ঢাকা, ১৮ জুলাই শনিবার, ২০২৬ || ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
good-food
১৪০

যৌন নিপীড়ন: যেসব লক্ষণ দেখলে মেয়েশিশুর নিরাপত্তায় সতর্ক হবেন

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১২:৩৪ ২১ মে ২০২৬  

“তখন আমি গ্রামের স্কুলে ক্লাস টুতে পড়ি। আমাদের বাড়িটা অনেকটা উঠোনঘেরা- চারপাশে কয়েকটি ঘর, একেকটিতে একেক পরিবার। সবাই আমরা আত্মীয়। একে অন্যের ঘরে যাওয়া-আসা, খাওয়া-দাওয়া করাটা ছিল আমাদের খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। একদিন দুপুরে আমার এক কাজিন আমাকে তাদের ঘরে ডাকলো। আমিও কোনো কিছু না ভেবে গেলাম। গিয়ে দেখি ঘরে আর কেউ নাই। এরপর সে আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার মুখ চেপে ধরে…।”

নিজের শৈশবের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন ২৮ বছর বয়সী সুরভী (ছদ্মনাম)। সামাজিক সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে এখানে তার আসল নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। সুরভী জানান, দীর্ঘ দুই দশক পার হয়ে গেলেও সেই ক্ষত আজও তার মন থেকে মুছে যায়নি। তিনি বলেন, “আমি তখন চিৎকার করতে পারছিলাম না, কাউকে ডাকতেও পারছিলাম না। চোখের সামনে শুধু অন্ধকার দেখছিলাম। বড় হয়ে যখন সবকিছু বুঝতে শিখেছি, তখন বুঝেছি যে এটিকেই বলে যৌন নির্যাতন।”

সুরভীর মতো এমন ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা আমাদের সমাজে খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে বলেন। কিন্তু শিশু অধিকারকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশে শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা বা নির্যাতনের একটি বিশাল অংশ ঘটে থাকে একদম পরিচিত মানুষের হাত ধরে- যাদের ওপর পরিবার ও শিশুটি অন্ধবিশ্বাস রাখে। এই অপরাধীদের তালিকায় থাকতে পারেন আপন আত্মীয়স্বজন, ঘরের পাশের প্রতিবেশী কিংবা পরিবারের খুব বিশ্বস্ত কোনো মানুষ।

সম্প্রতি ঢাকার পল্লবীতে প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় শ্রেণীর এক কন্যাশিশুকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ ওঠায় নতুন করে ঘরে ও বাইরে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি তীব্রভাবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে কন্যাসন্তানেদের নিরাপত্তা এবং সন্তানকে নিরাপদ রাখতে কী ধরনের আগাম সচেতনতা জরুরি- এই প্রশ্নগুলো এখন প্রতিটি সচেতন অভিভাবকের মনে দোলা দিচ্ছে।

যেভাবে পল্লবীর রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড 

ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বর সংলগ্ন পল্লবী এলাকায় সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা হত্যার ঘটনাটি পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার একটি ফ্ল্যাটে শিশু রামিসাকে প্রথমে জোরপূর্বক টয়লেটে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় এবং পরে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়। অপরাধী তার মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা চালালেও শিশুটির মা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় আসামি জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়।

যে ফ্ল্যাটে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, সেটি ছিল রামিসাদের একদম পাশের ফ্ল্যাট এবং প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিটি তাদেরই দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী। এই ঘটনার পর অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে লিখছেন- এখন থেকে শুধু অপরিচিত মানুষ নয়, নিজের ঘরের পাশের প্রতিবেশী কিংবা পরম আত্মীয়স্বজনকেও যেন শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে অন্ধবিশ্বাস করা না হয়।

বাস্তবতা ও পরিসংখ্যানও এই আশঙ্কাজনক তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিত ও বিশ্বস্ত মানুষের দ্বারাই শিশুরা যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের শিকার হয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণামূলক নিবন্ধ অনুযায়ী, “শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনকারীরা শিশুর কোনো না কোনোভাবে আত্মীয়, বন্ধু বা বিশ্বস্ত কেউ হয়ে থাকে।”

রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ওপর একটি যৌথ গবেষণা পরিচালনা করেছিলেন। সেই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, যৌন সহিংসতার ঘটনার মাত্র ২৫ শতাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি, ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ছিল ভুক্তভোগী শিশুর কোনো না কোনো আত্মীয়, এবং ৪২ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিটি ছিল পরিবারের অত্যন্ত পরিচিত কেউ, যেমন- প্রতিবেশী কিংবা নিয়মিত বাড়িতে যাতায়াত করা কোনো মানুষ।

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, পৃথিবীতে প্রতি আট জনে একজন নারী ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই কোনো না কোনোভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলেন, “বাচ্চারা সহজে কিছু বলতে পারে না, নিজেদের প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তাদের থাকে না- ঠিক এই কারণেই অপরাধীরা তাদেরকে সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নেয়।”

ট্রমা, মানসিক বিপর্যয় ও লক্ষণ 

যৌন সহিংসতার শিকার হওয়ার পর শিশুরা যে ধরনের চরম মানসিক ও শারীরিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়, তা তাদের পুরো জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। সুরভী বলছিলেন, “আমি তখন এই ঘটনাটি ভয়ে বাসায় কাউকে বলতে পারিনি। এরপর আমি যত বড় হতে থাকলাম, আমার মনে হতে লাগলো যে আমি এই সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছি না। আমার ভেতরের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল।”

মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শৈশবের এই ধরনের অভিজ্ঞতা শিশুর মানসিক বিকাশকে স্থায়ীভাবে বাধাগ্রস্ত করে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মেখলা সরকার এই প্রসঙ্গে বলেন, “এমন ঘটনার শিকার হলে শিশুর মধ্যে তীব্র বিষণ্ণতা এবং গভীর উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। আর এই উদ্বেগ ও বিষণ্ণতা থেকে তার আচরণে পরিবর্তন আসে; তার জেদ বেড়ে যেতে পারে, সে খিটখিটে মেজাজের হয়ে যেতে পারে। পড়ালেখায় হুট করে অমনোযোগী হয়ে পড়া, স্কুলে যেতে না চাওয়া বা মানুষকে ভয় পাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।”

শুধু মানসিক পরিবর্তনই নয়, যৌন সহিংসতার শিকার শিশুদের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক রোগ ধরা না পড়লেও কিছু জটিল শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে- রাতে ঠিকমতো ঘুম না হওয়া বা ঘুমের মাঝে হঠাৎ আঁতকে বা কেঁপে ওঠা। ঘনঘন মাথা ব্যথা করা বা বুকে ব্যথার অভিযোগ করা। সামান্য মানসিক চাপেই হঠাৎ জ্ঞান হারানো, খিঁচুনি বা শ্বাস নিতে সমস্যা হওয়া।

চিকিৎসক মেখলা সরকার আরও যোগ করেন, “সহজ কথায় বলতে গেলে, ওই শিশুর সামগ্রিক মানবজাতি সম্বন্ধে একটি স্থায়ী ভীতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে, সে পুরুষদের এড়িয়ে চলতে চাইতে পারে।”

বাবা-মায়ের জন্য জরুরি পরামর্শ 

যদি এসব মানসিক বা শারীরিক লক্ষণগুলো কোনো শিশুর মাঝে হঠাৎ করে দেখা যায়, তবে বাবা-মায়ের উচিত সেটিকে কোনোভাবেই অবহেলা না করা। শিশুর সঙ্গে পরম মমতায় কথা বলতে হবে এবং কোনো ধরনের চাপ বা ভয় না দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করতে হবে। প্রয়োজনে শিশুকে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কাউন্সেলরের সহায়তা দেওয়া উচিত।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই ধরনের ঘটনার শিকার যেন কোনো শিশুকে হতে না হয়, সেজন্য বাবা-মায়েদেরকে কিছু বিষয়ে আগাম সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। বাবা-মাকে প্রথম থেকেই খেয়াল রাখতে হবে যে বাচ্চা কোথায় যাচ্ছে, কার কাছে যাচ্ছে, কার সাথে খেলছে। এর মানে এই নয় যে বাচ্চার স্বাধীনতা হরণ করা হবে, তবে চারপাশের মানুষ যেন বুঝতে পারে যে বাচ্চার ওপর তার বাবা-মায়ের কড়া নজর আছে।

‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ শেখাতে হবে। শিশুকে একদম ছোটবেলা (৩-৪ বছর) থেকেই নিজের শরীর এবং স্পর্শের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে যে, তার গোপন অঙ্গগুলো সম্পূর্ণ তার নিজের এবং অন্য কেউ এখানে হাত দিতে পারবে না।

কেউ যদি জোর করে তার জামা খুলে ফেলতে চায় বা এমন কোনো স্পর্শ করে যা তার কাছে অস্বস্তিকর লাগে, তবে সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে সরে যেতে হবে, চিৎকার করতে হবে এবং অবশ্যই বাবা-মাকে জানাতে হবে।

যারা কর্মজীবী বাবা-মা, তারা ঘরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে পারেন। এ ছাড়া বাসায় কোনো গৃহশিক্ষক বা অন্য কেউ সন্তানকে পড়াতে আসলে, পরিবারের বড়দের উচিত হুটহাট সেই ঘরে যাওয়া এবং একটি পরোক্ষ নজরদারি বজায় রাখা।

আইনের প্রয়োগ ও সামাজিক বাধা 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রে শিশু সুরক্ষায় ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ প্রচলিত রয়েছে। এই আইনে ধর্ষণের ফলে শিশুর মৃত্যু হলে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনের কাগজে-কলমে কঠোরতা থাকলেও এর যথাযথ ও দ্রুত প্রয়োগের অভাব রয়েছে বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মীরা।

মানবাধিকারকর্মী আইনজীবী এলিনা খান বলেন, “আমাদের আইনে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো আইনের সঠিক বাস্তবায়নে। আইনে বলা আছে, ১৮০ দিনের মধ্যে মামলা শেষ করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে বছরের পর বছর এই মামলাগুলো আদালতে ঝুলে থাকে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, অপরাধ আড়াল করতেই বর্তমানে ধর্ষণের পর শিশুকে সরাসরি মেরে ফেলার প্রবণতা বাড়ছে।

পাশাপাশি, সামাজিক লোকলজ্জার কারণে এই ধরনের বহু ঘটনাই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যায়। বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী সালমা আলী বলেন, “আমাদের দেশের থানা বা আইনি ব্যবস্থার পরিবেশ এখনো পুরোপুরি ভুক্তভোগীবান্ধব বা নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। যার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার দ্বিতীয়বার মানসিকভাবে হেনস্থার শিকার হওয়ার ভয়ে অনেক সময় থানায় যেতে নিরুৎসাহিত বোধ করে।”

শিশুদের প্রতি এই ধরনের জঘন্য সহিংসতা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের একটি সমন্বিত ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। কেবল আইনের ওপর ভরসা না করে দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি মুহূর্তে পরিবারের সচেতনতাই পারে শিশুদের একটি নিরাপদ শৈশব উপহার দিতে। খবর- বিবিসি বাংলা।