ঢাকা, ০৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
good-food
৪৬

`সিনেমা আমার পেশা, লাইফস্টাইল নয়`

নিজ জমিতে চাষ করতেন নানা পাটেকর

অনন্য আজিজ নিবিড়, আনোয়ার হক

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৫:৪৮ ৮ অক্টোবর ২০২৬  

 

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আর এই মানুষ বলতে আমরা বাহ্যিক একটা অবয়বকে দেখি। কিন্তু স্বাতন্ত্র্য। এখানেই নিজস্বতা, অনন্য কিছুর সম্মিলন। চেহারা কিংবা কণ্ঠ। উপস্থাপন কিংবা ব্যক্তিত্ব!

 

এগুলোর সব দিক বিবেচনায় নিলে অন্যরকম এক মানুষ, প্রচলিত ধাঁচের - প্রচলিত ছাঁচের বাইরে বৈচিত্র আর বিস্ময়ে ভরা অন্যরকম এক চরিত্র, অন্যরকম এক অভিনেতার নাম নানা পাটেকর। অভিনয়ের জন্য যার জন্য দরকার পড়তো না প্রচলিত ভারি মেকআপ, পোশাক কিংবা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের। তিনি নিজেই পুরো একটা চরিত্রের পূর্ণ বহি:প্রকাশ। কণ্ঠ আর উপস্থিতির ভিন্নতা তাকে এনে দেয় আলাদা এক অভিনয় শিল্পীর পরিচয়। যা একেবারেই একক, অনন্য, অসাধারণ।

 

আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম শক্তিশালী, প্রভাবশালী এবং ব্যতিক্রমী অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। অভিনয়ে অনন্য সংলাপ বলার শৈলী, তীব্র অভিব্যক্তি এবং বাস্তবসম্মত অভিনয়ের মাধ্যমে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে এক অবিস্মরণীয় স্থান তৈরি করেছেন এই অসাধারণ গুণী শিল্পী।

 

জন্ম - ১৯৫১ সালে ১ জানুয়ারি, মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জানজিরায় এক সাধারণ মারাঠি পরিবারে।  পিতা দিনকর পাটেকর ছিলেন ছোট একজন বস্ত্র ব্যবসায়ী এবং টেক্সটাইল পেইন্টার।

 

নানা’র শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁদের পরিবার সমস্ত সম্পত্তি হারিয়ে তীব্র অর্থকষ্টে পড়ে। এ সময় নিজের পড়াশোনা ও বেঁচে থাকার তাগিদে মাসে মাত্র ৩৫ টাকার বিনিময়ে বলিউডের সিনেমার পোস্টার পেইন্টিংয়ের কাজ শুরু করেন নানা।

 

শত প্রতিকূলতার মাঝেও মুম্বাইয়ের বিখ্যাত স্যার জে. জে. ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড আর্ট থেকে কমার্শিয়াল আর্টের ওপর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন নানা। অভিনয়ে আসার আগে তিনি বিজ্ঞাপনী সংস্থায় একজন পেশাদার ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট হিসেবেও কাজ করেছেন।

 

সাংস্কৃতিক জীবন

নানা পাটেকরের অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল তাঁর বাবার হাত ধরে, যিনি নিজে নাটক পছন্দ করতেন এবং নানাকে নাটক দেখতে উৎসাহিত করতেন। জে. জে. আর্ট ইনস্টিটিউটে পড়ার সময় থেকেই তাঁর থিয়েটারের প্রতি আগ্রহ তীব্র হয়। মূলত মারাঠি থিয়েটার বা নাট্যমঞ্চের মাধ্যমে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবন শুরু করেন নানা। প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব বিজয়া মেহতা তাঁর পরিচালিত প্রথম নাটকে তাকে অভিনয়ের সুযোগ করে দেন। থিয়েটারের এই কঠোর শৃঙ্খলা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

 

অভিনয় জীবন ও চলচ্চিত্র যাত্রা

১৯৭৮ সালে মারাঠি ছবি গদদ ঝালি এবং হিন্দি ছবি গমন-এর মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্র জীবন শুরু। ১৯৮৮ সালে মীরা নায়ারের একাডেমি পুরস্কার মনোনীত ছবি সালাম বম্বে-তে তাঁর অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়। তবে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৯৮৯ সালের অপরাধমূলক ড্রামা ফিল্ম ‘পরিন্দা’। এই ছবিতে এক মানসিক বিকারগ্রস্ত গ্যাংস্টারের চরিত্রে তাঁর হিংস্র ও তীব্র অভিনয় তাঁকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয়।

 

নব্বইয়ের দশকে বেশ কিছু বাণিজ্যিকভাবে সফল ও সমালোচক-ধন্য চলচ্চিত্র উপহার দেন নানা পাটেকর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক (১৯৯১ - নিজেই পরিচালনা করেন), অঙ্গার (১৯৯২), তিরঙ্গা (১৯৯৩), ক্রান্তিবীর (১৯৯৪), অগ্নি সাক্ষী (১৯৯৬) এবং খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬)। বিশেষ করে ক্রান্তিবীর ছবিতে তাঁর অনবদ্য সামাজিক প্রতিবাদী মনোলগ ও সংলাপ প্রক্ষেপণ আজও আইকনিক হিসেবে বিবেচিত।

 

নানা পাটেকারের জীবন ছিল বহুমাত্রিকতায় পূর্ণ। গম্ভীর ও রাগী চরিত্রের বাইরেও তিনি যে দারুণ কমেডি করতে পারেন, তা প্রমাণ করেন ২০০৭ সালের ব্লকবাস্টার ছবি ওয়েলকাম-এ ডন 'উদয় শেঠি' চরিত্রে অভিনয় করে। এরপর রাজনীতি (২০১০) এবং মারাঠি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র নাটসম্রাট (২০১৬)-এ একজন অবসরপ্রাপ্ত থিয়েটার অভিনেতার চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের চোখে জল এনে দিয়েছিল। তাঁর শেষ অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্য ভ্যাকসিন ওয়ার (২০২৩) এবং ২০২৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ও রোমিও।

 

চলচ্চিত্র এবং অভিনয়ের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য নানা পাটেকর ভারতের রাষ্ট্রীয় ও চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কারগুলোতে ভূষিত হয়েছেন।

 

পদ্মশ্রী (২০১৩): শিল্পকলা ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রী-তে ভূষিত করে।

 

এছাড়া পেয়েছেন তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এগুলো হলো: পরিন্দা (১৯৮৯) - শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা, ক্রান্তিবীর (১৯৯৪) - শ্রেষ্ঠ অভিনেতা এবং অগ্নি সাক্ষী (১৯৯৬) - শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা।

 

তিনি বলিউডের একমাত্র অভিনেতা যিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (ক্রান্তিবীর), শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা (পরিন্দা) এবং শ্রেষ্ঠ খলনায়ক (অঙ্গার ও অপহরণ) - এই তিনটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতেই ফিল্মফেয়ার জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।

 

প্রহার চলচ্চিত্রের জন্য ৩ বছর সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি ভারতীয় টেরিটোরিয়াল আর্মিতে যোগ দেন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টের সাথে সক্রিয়ভাবে সীমান্তে মেজর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে ভূষিত হন।

 

১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক সিনেমাটি ছিল নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মাইলফলক। এটি কেবল তাঁর পরিচালিত প্রথম সিনেমাই ছিল না, বরং হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে সামরিক জীবনের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত চিত্রায়ণও ছিল। এই ছবির নেপথ্যে রয়েছে নানার চরম আত্মত্যাগ ও কঠোর সামরিক সাধনার গল্প।

 

সিনেমায় একজন কঠোর আর্মি কমান্ডো ইন্সপেক্টর (মেজর প্রতাপ চৌহান) চরিত্রের নিখুঁত রূপায়ণের জন্য নানা পাটেকর কোনো ডামি বা শর্টকাট পথ বেছে নেননি। তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রি (Maratha Light Infantry) রেজিমেন্টের সাথে টানা ৩ বছর কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ নেন।

 

যখন তিনি এই ট্রেনিং শুরু করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৪০ বছর। এই বয়সেও তিনি তরুণ জওয়ানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিদিনের ড্রিল, দূরপাল্লার ট্রেকিং, আধুনিক অস্ত্র চালনা এবং বিপজ্জনক কমান্ডো মহড়া সম্পন্ন করেন। তাঁর শৃঙ্খলা ও পারদর্শিতা দেখে ভারতীয় সেনাবাহিনী এতটাই মুগ্ধ হয়েছিল যে, ট্রেনিং পিরিয়ডের একপর্যায়ে তিনি সেখানে অন্যান্য ক্যাডেটদের ইন্সপেক্টর বা ট্রেইনার হিসেবেও কিছু সময় দায়িত্ব পালন করেন।

 

এই কঠোর ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে ১৯৯৯ সালে। কার্গিল যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন নানা পাটেকর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি সরাসরি তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্দেজের সাথে যোগাযোগ করে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি চান। প্রথমে বেসামরিক নাগরিক হিসেবে তাঁকে অনুমতি দেওয়া না হলেও, নানার ৩ বছরের সামরিক ট্রেনিংয়ের রেকর্ড দেখে মন্ত্রী অবাক হন এবং তাঁকে বিশেষ অনুমতি দেন। তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মির অনারারি ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) হিসেবে লাইন অব কন্ট্রোল (LoC)-এর অত্যন্ত বিপজ্জনক এলাকা - দ্রাস, কুপওয়ারা, বারামুল্লায় প্রায় দুই মাস কুইক রিঅ্যাকশন টিম (QRT)-এর সাথে সক্রিয়ভাবে কাটান এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁর ২০ কেজি ওজন হ্রাস পেয়েছিল।

 

নানা পাটেকরের অভিনয় জীবন যতটা তীব্র ও প্রভাবশালী ছিল, তাঁর নেপথ্যের গল্প এবং বাস্তব জীবনের নানা ঘটনা সিনে দুনিয়ায় ঠিক ততটাই ঝড় তুলেছিল। স্পষ্টভাষী, আপসহীন এবং প্রচণ্ড রাগী স্বভাবের জন্য পরিচিত এই অভিনেতা বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু কাণ্ড ঘটিয়েছেন, যা বলিউডের ইতিহাসে আজীবন চর্চিত হবে।

 

বিধু বিনোদ চোপড়ার কলার চেপে ধরা

১৯৮৯ সালের কালজয়ী ছবি পরিন্দা-র শুটিংয়ের সময় পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়ার সাথে নানা পাটেকরের বড় ধরনের সংঘাত ঘটে। একটি সিরিয়াস দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় পরিচালকের নির্দেশনা পছন্দ না হওয়ায় নানা এতটাই রেগে যান যে, তিনি সেটের মধ্যেই বিধু বিনোদ চোপড়ার শার্টের কলার ধরে বসেন। এই মারমুখী কাণ্ড দেখে পুরো সেটে হঠাৎ ঝড় ওঠে। তবে মজার বিষয় হলো, পরবর্তীতে এই সংঘাতের পরও সিনেমাটির কাজ বন্ধ হয়নি এবং নানার সেই মারকুটে গ্যাংস্টার চরিত্রটিই তাঁকে প্রথম জাতীয় পুরস্কার এনে দেয়।

 

সহ-অভিনেত্রীকে সত্যি সত্যি চড়!

১৯৯৭ সালের অ্যাকশন-ড্রামা ছবি যশবন্ত-এর একটি দৃশ্যের শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকর তাঁর সহ-অভিনেত্রী মধুকে (Madhoo) কোনো পূর্বাবাস ছাড়াই দৃশ্যটিকে বাস্তবসম্মত করতে সেটের মাঝেই সত্যি সত্যি চড় মেরে বসেন! মধুও পেশাদার সীমানা লঙ্ঘনের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে নানাকে পাল্টা চড় মারেন। এই ঘটনাটি তখন বলিউডের অন্দরে ব্যাপক শোরগোল ফেলে দিয়েছিল।

 

'#MeToo' আন্দোলনের সূত্রপাত

বলিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঝড় তোলা ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালে, যখন অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত ২০০৮ সালের একটি সিনেমার সেটে নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ ও হেনস্থার অভিযোগ আনেন। এই অভিযোগের হাত ধরেই ভারতে '#MeToo' আন্দোলনের জোয়ার শুরু হয়, যা পুরো বিনোদন দুনিয়াকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। নানা অবশ্য শুরু থেকেই এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে আসছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে নানার বিরুদ্ধে করা মামলাটি খারিজ করে দেয়।

 

'ওয়েলকাম' ছবির আইকনিক "আলু লেলো" ডায়ালগের জন্ম

২০০৭ সালের ব্লকবাস্টার কমেডি ছবি ওয়েলকাম-এ ডন উদয় শেঠির চরিত্রে নানা পাটেকরের অভিনয় ছিল এক কথায় অনবদ্য। এই ছবির একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও মিম-ফেভারিট দৃশ্য হলো - যেখানে নানাকে রাস্তায় ঠেলাগাড়ি নিয়ে "আলু লেলো, কান্দা লেলো" (আলু নিন, পেঁয়াজ নিন) বলে চিৎকার করতে দেখা যায়। সম্প্রতি একটি রিয়্যালিটি শো-তে (কেবিসি ১৬) নানা প্রকাশ করেন যে, এই সংলাপটি কোনো পূর্বপরিকল্পিত বা স্ক্রিপ্টের অংশ ছিল না। দৃশ্যটির শুটিংয়ের সময় তিনি সম্পূর্ণ নিজের মতো করে (ইম্প্রোভাইজড) এই সংলাপটি দেন, যা পরিচালক আনিস বজমীর এতই পছন্দ হয় যে তিনি তা সিনেমায় রেখে দেন।

 

১.৫ কোটির লাক্সারি গাড়ি বাতিল করে কৃষকদের পাশে

পর্দার বাইরে নানার মানবিক রূপের নেপথ্যে একটি দারুণ গল্প রয়েছে। একবার তিনি নিজের জন্য প্রায় দেড় কোটি রুপি মূল্যের একটি বিলাসবহুল গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই মহারাষ্ট্রে খরার কারণে কৃষকদের একের পর এক আত্মহত্যার খবর তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে বিলাসবহুল গাড়ি কেনার পরিকল্পনা বাতিল করেন এবং সেই পুরো অর্থ খরা-পীড়িত কৃষক পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জন্য বিলিয়ে দেন তিনি। এই ঘটনাই পরবর্তীতে তাঁকে বিখ্যাত 'নাম ফাউন্ডেশন' গড়তে অনুপ্রাণিত করেছিল।

 

'নাম ফাউন্ডেশন' (NAAM Foundation)-এর মানবিক কার্যক্রম

পর্দার বাইরে নানা পাটেকর একজন বড় মানবিক মানুষ ও সমাজসেবক ছিলেন। ২০১৫ সালে তিনি 'নাম ফাউন্ডেশন' (NAAM Foundation) প্রতিষ্ঠা করেন, যা মহারাষ্ট্রের খরা-পীড়িত ও ঋণগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলোকে কোটি কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা ও পুনর্বাসনে কাজ করে আসছে।

 

নানা পাটেকর এবং আরেক জনপ্রিয় মারাঠি অভিনেতা মকরান্দ আনাসপুরে যৌথভাবে অলাভজনক এই ফাউন্ডেশনটি প্রতিষ্ঠা করেন। মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াদা ও বিদর্ভ অঞ্চলে তীব্র খরা এবং ঋণের দায়ে জর্জরিত কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা নানা পাটেকরকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। এই ফাউন্ডেশন কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে।

 

ফাউন্ডেশনের প্রাথমিক কাজ ছিল যেসব দরিদ্র কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। মৃত কৃষকদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা। নাম ফাউন্ডেশন হাজার হাজার বিধবা ও তাঁদের সন্তানদের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য সেলাই মেশিন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যবস্থা করেছে।

 

পানির চরম সংকটে থাকা ধোন্দলগাঁও, গোগালগাঁও, কুতুবখেদার মতো বেশ কিছু গ্রামকে এই ফাউন্ডেশন সম্পূর্ণ দত্তক নেয়। ট্যাঙ্কারের পানির ওপর নির্ভরশীল এই গ্রামগুলোতে স্থায়ী পানির ব্যবস্থা করে সেগুলোকে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর গ্রামে রূপান্তর করা হয়েছে।

 

নাম ফাউন্ডেশনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো পানির সংকট দূরীকরণ। তারা বিশাল জনঅংশগ্রহণের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় নদী ও খাল পুনরুজ্জীবিত (যেমন ওয়ার্ধার ধাম নদ) করেছে। শত শত কিলোমিটার নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে তারা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ফিরিয়ে এনেছে, যা লাখ লাখ কৃষকের চাষাবাদে নতুন জীবন দিয়েছে।

 

কৃষকদের পাশাপাশি দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করা ১০২ জনেরও বেশি সেনা শহীদের পরিবারকে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান ও সম্মাননা প্রদান করেছে এই ফাউন্ডেশন।

 

নানা পাটেকর তাঁর সিনেমা ও বিভিন্ন শো থেকে অর্জিত আয়ের একটি বিশাল অংশ (কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯০% পর্যন্ত) সরাসরি এই ফাউন্ডেশনে দান করে দিতেন। কোনো প্রচারের আলো বা ঢাকঢোল না পিটিয়ে সম্পূর্ণ নীরবে মাটি-মানুষদের জন্য কাজ করে গেছেন তিনি।

 

সমসাময়িক তারকাদের সাথে সম্পর্ক, বন্ধুত্বের গল্প

বলিউডে নানা পাটেকরের ব্যক্তিত্ব ছিল একদমই আলাদা। গ্ল্যামার দুনিয়ার জাঁকজমক থেকে দূরে থাকা, স্পষ্টবাদী এবং প্রচণ্ড আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এই মানুষের সাথে সমসাময়িক তারকাদের সম্পর্কও ছিল বেশ নাটকীয়। কারও সাথে ছিল দুই দশকের তীব্র অভিমান, আবার কারও সাথে গভীর ও আত্মিক বন্ধুত্ব।

 

যেমন, অনিল কাপুর। ১৯ বছরের সংঘাত থেকে "উদয়-মজনু"র অমর জুটি। নানা পাটেকর ও অনিল কাপুরের সম্পর্কটি বলিউডের অন্যতম আলোচিত ইকুয়েশন। ১৯৮৯ সালের ছবি পরিন্দা-তে প্রথমে অনিল কাপুরের বড় ভাইয়ের (জ্যাকি শ্রফের চরিত্রটি) চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল নানার। কিন্তু অনিল কাপুর সে সময় মনে করেছিলেন, নানা থাকলে তিনি নিজে ঢাকা পড়ে যেতে পারেন। তাই নানাকে বাদ দিয়ে জ্যাকি শ্রফকে নেওয়া হয় এবং নানাকে দেওয়া হয় ভিলেন 'আন্না'র চরিত্র। এই ঘটনায় নানা এতটাই ক্ষুব্ধ হন যে তিনি অনিল কাপুরের সাথে টানা ১৯ বছর কথা বলেননি এবং এক সাক্ষাৎকারে অনিলকে "বকোয়াস" (বাজে) লোকও বলেছিলেন।

 

তবে এই দীর্ঘ দূরত্বের অবসান ঘটে ২০০৭ সালে, যখন তাঁরা ওয়েলকাম (২০০৭) ছবিতে ডন 'উদয় শেঠি' ও 'মজনু ভাই' চরিত্রে একসাথে অভিনয় করেন। সেটের আড্ডা ও মেলবন্ধনে তাঁদের সেই পুরনো মান-অভিমান গলে জল হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নানা প্রকাশ্যেই অনিল কাপুরের কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও শক্তির প্রশংসা করে বলেন, "ও আজও যেভাবে কঠোর পরিশ্রম করে কাজ করে, তা প্রশংসনীয়"।

 

স্মিতা পাতিল: বলিউডে আসার নেপথ্যের কাহিনি

বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী স্মিতা পাতিল ছিলেন নানা পাটেকরের অভিনয় জীবনের অন্যতম বড় পথপ্রদর্শক ও শুভাকাঙ্ক্ষী। নানা যখন মূলত মারাঠি থিয়েটার ও নাট্যমঞ্চে মগ্ন, তখন স্মিতা পাতিল তাঁর পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হন। স্মিতাই নানাকে জোর দিয়ে বলেছিলেন যে তাঁর থিয়েটারের গণ্ডি পেরিয়ে হিন্দি মূল ধারার চলচ্চিত্রে আসা উচিত। স্মিতা পাতিলের সেই জহুরি চোখ এবং ক্রমাগত উৎসাহই থিয়েটারের নানাকে বলিউডের রূপালী পর্দায় নিয়ে আসে। নানা আজীবন স্মিতা পাতিলকে তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে শ্রদ্ধা করে গেছেন।

 

ঋষি কাপুর ও নাসিরুদ্দীন শাহ: সমসাময়িকদের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা

নাসিরুদ্দীন শাহের মতো সমসাময়িক প্যারালাল সিনেমার শক্তিশালী অভিনেতাদের সাথে নানার সম্পর্ক ছিল নিখাদ পারস্পরিক শ্রদ্ধার। যদিও স্ক্রিন স্পেস নিয়ে তাঁদের মধ্যে মাঝে মাঝে সুস্থ প্রতিযোগিতা হতো, পর্দার বাইরে তাঁরা একে অপরের কাজের দারুণ ভক্ত ছিলেন। যেমন, পরিন্দা ছবিতে আন্নার চরিত্রটি প্রথমে নাসিরুদ্দীন শাহের করার কথা থাকলেও তিনি ছেড়ে দেওয়ার পর নানা তা করেন এবং নিজের মতো করে চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলেন। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক ধারার চকলেট বয় ও পরে শক্তিশালী অভিনেতা ঋষি কাপুরের সাথেও নানার ব্যক্তিগত স্তরে চমৎকার ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

 

মনীষা কৈরালা: বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্কের গুঞ্জন

নব্বইয়ের দশকে নানা পাটেকরের ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে চর্চিত অধ্যায় ছিল অভিনেত্রী মনীষা কৈরালার সাথে সম্পর্ক। অগ্নি সাক্ষী (১৯৯৬) এবং খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল (১৯৯৬) ছবিতে একসাথে কাজ করার সময় তাঁদের বন্ধুত্ব বেশ গভীর আকার ধারণ করে। যদিও নানা বিবাহিত ছিলেন (পরবর্তীতে স্ত্রীর সাথে আলাদা হয়ে যান), তাঁদের মধ্যকার এই সমীকরণ নিয়ে বলিউডে দীর্ঘ গুঞ্জন ছিল। সিনেমাটির লেখক রণবীর পুস্প পরবর্তীতে উল্লেখ করেন যে, সেটে তাঁদের দুজনের বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব ছিল অত্যন্ত মজবুত ও পেশাদার, যা অন-স্ক্রিন কেমিস্ট্রিতেও ধরা পড়েছিল।

 

বলিউডের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বদের সাথেও নানা পাটেকরের ৪২ বছরেরও বেশি সময়ের গভীর ও আন্তরিক বন্ধুত্ব ছিল। প্রখ্যাত বাঙালি অভিনেতা অর্জুন চক্রবর্তী থেকে শুরু করে তপন সিনহা, গৌতম ঘোষের মতো গুণী পরিচালকদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত নিবিড়। নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত বাংলা ছবি বেলাশেষে-র গল্প নানাকে এতটাই ছুঁয়ে গিয়েছিল যে তিনি এর হিন্দি রিমেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। নানার মৃত্যুর পর অর্জুন চক্রবর্তী অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় তাঁর এই দীর্ঘদিনের বন্ধুর শৃঙ্খলাবোধ ও উদারতার কথা স্মরণ করেন।

 

বলিউডের ইঁদুর-দৌড় এবং পার্টি কালচার থেকে গুটিয়ে রাখা

বলিউডের চাকচিক্যময় জীবন, তথাকথিত "ইঁদুর-দৌড়" এবং লেট-নাইট পার্টি কালচার থেকে নানা পাটেকর নিজেকে আজীবন দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। গ্ল্যামার দুনিয়ায় থেকেও তাঁর এই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও বৈরাগ্যময় জীবনযাপনের নেপথ্যে বেশ কিছু গভীর ও বাস্তবসম্মত কারণ ছিল।

 

নানা পাটেকর তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং রগচটা স্বভাবের জন্য পরিচিত ছিলেন। একবার এক টক-শোতে (Legends Unplugged) তাঁর দীর্ঘদিনের সহ-অভিনেতা অনিল কাপুর তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তিনি কেন বলিউডের পার্টিতে যান না? এর উত্তরে নানা তাঁর স্বভাবসুলভ ঠোঁটকাটা ভঙ্গিতে বলেছিলেন: "মদ খাওয়ার জন্য আমার পার্টিতে যাওয়ার কী দরকার? ওটা তো আমি ঘরে বসেই খেতে পারি"। তিনি আরও খোলসা করে বলেন যে, বলিউডের পার্টিগুলোতে এমন কিছু "ঘটিয়া" বা মেকি মানুষ আসে, যারা মদ্যপ অবস্থায় আজেবাজে কথা বলে বা খারাপ আচরণ করে। নানার বক্তব্য ছিল, মদ্যপ লোকের সাথে যুক্তি চলে না, আর কেউ তাঁর সাথে খারাপ ব্যবহার করলে তিনি তাকে থাপ্পড় মারতেও দ্বিধা করবেন না। তাই নিজের মেজাজ ও আত্মসম্মান ধরে রাখতেই তিনি এই ধরনের সামাজিকতা এড়িয়ে চলতেন।

 

নানা পাটেকর খুব সাধারণ এক মারাঠি পরিবারে বড় হয়েছেন এবং মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে তীব্র দারিদ্র্যের মুখোমুখি হয়েছেন (যখন তিনি মাসে মাত্র ৩৫ টাকার বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার পেইন্টিং করতেন)। শৈশবের এই ক্ষুধা এবং লড়াই তাঁর মজ্জায় গেঁথে গিয়েছিল। তিনি মনে করতেন, বলিউডের জাঁকজমক এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন কৃত্রিম ও সাময়িক। তাই কোটি কোটি টাকা আয় করার পরও তিনি মুম্বাইয়ের একটি সাধারণ ৭৫০ স্কয়ার ফুটের ১-বিএইচকে অ্যাপার্টমেন্টে জীবন কাটিয়েছেন। তিনি সবসময় বলতেন, "সিনেমা আমার পেশা, আমার লাইফস্টাইল নয়"।

 

চাষাবাদ ও গ্রামীণ জীবনের প্রতি গভীর টান

মুম্বাইয়ের কোলাহল এবং পিআর কালচারের চেয়ে নানা পাটেকর পুনে ও গোয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর ফার্মহাউজে সময় কাটাতে বেশি ভালোবাসতেন। তিনি নিজের জমিতে ধান ও গম চাষ করতেন। গ্রামীণ জীবন, পশুপালন (কুকুর ও গরু চড়ানো) এবং নিজের হাতে রান্না করার মাঝেই তিনি জীবনের আসল আনন্দ খুঁজে পেতেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "শহরের চাকচিক্য আমাকে যা দিতে পারে না, গ্রামের সাধারণ জীবন আমাকে সেই মানসিক শান্তি ও জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে দেয়"।

 

প্রচারণার রাজনীতিকে ঘৃণা

বলিউডে টিকে থাকার জন্য যে ধরনের লবিং, প্রযোজকদের তোষামোদ করা বা সবসময় প্রচারের আলোয় থাকার প্রতিযোগিতা করতে হয়, নানা পাটেকর ছিলেন তার ঘোর বিরোধী। তাঁর মতে, অভিনয়ের প্রমাণ পর্দায় দিতে হয়, কোনো পার্টিতে গিয়ে নয়।

 

এক সাক্ষাৎকারে আফসোস করে বলেছিলেন, বলিউড নতুন কিছু তৈরি করার ক্ষমতা হারিয়ে কেবল সহজ উপায়ে টাকা উপার্জনের জন্য রিমেক তৈরির 'ইঁদুর-দৌড়ে' মেতেছে। তিনি নিজেকে এই দৌড় থেকে মুক্ত রেখে কেবল নিজের পছন্দের সিনেমাগুলোতে কাজ করতেন এবং বাকি সময়টা ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে খরা-পীড়িত কৃষকদের সেবায় বিলিয়ে দিতেন।

 

বলিউডের কোটিপতি তারকাদের যখন বিশাল সব আলিশান বাংলো আর বিলাসবহুল পেন্টহাউস থাকে, তখন নানা পাটেকর কোটি কোটি রুপি উপার্জন করেও মুম্বাইয়ের আন্ধেরির একটি সাধারণ ১-বিএইচকে ফ্ল্যাটে জীবনের একটি বিশাল সময় কাটিয়েছেন। ৭৫০ বর্গফুটের এই সাধারণ ঘরটিতেই তিনি বছরের পর বছর থেকেছেন, যার দেওয়ালগুলো ছিল সাধারণ সাদা রঙের এবং আসবাবপত্র ছিল একেবারেই সাদামাটা।

 

কোটি টাকার সাম্রাজ্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর এই ১ রুমের ফ্ল্যাটে থাকার নেপথ্যে কিছু গভীর ও আবেগময় কারণ ছিল। এই ছোট্ট ফ্ল্যাটটি নানা পাটেকরের কাছে কেবল একটি বাসস্থান ছিল না, এটি ছিল তাঁর মায়ের স্মৃতির আশ্রয়স্থল। তিনি যখন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ছিলেন, তখন মাত্র ১.১ লাখ রুপিতে এই ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন এবং সেখানে তাঁর মা নির্মলা পাটেকরের সাথে থাকতে শুরু করেন। পরবর্তীতে যখন তিনি বিপুল অর্থ ও খ্যাতির মালিক হন, তখনও তিনি তাঁর মাকে নিয়ে এই ফ্ল্যাটেই থেকে যান। কারণ, তাঁর মা কোনো বড় বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে গিয়ে মানিয়ে নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর, নানা যখনই মুম্বাই আসতেন, মায়ের স্মৃতিবিজড়িত এই ঘরটিতেই একা সময় কাটাতেন।

 

নানা পাটেকর সবসময় বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের সুখ তার সম্পদের পরিমাণের ওপর নয়, বরং তার চাহিদার সীমার ওপর নির্ভর করে। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "আমার মা আমাকে যা শিখিয়েছেন এবং জীবন আমাকে যা দিয়েছে, তা আমার প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। নিজের চাহিদাকে সীমিত রাখা খুবই সহজ।" তাঁর এই ফ্ল্যাটে কোনো এয়ার কন্ডিশনার (AC) ছিল না, কোনো আধুনিক গ্যাজেটের জাঁকজমক ছিল না। তিনি মেঝেতে ঘুমাতে এবং নিজের সাধারণ খাবার নিজে রান্না করে খেতেই বেশি আনন্দ পেতেন।

 

মুম্বাইয়ের এই ১-রুমের ফ্ল্যাটটিকে নানা ব্যবহার করতেন মূলত শুটিংয়ের সময় মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে। যখনই তিনি কাজের থেকে ছুটি পেতেন, তিনি মুম্বাইয়ের কংক্রিটের দেয়াল ছেড়ে পুনের খড়কওয়াসলার কাছে তাঁর ২৭ একরের বিশাল ফার্মহাউসে চলে যেতেন। সেখানেও ঘরের অন্দরসজ্জা ছিল টেরাকোটার মেঝে ও সাধারণ কাঠের আসবাব দিয়ে তৈরি সাবেকি মারাঠি ধাঁচের। তিনি বলতেন, শহরের বিলাসবহুল বদ্ধ দেয়ালের চেয়ে চারপাশে পাহাড় ঘেরা গ্রামে চাষবাস করে সময় কাটানো তাঁকে আসল মানসিক শান্তি দেয়।

 

সহজ কথায়, নানা পাটেকরের কাছে বাড়ি ছিল কেবল থাকার একটি জায়গা, তাঁর সামাজিক অবস্থান বা অহংকার প্রদর্শনের কোনো মাধ্যম নয়।

 

একাকীত্বের অজানা অধ্যায়

নানা পাটেকরের অন-স্ক্রিন চরিত্রগুলো যেমন তীব্র ও বিস্ফোরক, তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও একাকীত্বের অধ্যায়গুলো ঠিক ততটাই নীরব, যন্ত্রণাদায়ক ও রহস্যময়। পর্দার পেছনে তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত নিঃসঙ্গ মানুষ, যিনি জীবনের বড় বড় আঘাতগুলো একা একাই সামলেছেন।

 

নানা পাটেকরের বৈবাহিক জীবন খুব একটা মসৃণ ছিল না। থিয়েটার করার সময় ব্যাংকের পদস্থ কর্মকর্তা নীলকান্তি পাটেকরের সাথে পরিচয়। ১৯৭৮ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের শুরুর দিকে নানা যখন তীব্র অর্থকষ্টে ভুগতেন, তখন নীলকান্তির ব্যাংকের চাকরিই তাঁদের সংসার চালাতে সাহায্য করেছিল। তবে পরবর্তীতে নানার রগচটা স্বভাব, স্পষ্টবাদিতা এবং নব্বইয়ের দশকে মনীষা কৈরালার সাথে তাঁর সম্পর্কের গুঞ্জনের কারণে তাঁদের দাম্পত্য জীবনে চির ধরে। তাঁরা কখনো অফিশিয়াল ডিভোর্স নেননি, তবে গত কয়েক দশক ধরে তাঁরা সম্পূর্ণ আলাদা বসবাস করে আসছিলেন।

 

নানা পাটেকরের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং একাকীত্বের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তাঁর প্রথম সন্তানের আকস্মিক মৃত্যু। বিয়ের পর তাঁদের ঘরে প্রথম যে পুত্রসন্তান জন্ম নেয়, সে জন্ম থেকেই ঠোঁটকাটা (Cleft lip) ও মারাত্মক শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল। জন্মের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় শিশুটি মারা যায়।

 

এক সাক্ষাৎকারে নানা তাঁর এই চরম যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে বলেছিলেন, "আমি তখন মাত্র চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক যুবক। সন্তানের এই কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। ওর মৃত্যুর পর আমি রীতিমতো ভেঙে পড়েছিলাম। নিজের ওপর রাগ হতো, ঈশ্বরের ওপর রাগ হতো।" এই ঘটনাই নানার ভেতরে এক চিরস্থায়ী একাকীত্ব ও ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা পরবর্তীতে তাঁর অভিনয়েও প্রতিফলিত হয়েছিল। এরপর তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান মালহার পাটেকর জন্ম নেন, যিনি বর্তমানে চলচ্চিত্র নির্মাণের সাথে যুক্ত।

 

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মনীষা কৈরালার সাথে নানা পাটেকরের সম্পর্ক বলিউডের সবচেয়ে বড় গসিপ ছিল। নানা তখন নীলকান্তির থেকে আলাদা থাকতেন। অগ্নি সাক্ষী ও খামোশি-র সেটে মনীষার সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। মনীষা নানার ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়েছিলেন, কিন্তু নানার তীব্র মেজাজ এবং পজেসিভ স্বভাবের কারণে তাঁদের মধ্যে প্রায়ই তুমুল ঝগড়া হতো।

 

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে যখন মনীষা জানতে পারেন যে, নানা একই সাথে অভিনেত্রী আয়েশা ঝুলকার সাথেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়েছেন। একদিন সেটে নানা ও আয়েশাকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখে মনীষা চিৎকার করে ওঠেন। এরপরই তাঁদের সম্পর্কের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে নানা দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, "মনীষা অত্যন্ত সংবেদনশীল মেয়ে। ও যখন চলে যায়, আমার ভেতরে একটা বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না আমি কতটা একা হয়ে পড়েছিলাম।"

 

নানা পাটেকরের জীবনের সবচেয়ে বড় নোঙর ছিলেন তাঁর মা নির্মলা পাটেকর। নানা তাঁর জীবনের সমস্ত দুঃখ ও একাকীত্ব ভুলে যেতেন মায়ের কোলে মাথা রেখে। ২০১৯ সালে যখন তাঁর মা আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হয়ে ৯৯ বছর বয়সে মারা যান, নানা তখন সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। আন্ধেরির সেই ১-রুমের ফ্ল্যাটে মায়ের স্মৃতি হাতড়েই তিনি বাকি জীবন কাটাতেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি ঘরোয়া আড্ডা বা বাইরে বের হওয়া আরও কমিয়ে দিয়েছিলেন।

 

কোটি কোটি টাকার সম্পদ, পুনেতে বিশাল ফার্মহাউস থাকা সত্ত্বেও মুম্বাইয়ে থাকলে নানা সেই ছোট্ট ৭৫০ বর্গফুটের ঘরে একাই থাকতেন। সেখানে তাঁর কোনো কাজের লোক বা রাঁধুনি ছিল না। তিনি নিজের জামাকাপড় নিজে ধুতেন, নিজের খাবার নিজে রান্না করতেন এবং মেঝেতে চাদর বিছিয়ে ঘুমাতেন। তিনি বলতেন, এই একাকীত্ব ও সাদামাটা জীবনই তাঁকে তাঁর ফেলে আসা কঠিন দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয় এবং তাঁকে অহংকারী হতে দেয় না।

 

নানা পাটেকর আসলে সিনেমার মেকি দুনিয়ার "স্টার" হওয়ার চেয়ে একজন সাধারণ মানুষ এবং মাটির কাছাকাছি থাকা "মানুষ" হিসেবে বাঁচতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। পর্দার এই মহাতারকা জীবনের শেষ দিনগুলোতেও এক অদ্ভুত বৈরাগ্য ও একাকীত্বের চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছিলেন, যা কল্পনারও বাইরে।

 

অপরাধ বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর