ঢাকা, ২০ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, ২০২৬ || ৮ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food

এবার কোন দেশে কতক্ষণ রোজা

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২০:১৭ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

রমজান মাস শুরু হয়েছে। চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে সিয়াম সাধনার এই মহোত্তম মাস। ইসলামের অনুসারীরা পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টির জন্য ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাবার ও পানীয় ত্যাগ করে টানা এক মাস এই পবিত্র ব্রত পালন করবেন। তবে আপনি কি জানেন, আধুনিক বিজ্ঞানের নিয়ম আর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সারা বিশ্বের মানুষের রোজার সময়কাল কিন্তু এক নয়। যখন আমাদের দেশে রোজার সময় প্রায় ১৩ থেকে ১৪ ঘণ্টা থাকে, তখন পৃথিবীর কোনো প্রান্তে মানুষ হয়তো মাত্র আড়াই ঘণ্টা না খেয়ে রোজা রাখছেন। আবার কোথাও এই সময় প্রায় ২০ ঘণ্টাও হতে পারে। কেন এই পার্থক্য এবং কোথায় এবার সবচেয়ে দীর্ঘ রোজা হবে, তা নিয়ে আমাদের আজকের এই আয়োজন।

সময়ের এই পার্থক্যের কারণ কী?

রোজার সময়কাল মূলত নির্ভর করে দিনের দৈর্ঘ্যের ওপর। আর দিনের দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হয় পৃথিবীর মেরু অঞ্চল এবং নিরক্ষরেখা থেকে কোনো স্থানের দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে। সহজভাবে বললে, পৃথিবী তার অক্ষে কিছুটা হেলে থাকায় বছরের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে দিনের আলো কমবেশি হয়। বর্তমানে দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল চলছে। তাই সেখানে দিনের আলো অনেক বেশি সময় থাকে, যার ফলে রোজার সময়ও সেখানে দীর্ঘতর। অন্যদিকে উত্তর গোলার্ধে এখন শীতের আমেজ। ফলে দিন ছোট হওয়ায় সেখানে রোজার সময় তুলনামূলক কম।

ছবি : বিবিসি

মজার বিষয় হলো, ইসলামিক ক্যালেন্ডার যেহেতু চাঁদের ওপর নির্ভরশীল, তাই প্রতি বছর রমজান প্রায় ১১ দিন করে এগিয়ে আসে। এই চক্রাকার পরিবর্তনের কারণে কোনো বছর উত্তর গোলার্ধের মানুষ লম্বা সময় রোজা রাখেন, আবার কয়েক বছর পর সেই একই দীর্ঘ রোজা পালনের দায়িত্ব পড়ে দক্ষিণ গোলার্ধের মানুষের কাঁধে।

কোথায় দীর্ঘতম আর ক্ষুদ্রতম রোজা

এবারের রমজানে সময়ের এক অদ্ভুত বৈচিত্র্য দেখা যাচ্ছে। দক্ষিণ গোলার্ধের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত চিলির পুয়ের্তো উইলিয়ামস শহরটি বিশ্বের অন্যতম দক্ষিণ প্রান্তের বসতি। সেখানে এবার রমজানের শুরুতে প্রায় সাড়ে ১৪ ঘণ্টা রোজা রাখতে হবে। অর্থাৎ সেখানকার মানুষ সকাল সাড়ে ৬টায় সেহরি শেষ করে রাত ৯টার দিকে ইফতার করার সুযোগ পাবেন।

অন্যদিকে উত্তর গোলার্ধের চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। নরওয়ের লংইয়ারবিয়েন শহরটি বিশ্বের উত্তরতম জনবসতি হিসেবে পরিচিত। সেখানে রমজানের শুরুতে রোজার সময়কাল শুনলে যে কেউ অবাক হবেন। সেখানে এবার সেহরি থেকে ইফতারের মাঝখানের সময় মাত্র আড়াই ঘণ্টার কিছু বেশি। আনুমানিক সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে রোজা শুরু হয়ে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের দিকে ইফতারের সময় হয়ে যায়। তবে দিন যত যাবে সেখানে সূর্যালোকের সময় বাড়বে আর মাসের শেষ দিকে রোজার সময় বেড়ে দাঁড়াবে সাড়ে ১২ ঘণ্টা। 

আরব বিশ্ব ও দক্ষিণ গোলার্ধের চিত্র

আরব বিশ্বের দেশগুলোতে এবার রোজার সময় বেশ সহনীয়। ২০২৬ সালের এই রমজান সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় অনেকটা মধ্যম দৈর্ঘ্যের। মক্কায় রমজানের শুরুতে প্রায় সাড়ে ১১ ঘণ্টার মতো রোজা রাখতে হবে যা মাসের শেষে বেড়ে প্রায় ১২ ঘণ্টা হবে।

আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স বা নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে রমজানের শুরুতে রোজা রাখতে হবে ১৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের মতো। তবে মাসের শেষের দিকে সেখানকার রোজার সময় প্রায় এক ঘণ্টা কমে আসবে। কারণ দক্ষিণ গোলার্ধে তখন দিন ছোট হতে শুরু করবে।

অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ রমজানের শুরুতে রোজার সময় থাকবে মাত্র ৯ ঘণ্টা। কিন্তু মাসের শেষে তা বেড়ে ১২ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যাবে। এক সময় যখন রমজান জুন বা জুলাই মাসে পড়ত, তখন উত্তর গোলার্ধের দেশ যেমন নরওয়ে বা রাশিয়ায় মানুষকে প্রায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত রোজা রাখতে হতো। এ বছর শীতকালে রমজান হওয়ায় সেই কষ্ট অনেকটা লাঘব হয়েছে।

তবে মেরু অঞ্চলের মতো অতি দূরবর্তী জায়গায় বসবাসকারী অনেক মুসলমান এই কঠিন পরিস্থিতি এড়াতে মক্কার সময় অনুসরণ করে রোজা পালন করেন। এটি বিশেষ করে সেসব অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য যেখানে দিনের আলো কয়েক মাস স্থায়ী হয় অথবা ইফতার ও সেহরির মাঝে পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায় না।

আগামীর পূর্বাভাস

উত্তর গোলার্ধের জন্য আগামী বছরগুলো আরও স্বস্তিদায়ক হবে। ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর রোজার সময় সেখানে কমতে থাকবে কারণ তখন রমজান পুরোপুরি শীতকালে বা ডিসেম্বর মাসে পড়বে। এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যাবে দক্ষিণ গোলার্ধে। সেখানে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর রোজার সময় একটু একটু করে বাড়বে।

২০২৬ সালের রোজার সময়টাকে বেশ সহজ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ কয়েক বছর আগে যখন রমজান মাস জুন বা জুলাইয়ের তীব্র গরমে পড়েছিল তখন নরওয়ে রাশিয়া বা গ্রিনল্যান্ডের মানুষকে টানা ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত রোজা রাখতে হয়েছিল। সেই তুলনায় এবারের আবহাওয়া আর সময় দুটোই অনেক বেশি উপযোগী।

কেন এই সংযম?

রোজা রাখা কেবল না খেয়ে থাকা নয় বরং এটি ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিক শক্তি বাড়ানো এবং আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। সূর্যোদয়ের আগে সাহরি খেয়ে রোজা শুরু হয় এবং সূর্যাস্তের সময় ইফতারের মাধ্যমে তা শেষ হয়। এই দীর্ঘ সময় পানি পান করা থেকেও বিরত থাকতে হয়।

তবে ইসলাম একটি মানবিক ধর্ম। যারা শারীরিকভাবে রোজা রাখতে অক্ষম তাদের জন্য বিশেষ ছাড় রয়েছে। ছোট শিশু অসুস্থ ব্যক্তি ভ্রমণকারী এবং গর্ভবতী বা দুগ্ধদানকারী মায়েদের রোজা রাখা বাধ্যতামূলক নয়। যদি কারো স্বাস্থ্যের ওপর রোজা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তবে তাদের জন্য রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে।

পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন না কেন রোজার উদ্দেশ্য হলো সহমর্মিতা আর ধৈর্য শিক্ষা করা। সময়ের এই বৈচিত্র্য আমাদের পৃথিবীর বিশালতা আর স্রষ্টার সৃষ্টির মহিমাকেই মনে করিয়ে দেয়।