ঢাকা, ৩০ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০২৬ || ১৭ মাঘ ১৪৩২
good-food
১০

যদি গণভোটে ‘না’ জয়ী হয়, তবে কি ঘটবে?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:৫৯ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬  

আসন্ন জাতীয় গণভোটের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, যে যদি গণভোটে ‘না’ জয়ী হয়, তবে কী ঘটবে?

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ‘হ্যাঁ’ জয়ী করতে ব্যাপক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এই অবস্থায় সংস্কার প্রস্তাবগুলো যদি জনসমর্থন না পায়, তবে ‘জুলাই চুক্তি’ এবং চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে।

সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের ফলাফল আইনত বাধ্যতামূলক না হলেও এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। কেউ কেউ মনে করছেন, ‘না’ জয়ী হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আবার অনেকের মতে, এটি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।

বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট হেরে গেলে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। এতে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা থমকে যেতে পারে। কেননা নতুন সরকারের কাছে তখন যুক্তি থাকবে- জনগণ চায়নি "হ্যাঁ" জিতে যাক। অন্তর্বর্তী সরকার "হ্যাঁ" কে বিজয়ী দেখবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে এবং এতে আন্তর্জাতিক মহলেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, বিদেশি প্রভাবও এই ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেকের দৃষ্টিতে, একটি ফ্যসিবাদী কাঠামো রুখতে এই সংস্কারগুলো অত্যন্ত জরুরি।

অন্যদিকে, ‘না’ ভোটের ফলে দেশে স্বৈরতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরির আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা—‘হ্যাঁ’ ভোটের পরাজয় দেশে নতুন করে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা ডেকে আনতে পারে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়ে পরিস্থিতি সহিংস সংঘাতের দিকে মোড় নিতে পারে। স্বার্থান্বেষী কোনো কোনো মহল নিজেদের ফায়দা লুটতে এ সময় বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

‘হ্যাঁ’ ভোটের পরাজয় শুধু সরকারের জন্যই নয়, বিরোধী দলগুলোর জন্যও ক্ষতির কারণ হতে পারে। ফলে রাজনীতি আরও খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে একেক গোষ্ঠী একেক এজেন্ডা নিয়ে কাজ করবে।

তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই গণভোটের আইনি ভিত্তি বেশ সীমিত। সংবিধান অনুযায়ী, কেবল সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রেই গণভোট বাধ্যতামূলক। রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নে আইনগতভাবে গণভোটের প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ, ‘না’ ভোট জয়ী হলেও জুলাই চুক্তির সংস্কারগুলো আইনত বাতিল হয়ে যাবে না। তবে এগুলোর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বা নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে, যা পরবর্তী সংসদের জন্য সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন করে তুলবে।

মূলত ‘জুলাই চুক্তি’ কোনো আইনি চুক্তি নয়, বরং একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার। তাই ‘না’ ভোট জয়ী হলে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে বা পরিস্থিতির সাথে সংগত রেখে চুক্তিতে সংশোধন আনতে পারে। শেষ পর্যন্ত সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে, যদি "না" জয়ী হয়, নতুন সংসদের সদিচ্ছার ওপর।

অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বড় কোনো সংস্কার সফল হয় না। এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদের কারণে অনেক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। অর্থাৎ, জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া সংস্কারের পথে বাধা আসবেই।

ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, গণভোটে ‘না’ জয়ী হওয়া মানেই সংস্কারের পথ রুদ্ধ হওয়া নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণ নতুন এক সাংবিধানিক যাত্রার সূচনা করে। যেমন—চিলিতে ১৯৮৮ সালে পিনোশের স্বৈরশাসনের বিপক্ষে ‘না’ ভোট শেষ পর্যন্ত দেশটিকে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের পথে নিয়ে যায়। ফ্রান্সে ২০০৫ সালে ইউরোপীয় সংবিধানের খসড়া জনমতে প্রত্যাখ্যাত হলেও পরবর্তীতে ‘লিসবন চুক্তি’র মাধ্যমে সেই কাঠামোগত পরিবর্তনগুলোই বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। একইভাবে আয়ারল্যান্ডে লিসবন চুক্তির বিপক্ষে প্রথম দফায় ‘না’ভোট পড়লে ইইউ আয়ারল্যান্ডকে বিশেষ সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা দিতে বাধ্য হয়, যা দেশটির সাংবিধানিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনে। বলিভিয়ায় ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবে জনগণ ‘না’ বললেও আদালত তা বাতিল করে দেয়, যা দেশটিতে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নেতৃত্বের কাঠামো বদলে দেয়। আবার কেনিয়ায় ২০০৫ সালে বিতর্কিত সংবিধান সংস্কার প্রস্তাব ‘না’ ভোটে বাতিল হওয়ার পর সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটই দেশটিকে ২০১০ সালে একটি প্রগতিশীল ও সম্পূর্ণ নতুন সংবিধানের দিকে ধাবিত করে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে, গণভোটের তাৎক্ষণিক ফলাফল যা-ই হোক না কেন, রাজনৈতিক সংকট বা জনদাবি অনেক সময় সংসদ কিংবা আদালতের মাধ্যমে সংবিধানের আমূল পরিবর্তন নিশ্চিত করে। 

পরিশেষে বলা যায়, গণভোটে ‘না’ জয়ী হওয়া মানেই সব শেষ হয়ে যাওয়া নয়। মূল চ্যালেঞ্জ হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য—তারা কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে বের করেন। জুলাই চুক্তি বা সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত জনগণ ও তাদের প্রতিনিধিদের ওপরই নির্ভর করছে।

ভোটের সব খবর বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর