ঢাকা, ১৫ ফেব্রুয়ারি রোববার, ২০২৬ || ৩ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food

বহুল আলোচিত ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আসলে কী?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৫৩ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

কোনো বৈঠক, কমিটি বা রিপোর্টে সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হলে, কোনো সদস্য বা পক্ষ যখন তার ভিন্নমত লিখিতভাবে জানায় তখন তাকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বলে। অর্থাৎ, এটি এক ধরনের আনুষ্ঠানিক আপত্তি বা ভিন্নমত।

রাজনীতিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কীভাবে ব্যবহৃত হয়?

১. কমিটি বা কমিশনের রিপোর্টে

কোনো কমিশন, সংবিধান সংস্কার কমিটি বা সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে সবাই একমত না হলে, ভিন্নমত পোষণকারী সদস্য লিখিতভাবে তার মতামত যুক্ত করেন।

ভারতের মুখ্য সংবিধান প্রণেতা ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। 

উদাহরণ হিসেবে ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সময় ড. বি. আর. আম্বেদকর এর কমিটির বেশ কয়জন সদস্য ‘ডিসেন্ট নোট’ দিয়েছিলেন।

২. রাজনৈতিক জোট বা বৈঠকে

একটি রাজনৈতিক দল বা জোটের বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্তে আপত্তি থাকলে তারা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে জানায়।

এটা হতে পারে-

•     তারা সিদ্ধান্ত মানছে না

•     শর্তসাপেক্ষে মানছে

৩. আইনি বা সাংবিধানিক প্রসঙ্গে

কোনো আদালতের রায়ে বিচারকদের মধ্যে মতভেদ হলে বিচারকদের কেউ কেউ ‘ডিসেন্টিং অপিনিয়ন’ দেন।

আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক রুথ ব্যাডার গিন্সবার্গ।  

যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে রুথ ব্যাডার গিন্সবার্গ–এর বিখ্যাত কিছু ডিসেন্ট অপিনিয়ন ছিল। যা পরে আইন ও সমাজে প্রভাব ফেলেছে।

কেন ‘নোট অব ডিসেন্ট’ গুরুত্বপূর্ণ?

•     গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতা বজায় রাখে

•     দ্বিমত ইতিহাসে রেকর্ড থাকে

•     ভবিষ্যতে নীতিমালা পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে

•     রাজনৈতিক চাপ বা আপসের প্রমাণ হিসেবে থাকে

জুলাই জাতীয় সনদ। 

এবার ফেরা যাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে।

 ‘নোট অব ডিসেন্ট’ কথাটা শুনতে একটু আইন-কানুনের মতো লাগলেও, আসলে এটা রাজনীতির ভাষায় খুবই সহজ— “আমরা একমত নই!”

আর সেই ভিন্নমত প্রশ্নে, এবার আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–এর কয়েকটি আপত্তি। জুলাই সনদের সঙ্গে তাদের দলীয় অবস্থানের যে জায়গাগুলোতে ঠোকাঠুকি হয়েছে, সেগুলো দেখা যাক-

১. প্রধানমন্ত্রী বনাম দলীয় প্রধান – দুই চেয়ার একসঙ্গে নয়!

জুলাই সনদ বলছে এক ব্যক্তি একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধান থাকতে পারবেন না, আর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হওয়া যাবে না। কিন্তু এই জায়গায় বিএনপি তাদের ‘ডিসেন্ট’ জানিয়ে রেখেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ক্ষমতায় এলে তারা কি সত্যিই দুই চেয়ার আলাদা করবে?

২. উচ্চকক্ষ 

সনদে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ বানানোর কথা, আর সংবিধান বদলাতে তার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বিএনপি উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হলেও, এর গঠন প্রক্রিয়া এবং বিশেষ করে উচ্চকক্ষের হাতে ‘ভেটো’ ক্ষমতা বা সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়ার বিরোধিতা করে। 

নোট অব ডিসেন্ট। ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি 

৩. বিচারক নিয়োগ ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান – কে বসাবে কাকে?

সনদে বিচারক নিয়োগে ‘জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’, পুলিশ কমিশন এবং সাংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটিতে বিরোধী দলের জোরালো ভূমিকার কথা বলা হয়েছে। পিএসসি, দুদক এবং মহাহিসাব-নিরীক্ষকের দপ্তরকে স্বাধীনভাবে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।  বিএনপি এই বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতে রাখার পক্ষে মত দিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল।

৪. তত্ত্বাবধায়ক সরকার – পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ

বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিদার।

কিন্তু জুলাই সনদের র‍্যাংকড চয়েজ ভোটিং বা বিচার বিভাগের সম্পৃক্ততার ফর্মুলায় তাদের আপত্তি আছে। তাদের মতে, এই সিদ্ধান্ত সংসদই নেবে।

রাজনীতিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ মানে যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনার দরজা খোলা রাখা।

যেখানে সবাই একমত না হয়েও একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকে।