ঢাকা, ০৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ২২ আশ্বিন ১৪৩৩
good-food
২৭

গঙ্গা পানি চুক্তি ‘ত্রুটিপূর্ণ’, হালনাগাদ জরুরি

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:৩৫ ৭ অক্টোবর ২০২৬  

ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি চুক্তি ‘ত্রুটিপূর্ণ’। কারণ, এতে কোনো গ্যারান্টি ধারা নেই এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের (এনআরসিসি) সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর এ. চৌধুরী সম্প্রতি দ্য হিন্দুকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেছেন।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দ্য হিন্দু-কে দেওয়া এই সাক্ষাতকারে মঞ্জুর এ. চৌধুরী বলেন, “চলতি বছরের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তাই এটি নবায়নের পরিবর্তে তিন বছরের একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করা উচিত। এরপর আরও গবেষণা ও আলোচনার ভিত্তিতে একটি উন্নত ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করা যেতে পারে। যে চুক্তিতে নেপালকেও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। কারণ, হিমালয়ের বরফ গলা পানি নেপালের বিভিন্ন নদীর মাধ্যমে গঙ্গায় প্রবাহিত হয়।”

চৌধুরী বলেন, “গঙ্গা পানি চুক্তি তিন দশকের পুরোনো এবং ত্রুটিপূর্ণ। এতে গ্যারান্টি ধারা নেই। একই সঙ্গে পরিবেশগত ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোও চুক্তিতে নেই। এতে শুধু নদীর পানি ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। যা সঠিক পদ্ধতি নয়।”

তার মতে, গঙ্গা পানি চুক্তিতে নেপালকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। একটি ভালো চুক্তিতে নদীর স্বাভাবিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে গঙ্গার পানির অতিরিক্ত ব্যবহার না হয়।

চৌধুরী বলেন, “চলতি বছরের ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আদর্শভাবে আমাদের তিন বছরের একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তি করা উচিত। আর এই সময়ের মধ্যে আরও গবেষণা এবং আলোচনা করে একটি নতুন ও দীর্ঘস্থায়ী গঙ্গা পানি চুক্তির খসড়া তৈরি করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত অগ্রগতিগুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে।”

তিনি বলেন, “ভারত সবসময় গঙ্গা পানি চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হিসেবে দেখে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নেপালের ঘাঘরা, গণ্ডকী ও কোশি নদীর মাধ্যমে গঙ্গায় বিপুল পরিমাণ বরফ গলা পানি আসে। তাই গঙ্গার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে এসব নদীর পানিপ্রবাহও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।”

চৌধুরীর মতে, গঙ্গা পানি চুক্তির ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। কারণ, চুক্তির নতুন খসড়া তৈরির সময় একবিংশ শতাব্দীর পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। এক দিন আগে ঢাকায় অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনেও তিনি নতুন চুক্তির পক্ষে একই ধরনের মতামত দেন।

দুই দেশ নতুন করে চুক্তি না করলে অথবা আরও ৩০ বছরের জন্য চুক্তি নবায়নে সম্মত না হলে চলতি বছরের ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক সোবহানও চুক্তিটির একটি সমস্যা হিসেবে সালিশি ধারার অনুপস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। এর আগে ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে আলোচনায় তিনি অংশ নিয়েছিলেন। 

দ্য হিন্দু-কে ফারুক সোবহান বলেন, “গঙ্গা পানি চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ভারতের কিছু প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, সেগুলোও নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “সে সময় ভারত বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পদ্মা (গঙ্গা) নদীর ওপর একটি ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু সেটি আর বাস্তবায়ন করা হয়নি। সালিশি ধারা চুক্তিতে না রাখার বিনিময়ে ওই ব্যারাজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যারাজটি নির্মাণ করা হয়নি।”

ফারুক সোবহান আরও জানান, ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশ ব্যারাজ নির্মাণের বিষয়ে সমীক্ষা চালিয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।
এদিকে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশে আলোচনা চলছে। তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি আলোচনা এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি।

এর আগে ভারতের জনতা দলের (জেডিইউ) পার্লামেন্ট সদস্য সঞ্জয় ঝা তার দেশের সরকারকে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়ন না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার দাবি, বাংলাদেশের সঙ্গে এই চুক্তি বিহারের ওপর ‘নেতিবাচক প্রভাব’ ফেলেছে।

এরপর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত ২৮ আগস্ট সঞ্জয় ঝাকে চিঠি দিয়ে বলেন, গঙ্গা পানি চুক্তি নিয়ে তার উদ্বেগ ভারত সরকার পুরোপুরি বুঝতে পারছে। তিনি জানান, জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় পরামর্শ হয়েছে, যাতে বিষয়টি নিয়ে বিস্তৃত মতামত নেওয়া যায়।