ঢাকা, ২১ জানুয়ারি বুধবার, ২০২৬ || ৭ মাঘ ১৪৩২
good-food
১৫

রিস্টার্ট দিলে ফোন-কম্পিউটার ঠিক হয়ে যায় কেন?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:২৬ ২০ জানুয়ারি ২০২৬  

আপনি অফিসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করছেন, এমন সময় আপনার কম্পিউটারটি স্থির হয়ে গেল। অথবা, জরুরি প্রয়োজনে কাউকে কল করতে গিয়ে দেখলেন আপনার স্মার্টফোনটি হ্যাং হয়ে গেছে, কোনোভাবেই কাজ করছে না। এই বিরক্তিকর পরিস্থিতিতে আমরা সবাই কমবেশি পড়েছি। আর এমন হলে আমাদের চিরচেনা সমাধান হলো ডিভাইসটি রিস্টার্ট দেওয়া। অবাক করা বিষয় হলো, বেশিরভাগ

ক্ষেত্রেই এই সহজ কৌশলটি ম্যাজিকের মতো কাজ করে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, কেন একটি রিস্টার্ট বা রিবুট আমাদের ডিভাইসের অনেক সমস্যা সমাধান করে দেয়? এর পেছনে রয়েছে কিছু শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক কারণ। চলুন, সেই রহস্যের গভীরে যাওয়া যাক।

র‍্যাম এর মুক্তি এবং মেমোরি লিক

আপনি যখন কোনো অ্যাপ ব্যবহার করেন, গেম খেলেন বা এমনকি সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করেন, তখন আপনার ডিভাইসের সমস্ত অস্থায়ী ডেটা র‍্যান্ডম অ্যাক্সেস মেমোরি বা র‍্যামে  জমা হয়। এটি ডিভাইসকে দ্রুত কাজ করতে সাহায্য করে। তবে, কিছু সফটওয়্যার বা অ্যাপ সঠিকভাবে তৈরি করা হয় না। কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও এগুলো র‍্যামের একটি অংশ দখল করে রাখে এবং ছাড়তে চায় না। এই ঘটনাকে প্রযুক্তিগত ভাষায় "মেমোরি লিক" বলা হয়। যখন একাধিক অ্যাপ এভাবে র‍্যামের জায়গা নষ্ট করতে থাকে, তখন আপনার ডিভাইস ধীর হয়ে যায় বা হ্যাং করে।

যখন আপনি ডিভাইসটি রিস্টার্ট করেন, তখন র‍্যামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে সেখানে জমে থাকা সমস্ত অস্থায়ী ডেটা মুছে যায়।কম্পিউটার বা ফোনটি আবার চালু হলে এটি একটি পরিষ্কার "স্লেট" নিয়ে কাজ শুরু করে, ঠিক যেন নতুন করে জেগে উঠেছে।এতে মেমোরি লিকের সমস্যা দূর হয় এবং ডিভাইসটি তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পায়।

সফটওয়্যারের ভুল অবস্থা থেকে মুক্তি

আমাদের ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো মূলত একটি "স্টেট" বা অবস্থা ভিত্তিক যন্ত্র, যা ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট যুক্তি মেনে কাজ করে। সহজভাবে বললে, এটি একটি প্রোগ্রামের ধাপ ১ থেকে ২, তারপর ৩—এভাবে এগোতে থাকে। কিন্তু অনেক সময় সফটওয়্যারের কোডিংয়ে থাকা ত্রুটি বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনার কারণে প্রোগ্রামটি এমন একটি অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখান থেকে সামনে যাওয়ার কোনো নির্দেশনা তার কাছে থাকে না।  ফলে সফটওয়্যারটি আর কোনো কাজ করতে পারে না, যাকে আমরা হ্যাং হয়ে যাওয়া বলি। রিস্টার্ট করলে সেই প্রোগ্রামটি বন্ধ হয়ে যায় এবং আবার প্রথম থেকে শুরু হয়, যা এটিকে একটি পরিচিত এবং কার্যকরী অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।

হার্ডওয়্যার ড্রাইভারের পুনঃস্থাপন

কম্পিউটারের বিভিন্ন অংশ যেমন—মাউস, কিবোর্ড, গ্রাফিক্স কার্ড বা ফোনের টাচস্ক্রিন—এগুলো হার্ডওয়্যার। এই হার্ডওয়্যারগুলোর সাথে অপারেটিং সিস্টেম বা সফটওয়্যারের যোগাযোগের জন্য ড্রাইভার নামক একটি বিশেষ সফটওয়্যার কাজ করে। একটানা দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলে অনেক সময় এই ড্রাইভারগুলো ক্র্যাশ করে বা ঠিকমতো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে স্ক্রিন জমে যেতে পারে বা কোনো ইনপুট কাজ করে না। যখন আপনি ডিভাইসটি রিস্টার্ট করেন, তখন অপারেটিং সিস্টেম নতুন করে হার্ডওয়্যারগুলোকে পরীক্ষা করে এবং প্রয়োজনীয় ড্রাইভারগুলো পুনরায় লোড করে। এর ফলে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের মধ্যে সংযোগ আবার সঠিকভাবে স্থাপিত হয়।

জম্বি প্রসেসের অবসান

অনেক সময় আমরা কোনো অ্যাপ বন্ধ করে দিলেও সেটি পুরোপুরি বন্ধ হয় না এবং ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে। এই ধরনের প্রক্রিয়াগুলোকে "জম্বি প্রসেস" বলা হয়। এগুলো সরাসরি র‍্যাম দখল না করলেও প্রসেসরের শক্তি খরচ করতে থাকে এবং সিস্টেমকে ধীর করে দেয়। সাধারণ টাস্ক ম্যানেজারে অনেক সময় এগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায় না। রিস্টার্ট করা হলে এই সব লুকিয়ে থাকা জম্বি প্রসেসগুলো বন্ধ হয়ে যায়, কারণ বিদ্যুৎ প্রবাহ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে সব চলমান প্রক্রিয়া থেমে যায়।

সাধারণ রিস্টার্ট বনাম হার্ড রিসেট

তবে সব সময় সাধারণ রিস্টার্টে (সফট রিস্টার্ট) কাজ হয় না। তখন অনেক সময় ডিভাইসের প্লাগ খুলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলা হয়। একে "হার্ড রিসেট" বা "পাওয়ার সাইক্লিং" বলা হয়। আধুনিক ডিভাইসগুলো বন্ধ করার পরেও অনেক সময় স্ট্যান্ডবাই মোডে থাকে এবং এর ভেতরের ক্যাপাসিটরগুলোতে সামান্য বিদ্যুৎ জমা থাকে। এই বিদ্যুৎটুকুও কিছু মেমোরি বা ভুল ডেটা ধরে রাখতে পারে। পাওয়ার প্লাগ খুলে ১০-১৫ সেকেন্ড অপেক্ষা করলে ক্যাপাসিটরগুলো সম্পূর্ণ ডিসচার্জ হয়ে যায়, যা ডিভাইসটিকে একেবারে প্রাথমিক অবস্থা থেকে শুরু করতে সাহায্য করে। নেটওয়ার্ক বা আইপি অ্যাড্রেসের সমস্যা সমাধানে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর।

মহাজাগতিক রশ্মির অদ্ভুত প্রভাব

শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, মহাকাশ থেকে আসা উচ্চ-শক্তিসম্পন্ন কণা বা কসমিক রে আপনার ডিভাইসের প্রসেসর বা মেমোরির কোনো একটি বিটের মান (০ থেকে ১ বা ১ থেকে ০) বদলে দিতে পারে। এই ঘটনাকে "সিঙ্গেল ইভেন্ট আপসেট"  বলা হয়। এর ফলে কম্পিউটারে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিতে পারে, যেমন বিখ্যাত ব্লু-স্ক্রিন অফ ডেথ। 

যদিও এটি খুবই বিরল একটি ঘটনা, রিস্টার্ট করলে এই পরিবর্তিত বিটগুলো তাদের আগের অবস্থায় ফিরে আসে এবং সমস্যাটির সমাধান হয়ে যায়।

এছাড়াও, রিস্টার্ট করলে ডিভাইসের হার্ডওয়্যার ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় এবং পেন্ডিং থাকা গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম আপডেটগুলো ইনস্টল হতে পারে, যা ডিভাইসের কর্মক্ষমতা এবং নিরাপত্তা বাড়াতে সাহায্য করে।

সুতরাং, পরেরবার যখন আপনার ডিভাইসটি সমস্যায় পড়বে, তখন দ্বিধা না করে রিস্টার্ট দিন। কারণ এই সহজ কাজটি আপনার ডিভাইসের অনেক জটিল সমস্যার এক মুহূর্তের সমাধান।