ঢাকা, ২৯ জুন সোমবার, ২০২৬ || ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩
good-food

একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১১:৫৬ ২৯ জুন ২০২৬  

একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরিবার সূত্র জানায়, রাজধানীর  গত ১৪ জুন ভর্তি করানো হয় মুস্তাফাকে। নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি।

এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রোস্টেট ক্যানসারের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন মুস্তাফা। ছিলেন লাইফ সাপোর্টে। সেবার ভারতের দিল্লিতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছিলেন। ওই অসুস্থতার দুই বছর পর নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি করানো হয় তাকে।

মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রশিল্পে তার স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণা, বাংলাদেশে নতুন শিল্পধারা ‘পাপেট’-এর বিকাশ, টেলিভিশন নাটকে অতুলনীয় কৃতিত্ব প্রদর্শন, শিল্পকলার উদার ও মহৎ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা, দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’ নির্মাণ এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনে লাল সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাসহ শিল্পের নানা পরিকল্পনায় বরাবরই তাঁর সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।

মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রাম তার পৈতৃক নিবাস। প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান তিনি।

বরেণ্য এই শিল্পী নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং কলকাতায় গিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু সেখানে তিনি পড়াশুনা না করে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি।

পাপেট শো’র অন্যতম কারিগর মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে পাস করার পর ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি প্রথম পাপেট নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। গ্রামবাংলার পুতুলনাচ ছোটবেলাতেই তাকে আকৃষ্ট করেছিল। বাংলাদেশে পাপেট তৈরি ও কাহিনী সংবলিত পাপেট প্রদর্শনের তিনিই মূল উদ্যোক্তা। কলকাতা আর্ট কলেজে পড়তে গিয়ে তিনি প্রথম ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের পাপেট দেখেছিলেন। পাপেট নিয়ে বহুদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তার আছে। প্রথমবার তিনি তার নিজের পাপেট দলসহ বাংলাদেশের ফোক পাপেট দল ধনমিয়াকে নিয়ে মস্কো ও তাশখন্দ সফর করেন। সেখানে বাংলাদেশের ফোক পাপেট ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করে।

মুস্তাফা মনোয়ার কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে। এরপর একে একে কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন, ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন।

এছাড়াও তিনি জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৭১-এর মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশন থেকে ফজল-এ- খোদা রচিত ও আজাদ রহমান সুরারোপিত 'সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম' গণসংগীতের পরিচালনায় ছিলেন মুস্তফা মনোয়ার। গানটি দশজন শিল্পী গেয়েছিলেন, কিন্তু যখন গানটি প্রচারিত হয় তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের দর্শকদের কাছে মনে হয়েছিল যেন কয়েকশ শিল্পী একত্রে গানটি গাইছেন।

এটি সম্ভব হয়েছিল মুস্তফা মনোয়ারের অসাধারণ নির্দেশনার কারণে। কোনো গানকে একটি অনন্য শৈল্পিক রূপ দেয়ার এটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। টেলিভিশনে সেই গানটির প্রচারের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি” বইতে। 

পুরস্কার ও সম্মাননা

কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৫৭ সালে কলকাতার একাডেমি অব ফাইন আর্টস আয়োজিত নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় শ্রেষ্ঠ কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে স্বর্ণপদক লাভ করেন তিনি। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরঙ শাখার শ্রেষ্ঠ কর্মের জন্য দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। ২০০৪ সালে শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত একুশে পদকে ভূষিত হন।

টিভি নাটকের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য টেনাশিনাস পদক এবং চিত্রশিল্প, নাট্য নির্দেশক এবং পাপেট নির্মাণে অবদানের জন্য শিশু কেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননা লাভ করেন।

চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার ও ঋষিজ পদক-২০০২ লাভ করেন। ২০১১ সালে পাক্ষিক ম্যাগাজিন সিনে তারকার পক্ষ থেকে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দেওয়া হয়। আরটিভি স্টার পুরস্কার-২০১৩ আয়োজনে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রদত্ত "সুলতান স্বর্ণ পদক-২০১৮" লাভ করেন তিনি।

শিল্প-সাহিত্য বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর