ঢাকা, ১৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার, ২০২৬ || ১ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food

কাঁটায় ভরা পথ মাড়িয়ে ক্ষমতার মসনদে বসছেন তারেক রহমান?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৩৩ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। রাজনৈতিক নির্বাসনের ১৭ বছরের ধূসর প্রহর পেরিয়ে, মায়ের মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে, এক উত্তাল নির্বাচনি বৈতরণী পার হয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে বসতে চলেছেন তারেক রহমান। সাধারণ নির্বাচনে তার মধ্য-ডানপন্থী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তিনিই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তার মা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত।  

৬০ বছর বয়সী তারেক রহমানের জীবন যেন এক রাজনৈতিক মহাকাব্য। যার প্রতিটি পাতায় রয়েছে উত্থান, পতন, ষড়যন্ত্র আর টিকে থাকার লড়াই। তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি ছিলেন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা। মা বেগম খালেদা জিয়া, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এমন এক পরিবারের সন্তান হিসেবে রাজনীতি তার রক্তেই মিশে আছে। কিন্তু এই পথচলা কখনো ফুলের মতো ছিল না।

কাঁটায় ভরা পথ

রাজনীতির মূল স্রোতে তারেক রহমানের আগমন ঘটেছিল ২০০১ সালে, মায়ের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা আরোহণের সময়। ২০০২ সালেই দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন তিনি। কিন্তু শুরু থেকেই তাকে ঘিরে ছিল বিতর্ক। বিরোধী শিবির একে ‘পরিবারতন্ত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ’ বলে আখ্যা দেয়। দলের ভেতরে শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে পেয়েছিলেন ‘হ্যাচেট ম্যান’-এর তকমা। ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে বারবার, যদিও বরাবরই তা অস্বীকার করে এসেছেন তারেক রহমান। তার অনুসারীদের বিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তাকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছিল।

অন্ধকার অধ্যায় ও দীর্ঘ নির্বাসন

তারেক রহমানের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় শুরু হয় ২০০৭ সালে। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে থাকাকালে তার ওপর নির্মম নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন তিনি।

দীর্ঘ ১৮ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য পাড়ি জমান লন্ডনে। তখন শোনা গিয়েছিল, রাজনীতি থেকে দূরে থাকার অলিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েই দেশ ছাড়ার অনুমতি পেয়েছিলেন হবু প্রধানমন্ত্রী।

এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৭টি বছর। দেশের মাটিতে পা পড়েনি তার। কিন্তু শরীর লন্ডনে থাকলেও মন ও মস্তিষ্ক পড়ে ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে। সুদূর প্রবাস থেকেই দলের কলকাঠি নেড়েছেন, দিয়েছেন কৌশলগত নির্দেশনা। ২০১৮ সালে মা খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনিই হয়ে ওঠেন ঐক্যের প্রতীক।

’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলেও তার অনুপস্থিতিতে চলেছে একাধিক মামলা। ২০০৪ সালের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা মামলায়ও তাকে দণ্ড দেওয়া হয়েছিল, যদিও পরে তিনি সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। ছবি : সংগৃহীত।

প্রত্যাবর্তন এবং নতুন সূচনা

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় তিনি হারান মাকে। মাতৃবিয়োগের গভীর শোক বুকে নিয়েই ৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটা ছিল এক প্রকার অবধারিতই।

তবে স্বজনপ্রীতির পুরোনো অভিযোগ আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যদিও দলের সিনিয়র নেতা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে বিবিসিকে বলেন, “আপনি রাজবংশ থেকে এসেছেন কি না, সেটা অপ্রাসঙ্গিক।”

তার মতে, হাসিনা সরকারের আমলে বিএনপি এতটাই কোণঠাসা ছিল যে, জিয়া পরিবারের বাইরে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগই ছিল না।

সাধারণ নির্বাচনে তার মধ্য-ডানপন্থী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় তারেক রহমানই হতে যাচ্ছেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। ছবি : সংগৃহীত। 

নেতা থেকে কি হবেন রাষ্ট্রনায়ক?

এখন তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদের ভাষায়, “তারেক রহমান রাজনীতির অন্ধকার দিক দেখেছেন, আবার সংঘাত ও প্রতিশোধের রাজনীতিও প্রত্যক্ষ করেছেন।”

সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে তিনি কি পারবেন ব্যক্তিগত আক্রমণ ও প্রতিহিংসার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে? কেবল দলীয় নেতা থেকে নিজেকে একজন জাতীয় নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে? তার হাত ধরেই কি বিএনপি ফিরে পাবে তার পুরোনো গৌরব?

আপাতত, বাংলাদেশ এক নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায়, যার কাঁধে রয়েছে এক সাগর বিতর্ক এবং পাহাড়সম প্রত্যাশা।