ্রম থাকলে ঘর থেকেই পুরো বিশ্বকে জয় করা সম্ভব। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে শামিমা নাসরিন জানান, তিনি দিনাজপুরে একটি পূর্ণাঙ্গ হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ ও উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন করতে চান, যেখানে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, যেন হাজারো নারী নিজেদের ভাগ্য বদলাতে পারেন। দিনাজপুরের রামনগর লালবাগের সেই ছোট্ট ভাড়া বাড়িটি আজ আর কেবল কোনো বাসা নয়—সেটি এখন ৩০টি পরিবারের স্বপ্ন বোনার কারখানা। হস্তশিল্পের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাবলম্বী হওয়ার এই গল্প এখন অনুপ্রাণিত করছে সারা দেশের হাজারো তরুণ উদ্যোক্তাকে।