ঢাকা, ১২ আগস্ট বুধবার, ২০২৬ || ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
good-food

বাসি খাবার গরম করে খাওয়া কতটা নিরাপদ?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:৪৩ ১২ আগস্ট ২০২৬  

প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে যে, ফ্রিজের বাসি খাবার মাইক্রোওয়েভ ওভেনে বা চুলায় বারবার ভালো করে ফুটিয়ে বা গরম করে নিলে, ব্যাকটেরিয়া মরে যায় এবং খাবারটি আরও ৩-৪ দিন বেশি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।

তবে খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য-বিষক্রিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল এবং ভিত্তিহীন। ‘সেলফ ডটকম’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, খাবার বারবার গরম করা কোনো ‘ম্যাজিক রিসেট বাটন’ নয়।

খাবারের আসল শত্রু: তাপমাত্রা ‘ডেঞ্জার জোন’

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিনের মাইক্রোবায়োলজি ও ইমিউনোলজি’ বিভাগের অধ্যাপক ড. বিল সালিভান বলেন, “ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের মাধ্যমে খাবারে বিষক্রিয়া বা ‘ফুড পয়জনিং’ ঘটে। রান্না করার পর থেকে খাবার ঠান্ডা হওয়ার মধ্যবর্তী সময়ে যখন খাবারের তাপমাত্রা ৪০ থেকে ১৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের (৪ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) মধ্যে নেমে আসে, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে ‘ডেঞ্জার জোন’ বা বিপজ্জনক তাপমাত্রা বলা হয়।”।

এই চিকিৎসক সতর্ক করে বলেন, “এই বিপজ্জনক তাপমাত্রার মধ্যে কিছু কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া প্রতি ২০ মিনিটে নিজেদের সংখ্যা দ্বিগুণ করে ফেলতে পারে। খাবার যত বেশি সময় এই তাপমাত্রায় থাকবে, সেখানে তত বেশি ব্যাকটেরিয়া জন্মাবে এবং ‘হিট-রেজিস্ট্যান্ট’ বা তাপ-প্রতিরোধী বিষাক্ত পদার্থ স্পোর তৈরি হবে।”


খাবার বারবার গরম করার অদৃশ্য ঝুঁকি

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ড্যারিন ডেটউইলার ব্যাখ্যা করেন, “খাবারকে ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রায় গরম করলে সাধারণ সক্রিয় ব্যাকটেরিয়াগুলো মারা যায় ঠিকই, তবে সব জীবাণু মরে না।”

তাপ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া: ভাতে থাকা ‘ব্যাসিলাস সিরিয়াস’ এবং মাংসে থাকা ‘ক্লস্ট্রিডিয়াম পারফ্রিঞ্জেন্স’ ব্যাকটেরিয়ার ‘স্পোর’ ও ‘টক্সিন’গুলো তাপ-প্রতিরোধী। ওভেনে গরম করলেও এরা সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে।

বারবার গরম করার ঝুঁকি: একটি বড় পাত্রের পুরো খাবার বারবার ফ্রিজ থেকে বের করা, গরম করা এবং আবার ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখার ফলে খাবারটি প্রতিবার নতুন করে ‘ডেঞ্জার জোন’ তাপমাত্রায় প্রবেশ করে। এই চক্রাকার অবহেলা খাবারের ভেতরে ক্ষতিকর টক্সিন বা দূষণের পুঞ্জীভূত ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ফ্রিজের খাবার নিরাপদ রাখার ৪টি বৈজ্ঞানিক নিয়ম

মার্কিন ‘ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)’ এবং বিশেষজ্ঞদের নির্দেশিকা অনুযায়ী ফ্রিজের খাবার সুস্থ উপায়ে খাওয়ার ৪টি নিয়ম নিচে তুলে ধরা হল।

তিন থেকে চার দিনের সময়: এফডিএ’-এর নিয়ম অনুযায়ী, ফ্রিজের সাধারণ বা নরমাল চেম্বারে রাখা বাসি খাবার সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খেয়ে শেষ করা উচিত। এর চেয়ে বেশি দিনের পুরানো খাবার গরম করলেও, সম্পূর্ণ বিষমুক্ত হয় না।

শুধু নির্দিষ্ট অংশ গরম করা: পুরো পাত্রের খাবার একসঙ্গে ওভেনে বা চুলায় গরম করা ভুল অভ্যাস। প্রতিবার খাওয়ার সময় ঠিক যতটুকু প্রয়োজন, শুধু ততটুকু খাবারই আলাদা ছোট বাটিতে নিয়ে গরম করা উপকারী। বাকি খাবার পাত্রসহসঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজে রেখে দেওয়া নিরাপদ।

চুলার তাপমাত্রা ও ফুড থার্মোমিটার: খাবার গরম করার সময়, সেটা যেন অন্তত ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। একটি ডিজিটাল ফুড থার্মোমিটার দিয়ে যাচাই করে নেওয়া ভালো যে খাবারের ভেতরের অংশটিও সমানভাবে গরম হয়েছে কি-না।

দীর্ঘায়ু বাড়াতে ফ্রিজিং: যদি কোনো খাবার ৪ দিনের বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয়, তবে তা সাধারণ বা নরমাল ফ্রিজে না রেখে ডিপ ফ্রিজে বা ফ্রিজারে বাতাসহীন পাত্রে ভালো মতো আটকে রাখতে হবে।

ফ্রিজারের মাইনাস তাপমাত্রা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দেয়, যা খাবারকে কোনো বিষক্রিয়া ছাড়াই দীর্ঘকাল সুরক্ষিত রাখে।

পরামর্শ

খাদ্যজনিত বিষক্রিয়া বা ‘ফুড পয়জনিং’ সৃষ্টিকারীসহ, কোনো ব্যাকটেরিয়া খালি চোখে দেখা যায় না। তাই ফ্রিজে থাকা কোনো বাসি খাবারের সুঘ্রাণ ঠিক থাকলেও, যদি সেটার রংয়ে সামান্য পরিবর্তন আসে, চটচটে বা পিচ্ছিলভাব তৈরি হয় বা ৪ দিনের বেশি পুরানো হয়ে থাকে, তবে তা গরম করার ঝুঁকি না নিয়ে সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর