ঢাকা, ১৭ নভেম্বর রোববার, ২০১৯ || ২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
৪৭

অনুগ্রহ করে জবাব দিন

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ

প্রকাশিত: ১১:২৬ ২৫ অক্টোবর ২০১৯  


১৯৭৬ সাল থেকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সাথে জড়িত। এই দীর্ঘ সময়ের শিক্ষকতা জীবনে অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমাবনতিশীল শিক্ষার মান ও পরিবেশ আমার শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে বড় হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 
আমার অন্যান্য বন্ধুদের মতো আমিও ১৯৭৪ সালে আমেরিকায় অভিবাসনের সুযোগ পেয়েও যাইনি। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত আমার প্রাণপ্রিয় জন্মভূমির সেবা করার জন্য শিক্ষকতাকে পেশা বেছে নিয়ে থেকে গেলাম। থেকে গেলাম বটে, বিশ্বমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার যে স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিলাম, সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না বা পূরণ হতে দিল না। 
আমরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিলাম, সেই বিশ্ববিদ্যালয় আর এই বিশ্ববিদ্যালয় এক নয়। সার্বিকভাবে অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এই বিশ্ববিদ্যালয়েরও শিক্ষার মানের অনেক অবনতি ঘটেছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অবনতি কোনোদিন মেনে নিতে পারিনি। এই চরম দুঃখবোধ রয়েই গেছে। 
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে একান্ত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নিরীহ ও সাধাসিধে ছেলেমেয়েরাই পড়তে আসে। এরা পারতপক্ষে রাজনীতি বা অপকর্মে জড়াতে চায় না। পড়াশোনা করে একটি ভালো ডিগ্রি নিয়ে ভালো একটি চাকরি পাওয়াই থাকে তাদের মূল টার্গেট। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক দশক ধরে জ্ঞান চর্চার চারণভূমি না হয়ে নোংরা দলীয় রাজনীতির চারণভূমিতে পরিণত হয়ে পড়েছে। এর কারণে সাধারণ শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের চরম মূল্য দিতে হচ্ছে। স্বেচ্ছায় হোক বা বাধ্য হয়ে হোক অধিকাংশ শিক্ষক ও ছাত্রসমাজের একটি বড় অংশ দলীয় তকমা ধারণ করে উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তি ও জাতীয় নেতানেত্রীদের সমর্থনপুষ্ট হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে নানা অপকর্ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছে। 
আমি সবসময় আশা করতাম, ছাত্র-শিক্ষক ও জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতিমুক্ত রাখবে। বিশেষ করে সরকার জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালগুলোতে অপরাজনীতির প্রশ্রয় দেবে না, মদদ দেবে না, নিজেদের দূরে রাখবে এবং নিরপেক্ষ থেকে ছাত্র-শিক্ষকদের পড়াশোনা, গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে উৎসাহিত করবে। তা না করে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রত্যেকটি সরকার ক্ষমতায় নিজেদের অবস্থানকে পাকাপোক্ত করার জন্য ছাত্রশিক্ষকদের হাতিয়ার হিসেবে নোংরা রাজনীতিতে ব্যবহার করেছে। 
কয়েক দশক ধরে দেখে আসছি, সরকারী দল না করলে এখন আর বড়-ছোট কোনো পদই পাওয়া যায় না, মেধা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক হওয়া যায় না, প্রমোশন মিলে না, উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশী স্কলারশিপ পাওয়া যায় না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, সরকারী কর্ম কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও অন্যান্য সরকারী বেসরকারী উচ্চপদে যোগ্যতা থাক বা না থাক, দলীয় অনুগত লোক নিয়োগ পাওয়া এখন অলঙ্ঘিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। 
শুধু দলীয় অপরাজনীতির কারণে স্বাধীনতার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গোলাগুলি, খুনখারাবি, হত্যা, রাহজানিতে অনেক শিক্ষার্থীকে আহত নিহত হয়ে জীবন দিতে দেখেছি। বহুবার বিশ্ববিদ্যালয় অচল হয়ে পড়েছে, শিক্ষা-দীক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে। সরকার বা প্রশাসন এসব ক্রাইম ঠেকায়নি বা ঠেকাতে পারেনি। 
আমরা মনে হয় ভুলেই গেছি- বিশ্ববিদ্যালয় মানব সৃষ্টির জায়গা, দানব সৃষ্টির নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান ধ্বংসাত্মক অপরাজনীতির কারণে দানব সৃষ্টির ফলশ্রুতিতে সর্বশেষ বলি হলেন একটি শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবরার। এই অনাকাঙ্ক্ষিত অপরাজনীতির কারণে আরও নির্মম হত্যাকাণ্ডের জন্য কী আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে থাকতে হবে? নাকি আবরার হত্যাই হবে শেষ হত্যা? 
এখনিই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষকসমাজ ও সরকারের কাছে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট একটা জবাব জাতি আশা করছে। মানুষ এখন মনে করে, সব ক্ষমতার উৎস মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যেকোনো সময় সম্ভব।