ঢাকা, ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার, ২০২০ || ১২ আশ্বিন ১৪২৭
good-food
৬২

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধে কার্যকর উপায়

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২১:১৬ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  

রংপুরের কুড়িগ্রামে এ বছর বন্যা শুরু হওয়ার পর থেকে গেল শুক্রবার পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে ২২ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ১৭ জনই শিশু। মৃত্যুহারের দিক থেকে যা ৮০ শতাংশ। গেল কয়েক বছরে পানিতে পড়ে অথবা পানিবাহিত রোগে শিশু মৃত্যুহার দিন দিন বেড়ে চলেছে, যা সত্যিই উদ্বেগজনক। 

জেলার চিলমারি উপজেলার রমনা ইউনিয়নে বসবাসকারী রাফিজা বেগম (ছদ্মনাম) সম্প্রতি নিজের শিশুকে হারিয়েছেন। চলতি বছর বন্যার কারণে বসতভিটা ছেড়ে দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি ওয়াপদা বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। একদিন তার কোলের শিশুকে সঙ্গে নিয়ে রান্না করছিলেন। ওই সময় ১০ বছরের কন্যা বাঁধের ওপর খেলছিল। এক পর্যায়ে বাচ্চাটি নদীর পানিতে পড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা ওই শিশুর লাশ নদী থেকে উদ্ধার করে।

বন্যা কবলিত এলাকায় এ ধরনের ঘটনা হরহামেশা ঘটছে। মূলত বন্যার কারণে অনেক পরিবার বসতভিটা ফেলে রাস্তায় অথবা বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। পরিবারের সবকিছু ফেলে তারা আশ্রয় নিচ্ছে খোলা আকাশের নিচে।

কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জনের অফিস সূত্রে জানা যায়, মৃত ২২ জনের মধ্যে ১৭ জনই শিশু যা মৃত্যুহারের দিক থেকে ৮০ শতাংশ। 
যদিও অন্য বন্যা কবলিত এলাকায় শিশু মৃত্যুর সঠিক কোনও তথ্য নেই। তবু ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় সব এলাকার চিত্র একইরকম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, যে কয়েকটি দেশে শিশু মৃত্যুহার বেশি তন্মধ্যে বাংলাদেশ একটি। মূলত পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যাই বেশি।

গেল ১১ মে প্রকাশিত জন হপকিন্স ইন্টারন্যাশনাল ইনজুরি রিসার্স ইউনিটের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে পানিতে ডুবে এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুর মৃত্যুহার প্রায় ৪২ শতাংশ।

ব্লুমবার্গ স্কুলের ইন্টারন্যাশনাল হেলথ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং এ গবেষণার প্রধান লেখক ওলাকুনলে আলোঙ্গে বলেন, এক থেকে চার বছর বয়সী শিশুর মধ্যে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় দু’জন শিশু মারা যায় পানিতে ডুবে। এসব অঞ্চলে পানিতে ডুবে মৃত্যুহার কমাতে কমিউনিটিভিত্তিক ডে-কেয়ার খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

সমীক্ষায় দেশে ৩২০০টি ডে-কেয়ার স্থাপন করা হয় এবং ৬৪,০০০ শিশুর উপর গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে একেবারে গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটির নেতৃত্বে যদি ডে-কেয়ার স্থাপন করা যায়,তবে নয় থেকে ৪৭ মাস বয়সী শিশু মৃত্যুহার প্রায় ৮৮ শতাংশ কমে যাবে।

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর সব খবর কিন্তু প্রকাশ হয় না। বিশেষ করে বড় কোনও দুর্যোগের সময় যেমন বন্যা। মূলত, বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে যখন শিশুরা একলা খেলে অথবা তাদের সমবয়সী অন্যদের সঙ্গে খেলে; যাদের উদ্ধার করার মতো সামর্থ্য থাকে না।

ইউনিসেফের প্রোজেক্ট অফিসার সুমনা শাহফিনাজ বলেন, মায়েরা অনেক সময় নিজেদের সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকে। হয়তো তাদের একাধিক সন্তান রয়েছে। একজনের দিকে নজর দেয়ার সময় অন্য আরেকজন নজরের বাইরে থাকে। আর তখনই ঘটে যেতে পারে দুর্ঘটনা। মূলত পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনায় দেখা যায়, হয়তো মা পারিবারিক কোনও কাজে ব্যস্ত ছিল অথবা কাজের জন্য বাইরে ছিল।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক রেজাউল করীম বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ অঞ্চলের বন্যা কবলিত এলাকায় শিশুদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। মূলত পর্যাপ্ত নজরদারীর অভাবে শিশুরা পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে। যদি পরিবারের সদস্যরা আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিতো, তবে এ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হতো।

তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করছে।