ঢাকা, ১৭ ফেব্রুয়ারি সোমবার, ২০২০ || ৪ ফাল্গুন ১৪২৬
good-food
৯৭

গরীবের খাবার শালুক এখন বড় লোকের প্রিয়

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২০:৪২ ৮ জানুয়ারি ২০২০  

হবিগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকার পানি প্রতিদিনই কমছে। সেই সঙ্গে মাছের পাশাপাশি লোকজন আহরণ করছেন শালুক। এটি একসময়ে হাওর এলাকার গরিবের খাবার ছিল। তবে এখন ধনীরাও শখ করে কিনছেন। আবার বিদেশে থাকা স্বজনদের জন্যও এই শালিক প্রেরণ করা হচ্ছে। ফলে দিন দিন এর দাম বেড়ে গরিবের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে শালুক আহরণকারীরা ভালো দাম পেয়ে লাভবান হচ্ছেন।
জেলার বানিয়াচং, আজিমরীগঞ্জ, মাধবপুর, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলার একাংশের হাওর এলাকা বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকে। এসময় শাপলা, শালুক, পানিফলসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদে হাওর পরিপূর্ণ থাকে। বর্ষা শেষে শরৎ এবং হেমন্তের পরে সংগ্রহ করা হয় শালুক, শাপলার ডেপ, পানিফলসহ বিভিন্ন ধরনের মজাদার ফল। এর মধ্যে শালুক খুবই জনপ্রিয়।
বানিয়াচং উপজেলার কাগাপাশা গ্রামের কৃষক নুর আলী জানান, বোরো ফসলের জন্য জমির আগাছা পরিস্কার করার সময় শালুক এবং পানিফল আহরণ করা হয়। বাজারে এই ফলের চাহিদা থাকায় তারা এসব সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। পাইকারি ২০/৩০ টাকা কেজি হিসাবে শালুক বিক্রি হয়। খুচরা বাজারে ৪০/৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়।
একই গ্রামের আরেক কৃষক আব্দুর রহমান জানান, গ্রামে অভাবের সময় অতিদরিদ্র শ্রেণীর মানুষ বিল থেকে শালুক তুলে এনে সিদ্ধ করে ভাতের বিকল্প হিসেবে খায়। আবার বাজারে নিয়ে বিক্রি করে।
হাওর থেকে সংগৃহীত শালুক পাইকরাররা কিনে এনে বিভিন্ন বাজারে বিক্রি করে। হবিগঞ্জ শহরের বিভিন্ন হাট-বাজারের বাইরে শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ভ্যান নিয়েও বিক্রি করা হয় এই ফল।
হবিগঞ্জ জেলায় শালুকের অন্যতম পাইকারি বাজার মাধবপুর উপজেলায়। সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবারে এর বাজার বসে। পার্শ্ববর্তী জেলা মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের ব্যবসায়ীরা শত শত মণ শালুক নিয়ে আসে মাধবপুরে। পাইকারদের হাতবদল হয়ে সেই শালুক চলে যায় রাজধানী ঢাকাসহ কুমিল্লা, সরাইল, ভৈরব, নরসিংদী, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের কাছে।
শ্রীমঙ্গল থেকে শালুক নিয়ে আসা সাহেদ মিয়া জানান, তাদের এলাকার তুলনায় মাধবপুরে শালুকের চাহিদা বেশি থাকায় গত ৫/৬ বছর যাবত তারা এখানে নিয়ে আসেন। একেকটি শালুকের ওজন ৩০ গ্রাম থেকে ৭০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।
হজমশক্তি বৃদ্ধিকারক এই ফলটি আগুনে পুড়িয়ে কিংবা সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইশতিয়াক মামুন জানান, শালুক দ্রুত ক্ষুধা নিবারণের সঙ্গে শরীরে পর্যাপ্ত শক্তিও যোগায়। শালুকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন, ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা পিত্তের প্রশান্তিদায়ক, পিপাসা নিবারণ করে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা তোফায়েল ইসলাম জানান, হবিগঞ্জে কোনও কৃষকই শালুক আবাদ করে না। এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। শালুক শাপলা গাছের গোড়ায় জন্মানো এক ধরনের সবজি জাতীয় খাদ্য। শাপলা গাছের গোড়ায় একাধিক গুটির জন্ম হয়। যা ধীরে ধীরে বড় হয়ে শালুকে পরিণত হয়। এটি সিদ্ধ করে বা আগুনে পুড়িয়ে ভাতের বিকল্প হিসেবে খাওয়া যায়।
হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দেব জানান, শাপলা ফুল গাছের রাইজোমই শালুক নামে পরিচিত। প্রজাতিভেদে ৫০-৭০ গ্রাম ওজনের শালুক হয়। এটি প্রাকৃতিকভাবেই জন্মায়। ভাটি-বাংলার আদি এবং জনপ্রিয় এই ফল নানাভাবে খাওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, শালুকের রয়েছে অসাধারণ ভেষজ গুণ। এটি ক্ষুধা নিবারণ করে দেহে দ্রুত শক্তি যোগায়। পুড়িয়ে, সিদ্ধ করে বা তরকারিতে সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। চুলকানি ও রক্ত আমাশয় নিবারণে লাল শালুক প্রাচীনকাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শালুকে ক্যালসিয়াম আলুর চেয়ে সাতগুণ বেশি। আর এতে যে শর্করা রয়েছে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপকারি। এটি প্রসাবের জ্বালাপোড়া, পিত্ত অম্ল ও হৃদযন্ত্রের দূর্বলতা দূর করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এতে পেয়েছেন গ্যালিক এসিড যা ক্যান্সার চিকিৎসায় কাজে আসবে। এছাড়া এতে প্রাপ্ত ফ্লেভনল গ্লাইকোসাইড রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং মাথা ঠাণ্ডা রাখে।
 

বাংলাদেশকে জানো বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর