ঢাকা, ১০ জুলাই শুক্রবার, ২০২৬ || ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩
good-food
৪৩

চট্টগ্রামে পানিবন্দি সাড়ে ৪ লাখ মানুষ

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৫:১৫ ১০ জুলাই ২০২৬  

কেউচিয়া ইউনিয়নের মানুষ ভেবেছিলেন, আর দশটা বর্ষার মতোই কেটে যাবে এবারের বৃষ্টিও। কিন্তু রাত গড়াতেই বদলে যেতে থাকে এলাকার চিত্র। বিদ্যুৎ চলে গেল প্রথমে, তারপর একে একে বন্ধ হয়ে গেল মোবাইল নেটওয়ার্কও। অন্ধকারে, যোগাযোগবিহীন অবস্থায় গ্রামের মানুষ শুনতে পেলেন শুধু একটানা বৃষ্টির শব্দ আর দূর থেকে ভেসে আসা পানির স্রোতের গর্জন।

বৃহস্পতিবার সকালে সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়ে দাঁড়াল, বারান্দায়, ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে পানি। কেউচিয়ার বাসিন্দা এস.এম. রানার ভাষায়, দিন কয়েকের বৃষ্টিতে যে পানি এতদিন উঠোন পর্যন্ত এসে থমকে ছিল, বৃহস্পতিবার তা ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতরেও।

একটি জেলা, পাঁচ দিনের বৃষ্টি

গত রবিবার থেকে থেমে নয়, টানা বৃষ্টি ঝরছে চট্টগ্রামে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের হিসাবে শুধু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্তই রেকর্ড হয়েছে ২২৩ দশমিক ৬ মিলিমিটারের বৃষ্টিপাত। এই বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলের যৌথ চাপে ডুবে গেছে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার হিসাবে, পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা এখন সাড়ে চার লাখ ছুঁয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সাতকানিয়ায়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলছেন, উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন আর একটি পৌরসভার প্রতিটি গ্রামই এখন পানির নিচে। একাই এই উপজেলায় পানিবন্দি প্রায় তিন লাখ মানুষ। পৌরসভা আর রামপুর এলাকায় ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।

অন্ধকারে, নেটওয়ার্কবিহীন একটি রাত

বিদ্যুৎ আর মোবাইল নেটওয়ার্ক- এই দুটো জিনিস হারিয়ে যাওয়াই বিপর্যয়কে আরও কঠিন করে তুলেছে বানভাসী মানুষের জন্য। ঝড়ে গাছ ভেঙে তার ছেঁড়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হয়েছে বলে জানান ইউএনও মাহমুদুল হাসান। বৃহস্পতিবার দুপুরের পর কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরলেও তা স্থায়ী হয়নি সব জায়গায়।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উপজেলায় ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হলেও নেটওয়ার্ক বিপর্যয়ের কারণে কোন কেন্দ্রে কতজন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন, তার প্রকৃত হিসাব এখনো অজানা প্রশাসনের কাছে। অর্থাৎ যাদের সবচেয়ে বেশি সহায়তা দরকার, তাদের অনেকের অবস্থানই এই মুহূর্তে অন্ধকারে।

নদীর ওপর নির্ভর করে বাঁচা-মরা

সাতকানিয়ার মানুষের কাছে বন্যা কোনো নতুন আতঙ্ক নয়, কিন্তু এবারের ঢল যেন একটু বেশিই নির্মম। স্থানীয়দের ভাষায়, এই উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ভর করে পাহাড়ে কতটা বৃষ্টি হলো তার ওপর। সাঙ্গু নদী, ডলু খাল আর হাঙ্গর খাল বেয়ে সেই পাহাড়ি ঢল নেমে আসে ভাটির দিকে, আর সাঙ্গুর পানি বাড়লেই ডুবতে শুরু করে সাতকানিয়া।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব বলছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সাঙ্গু নদীর দোহাজারি অংশে পানি বিপৎসীমার ১৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছিল। এই একটি সংখ্যাই বলে দিচ্ছে কেন এত মানুষের ঘরবাড়ি আজ পানির নিচে।

নৌকায় বাঁচার লড়াই

জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সাতকানিয়ার বিভিন্ন গ্রামের পানিবন্দি মানুষকে আপাতত নৌকায় করেই নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আনা হচ্ছে। কিন্তু শুধু নৌকা দিয়ে এত বড় উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন বলেই উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করতে অন্তত ১০টি স্পিডবোট চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

শুধু সাতকানিয়া নয়, প্রতিবেশী উপজেলাগুলোতেও একই চিত্র। বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় সবকটিতেই কমবেশি পানি ঢুকেছে, বিশেষ করে পুঁইছড়ি, নাপোড়া, ছনুয়া, সরল, শেখের খিল, বৈলছড়ি ও কাথারিয়ায় অবস্থা বেশি খারাপ। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর সানি আঁকনের হিসাবে সেখানে পানিবন্দি প্রায় ৩৮ হাজার মানুষ।

চন্দনাইশে দুর্গত হয়েছে দুই পৌরসভাসহ ছয়টি ইউনিয়ন, পানিবন্দি প্রায় ১৪ হাজার মানুষ, জানান ইউএনও আবদুর রহমান। গত বুধবার গাছ পড়ে দুটি টিনের ঘর আর বৃষ্টির পানিতে দুটি মাটির ঘর ধসে পড়লেও সৌভাগ্যক্রমে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি সেখানে। 

অন্যদিকে লোহাগাড়ায় সবচেয়ে বেশি ভুগছে আমিরাবাদ ইউনিয়ন। সাঙ্গু আর ডলু নদীর একদম কোল ঘেঁষে থাকা এই জনপদে পানি উঠেছে সবচেয়ে বেশি, জানান ইউএনও বায়েজিদ বিন আখন্দ।

সাহায্যের হাত, তবু প্রশ্ন থেকেই যায়

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করেছেন জেলা প্রশাসক। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে ২০০ মেট্রিক টন চাল আর ১০ লাখ টাকা এসেছে, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল থেকে এসেছে আরও ২০ লাখ টাকা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের চাহিদা অনুযায়ী এই সহায়তা দ্রুত বিতরণের কথাও জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

জনদুর্ভোগ বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর