ঢাকা, ১০ জানুয়ারি শনিবার, ২০২৬ || ২৭ পৌষ ১৪৩২
good-food
১৮

পাকিস্তান কেন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে যুদ্ধবিমান বিক্রি করছে?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৮:২৬ ৯ জানুয়ারি ২০২৬  

নতুন বছরের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক আকাশে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধুর সাথে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের সাম্প্রতিক বৈঠকের পর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, পাকিস্তানের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান ক্রয়ের বিষয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।

মঙ্গলবার জারি করা বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, সুপার মুশাক প্রশিক্ষণ বিমান দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জেএফ-১৭ থান্ডার বিমান সংগ্রহের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে দুই দেশ। সুপার মুশাক হলো একটি হালকা ওজনের ইঞ্জিনচালিত বিমান যা মূলত প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। পাকিস্তান ছাড়াও আজারবাইজান, তুরস্ক, ইরান এবং ইরাকসহ ১০টিরও বেশি দেশ বর্তমানে এই বিমানটি ব্যবহার করছে।

এর ঠিক একদিন পরেই রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা করছে। এর মাত্র কয়েক মাস আগেই একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছিল তারা। এ ছাড়া ডিসেম্বরের শেষ দিকে খবর আসে, লিবিয়ার একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর (এলএনএ) সাথে পাকিস্তানের ৪০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি হয়েছে। চুক্তির মধ্যে এক ডজনেরও বেশি জেএফ-১৭ বিমান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বৈঠকে পাকিস্তান বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল জাহির আহমেদ বাবর সিধু ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান

বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ জেএফ-১৭-এর আবেদন বাড়িয়ে দিয়েছে। এই বিমানের দাম তুলনামূলক কম (২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার) হওয়ায় গত ১০ বছর ধরে অনেক দেশের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাইজেরিয়া, মিয়ানমার এবং আজারবাইজান ইতিমধ্যেই এই বিমানটি ব্যবহার করছে।

গত মে মাসে কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের তীব্র আকাশ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পাকিস্তান দাবি করে তারা বেশ কয়েকটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। পরবর্তীতে ভারতীয় কর্মকর্তারা একথা স্বীকার করে নেন। সাবেক এয়ার কমোডর আদিল সুলতান বলেন, “পাকিস্তান বিমানবাহিনী পশ্চিমা এবং রুশ প্রযুক্তির বিপরীতে উন্নত পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। যা এই বিমানগুলো আকর্ষণীয় করে তুলেছে।”

জেএফ-১৭ থান্ডার আসলে কী?

জেএফ-১৭ থান্ডার হলো একটি হালকা ওজনের, সব আবহাওয়া উপযোগী বহুমুখী যুদ্ধবিমান। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) এবং চীনের চেংদু এয়ারক্রাফট কর্পোরেশন (সিএসি) যৌথভাবে তৈরি করেছে এই বিমান। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে চুক্তি সই হলেও পাকিস্তানি বিমান বহরে এর প্রথম সংস্করণ (ব্লক ১) অন্তর্ভুক্ত হয় ২০০৯ সালে। বর্তমান আরও উন্নত ‘ব্লক ৩’ সংস্করণটি ২০২০ সালে পরিষেবা শুরু করে।

এই বিমানের ৫৮ শতাংশ পাকিস্তানে এবং ৪২ শতাংশ চীনে তৈরি হয়। এতে রুশ ইঞ্জিন এবং ব্রিটিশ মার্টিন বেকারের সিট ব্যবহার করা হলেও সম্পূর্ণ অ্যাসেম্বলিং হয় পাকিস্তানে। ব্লক ৩ সংস্করণটি ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের কাতারে পড়ে। এতে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির ‘এসা’রাডার এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম। এর ফলে এই যুদ্ধিবিমান অনেকগুলো লক্ষ্যবস্তুকে একসাথে ট্র্যাক করতে পারে। তবে পঞ্চম প্রজন্মের বিমানের মতো এতে ‘স্টিলথ’ বা রাডার ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা নেই।

কারা জেএফ-১৭ কিনেছে?

সর্বপ্রথম মিয়ানমার ২০১৫ সালে ১৬টি জেএফ-১৭ অর্ডার করে। এরপর ২০২১ নাইজেরিয়া তিনটি বিমান গ্রহণ করে। ২০২৪ সালে আজারবাইজান দেড়শ কোটি ডলারের বিনিময়ে ১৬টি জেএফ-১৭ কেনার চুক্তি করে। এ ছাড়া ইরাক, শ্রীলঙ্কা এবং সৌদি আরবও গত এক দশকে এই বিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।

জেএফ-১৭ যুদ্ধিবমানের বিস্তারিত নিয়ে একটি ইনফোগ্রাফিক ছবি।

অন্যান্য যুদ্ধবিমানের সাথে এর তুলনা?

বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত যুদ্ধবিমান হলো পঞ্চম প্রজন্মের। যেমন মার্কিন এফ-৩৫ বা চীনের জে-২০। এই যিদ্ধবিমানলোতে স্টিলথ প্রযুক্তি আছে। অন্যদিকে জেএফ-১৭ হলো ৪.৫ প্রজন্মের। যার সমসাময়িক হলো সুইডেনের গ্রিপেন, ফ্রান্সের রাফাল বা ভারতের তেজাস। রাফাল বা গ্রিপেনের দাম ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও জেএফ-১৭-এর দাম মাত্র ২৫-৩০ মিলিয়ন ডলার। এর আবেদন শুধু দামের জন্য নয়। কম রক্ষণাবেক্ষণ খরচ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মতো কঠিন রাজনৈতিক শর্ত না থাকার কারণেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে প্রতিনিয়ত।

কেন আগ্রহ বাড়ছে?

২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সাথে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের বিমানবাহিনী ব্যাপক নজর কেড়েছিল। পাকিস্তান দাবি করে, তাদের জে-১০সি বিমান ভারতের ছয়টি বিমান ভূপাতিত করেছে। যদিও জেএফ-১৭ সরাসরি ওইসময় কমিশনড ছিলো না। তবে তারা এই ফরমেশনের অংশ ছিল। এমনকি জেএফ-১৭ ব্যবহার করে ভারতের এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় হাইপারসনিক মিসাইল হামলা চালানোর দাবিও করেছে পাকিস্তান।

২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর ঢাকার অবস্থান পাকিস্তানের প্রতি নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। যদি বাংলাদেশ জেএফ-১৭ বা সুপার মুশাক কেনে, তবে বুঝতে হবে তারা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের দিকে যাচ্ছে। তারা চীনের জে-১০ বিমানের প্রতিও আগ্রহ দেখাচ্ছে। এসবই নির্দেশ করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ কাদের সাথে কৌশলগতভাবে নিজেকে মেলাতে চায়।