ঢাকা, ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ২৯ মাঘ ১৪৩২
good-food
৪৩

গণভোটের সহজপাঠ

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২২:০০ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বেশিরভাগ মানুষের ধারণা থাকলেও অনেকের কাছে গণভোটের ধারণা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও গণভোট ২০২৬ এবং সংসদ নির্বাচন, দেশের চাবি আপনার হাতে’ স্লোগানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের প্রচারণা চালাচ্ছে সরকার। চলুন জেনে নিই এবারের জাতীয় নির্বাচনে ‘গণভোট’ এর আদ্যপান্ত।  

কেন এই গণভোট?

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি মৌলিক রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের দাবি জোরদার হয়। ওই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটেই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নামে একটি সার্বিক রাজনৈতিক ও সংবিধান সংস্কার রূপরেখা প্রণীত হয়, যাতে আছে রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভারসাম্য পুনঃস্থাপন, সরকারি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক সংস্কার, নাগরিক অধিকার সম্প্রসারণ ইত্যাদি বিষয়। এই সনদটি বাস্তবায়নের জন্য গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যাতে জনগণের সরাসরি মত পাওয়া যায়।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। 

এই গণভোট কী বিষয়ে?

সংক্ষেপে বললে-

১) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো জুলাই সনদের নিয়মে গঠন করা হবে কি না।

২) আগামী সংসদ দুই কক্ষবিশিষ্ট (একটি নিম্নকক্ষ ও একটি আনুপাতিকভাবে গঠিত উচ্চকক্ষ) হবে কি না।

৩) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধীদলীয় সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকার ইত্যাদি বাস্তবায়ন করা হবে কি না।

৪) জুলাই সনদের অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে কি না।

অর্থাৎ যদিও ব্যালটে শুধুই “হ্যাঁ/না” এর অপশন আছে, কিন্তু এর পেছনে একটি বর্ধিত সংবিধান সংশোধন ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাবের প্যাকেজ আছে।

কী থাকবে ব্যালট পেপারে?

ব্যালট বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠে প্রতীকে ছাপা একটি কাগজ। সাধারণত জাতীয় নির্বাচনে এমন একটি কাগজ দেশের বেশিরভাগ মানুষ দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু এবারের জাতীয় নির্বাচনে ব্যালট থাকবে দুটি। দুটি ব্যালটের একটি দিয়ে ফয়সালা হবে গণভোটের বিষয়টি। আরেকটি দিয়ে প্রার্থি নির্বাচন। গণভোট বিষয়ক ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ঘর থাকবে। সেখানে হ্যাঁ ঘরের পাশে টিক চিহ্ন এবং না এর ঘরের পাশে ক্রস চিহ্ন থাকবে। যে কোনো একটিতে সিল দিতে হবে। তার আগে নিম্নে উল্লিখিত বিবরণটি পড়ে নিতে হবে-

‘আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে নিম্নলিখিত সাংবিধানিক সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?’ (হ্যাঁ/না)

ক. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হইবে।

খ. আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষবিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হইবে এবং সংবিধান সংশোধন করিতে হইলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হইবে।

গ. সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধীদল হইতে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হইয়াছে- সেগুলো বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করিতে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকিবে।

ঘ. জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হইবে।

এবার যেভাবে গণভোট দেবেন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদ ২০২৫ অনুমোদনের জন্য জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ভোট দেবেন নিম্নের প্রক্রিয়ায়-

১. ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হলে আপনাকে দুটি ব্যালট দেওয়া হবে। একটি সাদা অন্যটি গোলাপি।

২. সাদা ব্যালট এমপি প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য, আর গোলাপি ব্যালট গণভোটের জন্য।

৩. দুটি ব্যালটে আলাদা সিল মেরে একই বাক্সে রাখতে হবে।

৪. এমপি প্রার্থীদের ভোট দেবেন তার প্রতীক বা মার্কায় সিল মেরে। আর গণভোটের ব্যালটে সিল দেবেন ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ এর ওপর।

৫. অথবা ব্যালটের হ্যাঁ চিহ্নিত স্থানে ব্যালটে টিক (√) চিহ্ন অথবা না চিহ্নিত স্থানে টিক (√) চিহ্ন দিতে হবে।

যা থাকবে গণভোটের ব্যালটে। 

‘হ্যাঁ’ দিলে কী হবে?

যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হয়, তাহলে:

•     জুলাই জাতীয় সনদ ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হবে।

•     প্রথম ১৮০ দিনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন হবে।

•     ওই পরিষদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনগুলো সম্পন্ন করবে।

•     ফলস্বরূপ ভবিষ্যতের রাজনীতি ও প্রশাসনে নতুন কাঠামো, ক্ষমতার বিভাজন জোরদার এবং নাগরিক অধিকার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

‘না’ দিলে কী হবে?

যদি ‘না’ ভোট জয়ী হয়, তাহলে-

•     ওই পরিকল্পিত সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবগুলোর বাধ্যতামূলক বাস্তবায়নের কোন বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

•     সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামো বর্তমান প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরিচালিত হবে এবং ভবিষ্যতে যে-কোনো সরকার, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনুযায়ী সংস্কার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

এই গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ— কারণ এটি সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সংবিধান সংশোধনের মত একটি ব্যাপক রাজনৈতিক পুনর্গঠনের প্রশ্নকে জনগণের সামনে নিয়ে এসেছে। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’–তে শুধু ভোট নয়, ভবিষ্যতের রাষ্ট্র কাঠামো ও ক্ষমতা বিভাজনের রূপরেখা নির্ধারণের সুযোগও এখানে নিহিত।

ভোটের সব খবর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর