ঢাকা, ১৬ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২৬ || ৩ মাঘ ১৪৩২
good-food

যুক্তরাষ্ট্রে অবসরে, ইরানে কেন সচল এফ-১৪?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:১০ ১৬ জানুয়ারি ২০২৬  

এক সময় এফ-১৪ টমক্যাট ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী যুদ্ধবিমানগুলোর একটি। শক্তিশালী রাডার, দীর্ঘপাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ‘এইম-৫৪’ ফিনিক্স বহনের সক্ষমতা এবং দূর থেকে শত্রু শনাক্ত করার ক্ষমতার কারণে এটি বিশেষভাবে পরিচিতি পায়।

যুক্তরাষ্ট্র এই বিমান ব্যবহার করত মূলত বিমানবাহী রণতরীকে শত্রুপক্ষের বোমারু বিমান ও দূরপাল্লার অ্যান্টি-শিপ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে রক্ষার জন্য। সময়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এফ-১৪ অবসর নিলেও ইরান এখনো এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে যাচ্ছে- যা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং বাধ্যবাধকতার মিলিত প্রভাব।

১৯৭০-এর দশকে ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনামলে মধ্যপ্রাচ্যে সোভিয়েত প্রভাব ঠেকাতে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখত ওয়াশিংটন। সেই সময়ই যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৭৯টি এফ-১৪ টমক্যাট যুদ্ধবিমান বিক্রি করে। এই চুক্তি দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে।

কিন্তু ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব সবকিছু পাল্টে দেয়। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহের পতন ঘটে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যায় এবং ইরানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এর ফলে বন্ধ হয়ে যায় এফ-১৪–এর খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।

নিষেধাজ্ঞার কারণে এফ-১৪ রক্ষণাবেক্ষণ ইরানের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে একটি বিমান সচল রাখতে অন্য বিমানের যন্ত্রাংশ খুলে ব্যবহার করতে হয়- যাকে বলা হয় ‘ক্যানিবালাইজেশন’। পাশাপাশি ইরান কিছু যন্ত্রাংশ রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং করে নিজস্বভাবে তৈরি করার চেষ্টা চালায়।

যদিও এতে পুরোপুরি সফলতা আসেনি, তবু সব বিমান একেবারে অচল হয়ে যায়নি।

বর্তমানে ইরানের হাতে কতটি এফ-১৪ কার্যকর অবস্থায় আছে, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যা খুবই সীমিত এবং এগুলোর সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক কম।

তবু প্রশ্ন থাকে- ইরান কেন এখনও এই পুরোনো যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে?

এর প্রধান কারণ বিকল্পের অভাব। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার সুযোগ নিষেধাজ্ঞার কারণে নেই। রাশিয়া বা চীনের কাছ থেকেও পর্যাপ্ত সংখ্যায় অত্যাধুনিক বিমান সংগ্রহ করা সহজ হয়নি। ফলে যেসব বিমান এখনো উড়তে সক্ষম, সেগুলোকেই ধরে রাখাই ইরানের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।

এর পাশাপাশি রয়েছে প্রতীকী দিক। এফ-১৪ এখনো ইরানের বিমানবাহিনীর একটি পরিচিত মুখ। এটি দেখিয়ে তেহরান বোঝাতে চায় যে, দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তারা পুরোপুরি সামরিক সক্ষমতা হারায়নি।

বাস্তবতা হলো, আজকের দিনে ইরানের এফ-১৪ যুদ্ধবিমানগুলো তাদের পুরোনো শক্তির কেবল ছায়ামাত্র। আধুনিক মার্কিন বা মিত্রবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে এগুলো বড় কোনো হুমকি তৈরি করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বহরে রয়েছে ‘এফ-৩৫’ এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান।

তবে ইতিহাসে এফ-১৪ যে কার্যকর যুদ্ধবিমান ছিল, তার প্রমাণ রয়েছে। ১৯৮৯ সালের ৪ জানুয়ারি লিবিয়ার উপকূলে মার্কিন নৌবাহিনীর দুটি এফ-১৪এ বিমান দুটি লিবিয়ান মিগ-২৩ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে; একটি এইম-৭ এবং অন্যটি এইম-৯ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান আজও এফ-১৪ ব্যবহার করছে মূলত বাধ্য হয়ে; নিষেধাজ্ঞা, বিকল্পের অভাব এবং পুরোনো বিনিয়োগ ধরে রাখার প্রয়োজন থেকে। যদিও এগুলো আর আগের মতো ভয়ংকর নয়, তবু ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষায় এখনো একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে এবং রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে এফ-১৪ টিকে আছে।

বিশ্ব বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর