ঢাকা, ১৯ জুন শুক্রবার, ২০২৬ || ৫ আষাঢ় ১৪৩৩
good-food

বাংলায় তামাক এলো কোথা থেকে?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৩:৫৬ ১৯ জুন ২০২৬  

গ্রামের পুরোনো চণ্ডীমণ্ডপ কিংবা জমিদারের বৈঠকখানার কথা ভাবলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রুপোলি কাজ করা এক বিশাল হুঁকা। নল দিয়ে ধোঁয়া টানছেন বয়োজ্যেষ্ঠ কেউ, আর চারপাশে চলছে জমজমাট গল্পগুজবের আসর। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, এই দৃশ্য ছিল বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আজ হয়তো বৈঠকখানার সেই হুঁকার জায়গা দখল করেছে ফিল্টারযুক্ত আধুনিক সিগারেট। চায়ের দোকানে, রাস্তার মোড়ে কিংবা অফিসপাড়ায়-সিগারেটের ধোঁয়া আজ আমাদের রোজকার পরিচিত দৃশ্য।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, বাঙালির এই তামাক-প্রীতির শুরু কোথায়? কবে, কীভাবে এই ভিনদেশি পাতাটি আমাদের সংস্কৃতির এমন গভীরে শেকড় গাড়ল?

ইতিহাসের পাতা উল্টালে এক মজার তথ্য মেলে। তামাক কিন্তু এই ভারতবর্ষের নিজস্ব কোনো উদ্ভিদ নয়; এর আদি নিবাস সুদূর আমেরিকায়। ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করলেন, তখন তিনি সেখানকার আদিবাসীদের শুকনো একধরনের পাতা পোড়াতে দেখেছিলেন। তারা সেই ধোঁয়া টেনে অদ্ভুত এক তৃপ্তি পেত। এরপর স্প্যানিশ আর পর্তুগিজ নাবিকদের হাত ধরে এই নেশাজাতীয় পাতা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।

মোগল আমলের হুঁকা।

আমাদের এই উপমহাদেশে তামাকের প্রথম প্রবেশ ঘটে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে। সময়টা ষোড়শ শতাব্দীর একেবারে শেষভাগ, ভারতবর্ষ তখন মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনাধীনে। সমুদ্র পেরিয়ে পালতোলা জাহাজে করে আসা পর্তুগিজদের পকেটেই সম্ভবত বাংলার মাটিতে প্রথম প্রবেশ করেছিল এই তামাক। শুরুতে রাজদরবারে এটি নিয়ে বেশ কৌতূহল ছিল। কেউ কেউ একে জাদুকরী ঔষধি গাছ হিসেবেও ভেবেছিলেন! মুঘল অভিজাতদের মধ্যে খুব দ্রুতই তামাকের ধোঁয়ার নেশা ছড়িয়ে পড়ে। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে গঙ্গা আর ব্রহ্মপুত্রের জল গড়িয়ে এই পাতা এসে পৌঁছায় আমাদের এই সুজলা-সুফলা বাংলায়।

বাংলার উর্বর পলিমাটি তামাক চাষের জন্য ছিল দারুণ উপযোগী। সতেরো শতকের দিকে তামাক আর কেবল রাজকীয় নেশা রইল না, সাধারণ মানুষের নাগালে চলে এল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলার কৃষকেরা নিজেদের জমিতে তামাক চাষ শুরু করলেন।

নারকেলের খোল দিয়ে তৈরি হুঁকা।

সে যুগে তামাক খাওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল হুঁকা। শ্রেণিভেদে হুঁকার রূপ ছিল ভিন্ন। জমিদারদের জন্য আলাদা কারিগর দিয়ে তৈরি হতো রুপো বা পিতল বাঁধানো হুঁকা, আর তাতে মেশানো হতো গোলাপজল আর সুগন্ধি খামিরা। অন্যদিকে সাধারণ চাষির দাওয়ায় শোভা পেত নারকেলের মালায় তৈরি সাদামাটা হুঁকা। গ্রামের মানুষের কাছে এটি ছিল সামাজিকতার এক অদ্ভুত মাধ্যম। মাঠে কাজ করার ফাঁকে কিংবা সন্ধ্যায় দাওয়াতে বসে হুঁকা এগিয়ে দেওয়ার মানেই ছিল বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতার প্রকাশ। এমনকি একসময় ‘হুঁকা-পানি বন্ধ’-এই বাগধারাটিও তৈরি হয়েছিল সমাজচ্যুত করার মতো চরম শাস্তির প্রতীক হিসেবে। বুঝতেই পারছেন, তামাক কতটা গভীরভাবে আমাদের সমাজকাঠামোয় মিশে গিয়েছিল!

তামাক চাষের কথা উঠলে বাংলাদেশের যে জেলার নাম সবার আগে মাথায় আসে, তা হলো রংপুর। তিস্তা অববাহিকার মাটি যেন তামাক উৎপাদনের জন্যই তৈরি হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে রংপুরের তামাক কেবল বাংলাতেই নয়, বরং বাংলার বাইরেও রপ্তানি হতো। স্থানীয় কৃষকদের কাছে এটি পরিচিত ছিল ‘তিক্ত পাতা’ বা ‘সোনার পাতা’ হিসেবে। কারণ, অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে তামাক চাষে নগদ টাকা মিলত বেশি। এই অর্থনৈতিক প্রলোভনই বাংলার বিস্তীর্ণ এক অঞ্চলকে তামাকের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত করে।

কয়েকটি পকেট হুঁকা।

উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুতে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশরাজের হাত ধরে বাংলায় আসে আধুনিক ‘সিগারেট’। শুরুতে এটি ছিল কেবল সাহেব আর বিলাতফেরত বাবুদের শখের জিনিস। সাধারণ মানুষের কাছে এর দাম ছিল আকাশছোঁয়া। তবে বিকল্প তৈরি হতেও সময় লাগল না। তামাক পাতা কুচি কুচি করে কেটে কেন্দু বা শাল পাতায় মুড়িয়ে তৈরি হলো ‘বিড়ি’। সস্তা হওয়ায় খেটেখাওয়া মানুষের কাছে বিড়ি হয়ে উঠল দারুণ জনপ্রিয়।

ব্রিটিশরা বুঝতে পেরেছিল, এই বিশাল জনসমুদ্রকে যদি সিগারেটে অভ্যস্ত করা যায়, তবে ব্যবসার কোনো অভাব হবে না। প্রথম দিকে তারা বড় বড় রেলওয়ে স্টেশনে বিনামূল্যে সিগারেট বিতরণ করত। মানুষ স্রেফ কৌতূহল নিয়ে সেই ধোঁয়া টানত। এভাবেই খুব সুকৌশলে তারা বাঙালিকে হুঁকা থেকে সিগারেটে স্থানান্তরিত করেছিল। ১৯১০ সালের দিকে ইম্পেরিয়াল টোব্যাকো কোম্পানি (আইটিসি) এই উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সিগারেটের কারখানা স্থাপন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্যদের বিনামূল্যে সিগারেট দেওয়া হতো, যা এই অঞ্চলে সিগারেটের বাজারকে হু হু করে বাড়িয়ে দেয়।

আম আকৃতির হুঁকা।

পরবর্তীতে সিনেমা, সাহিত্য আর আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায় সিগারেট। সত্তর বা আশির দশকের দিকে তরুণদের কাছে আঙুলের ফাঁকে ধরা জ্বলন্ত সিগারেট মানেই ছিল এক ধরনের স্মার্টনেস, কিংবা এক ধরনের নিরব বিদ্রোহ। সিনেমার পর্দায় নায়কের ঠোঁটে ঝুলন্ত সিগারেট দেখে কত তরুণ যে প্রথমবার এই ধোঁয়ায় সুখ খুঁজেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

অবশ্য কেবল ধোঁয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি বাংলার মানুষ। পানের সঙ্গে জর্দা, সাদাপাতা, গুল কিংবা খৈনি-তামাক নানা রূপে প্রবেশ করেছে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে। বিশেষ করে বয়স্কদের মাঝে পানের সঙ্গে জর্দা খাওয়ার চল তো এক প্রকার অলিখিত সামাজিক রীতি। এগুলোও যে তামাকেরই ভিন্ন রূপ, তা অনেক সময় আমরা টেরই পাই না।

জমিদারি হুঁকা। ছবি: সংগৃহীত

আজ আমরা জানি, তামাক কেবল একটি সাধারণ পাতা নয়, এটি একটি নীরব ঘাতক। ক্যানসার থেকে শুরু করে হৃদ্‌রোগ-অসংখ্য প্রাণঘাতী অসুখের মূল কারণ এই তামাক। বিশ্বজুড়ে আজ তামাকবিরোধী তুমুল আন্দোলন চলছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু চারশো বছর আগে পর্তুগিজদের জাহাজে চড়ে আসা সেই ছোট্ট বীজটি যে এই বদ্বীপের মানুষের রক্তে এমনভাবে মিশে যাবে, তা কি তখন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভেবেছিল?

তামাক গাছ।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হুঁকার নল হয়তো হারিয়ে গেছে। কিন্তু সিগারেটের ফিল্টার আর জর্দার সুবাসে তামাকের সেই পুরোনো রাজত্ব আজও বহাল তবিয়তে টিকে আছে। শত শত বছরের এই শেকড় উপড়ে ফেলা তাই খুব একটা সহজ কাজ নয়। তবে সচেতনতার হাওয়া বইতে শুরু করেছে। হয়তো একদিন ধোঁয়ার এই দীর্ঘ কুণ্ডলী চিরতরে মিলিয়ে যাবে বাংলার আকাশ থেকে। সেই সুদিনের অপেক্ষাতেই আছি আমরা।