ঢাকা, ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩
good-food

পানির সংকেতে বদলে যাচ্ছে ইলিশের পথ

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৪:২২ ২৩ জুলাই ২০২৬  

ইলিশ মাছ বাঙালির কাছে কেবল একটি খাদ্যবস্তু নয়, বরং সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালির হেঁশেলে ইলিশের কদর সম্বন্ধে নতুন কিছু বলার নেই। তবে ইলিশ মাছের সঙ্গে আমাদের লোকগাথা ও জীবনযাত্রার গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

পল্লীকবি জসীমউদ্দীন থেকে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ অনেক সাহিত্যিক ইলিশের রূপ, স্বাদ এবং জেলেদের জীবনযাত্রা নিয়ে গদ্য-পদ্য লিখেছেন। পদ্মা, মেঘনা বা রূপসা নদীর ইলিশ নিয়ে প্রচলিত লোকগানগুলোতে উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রামের ছাপ ফুটে উঠেছে।

বাঙালির নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার রীতি আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইলিশ মাছ আমাদের সংস্কৃতির সেই রুপালি সুতা, যা আজও আমাদের শিকড়ের সঙ্গে আটকে রাখে। মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশ খুব সংবেদনশীল চরিত্রের মাছ। এর জন্ম সাগরে, কিন্তু ডিম ছাড়ার জন্য তাকে সাগর ছেড়ে মিঠাপানিতে আসতে হয়।

আমাদের দেশে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলো মিঠে পানিতে ভরা। তাই ডিম ছাড়ার মৌসুমে ইলিশ ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে। এর মধ্য থেকে আবার সেই ছোট বা জাটকা ইলিশ চলে যায় সাগরে। ইলিশ স্বভাবগতভাবে পরিযায়ী মাছ। সমুদ্র থেকে নদী আর নদী থেকে সমুদ্র অবিরাম তার চলাচল। মাছ হিসেবে ইলিশের পছন্দ পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। যে কারণে জন্ম ও বেড়ে ওঠার জন্য দূষণমুক্ত ও পরিচ্ছন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়। ভালো পরিবেশ না পেলে ইলিশ বিমুখ হয়ে ভিন্ন পথে চলে যায়।

এই ভিন্ন পথে চলে যাওয়া নিয়েই এখন তৈরি হয়েছে শঙ্কা। এদের চলাচলের পথে বাধা আসছে বিভিন্নভাবে। ফলে ইলিশ অপেক্ষাকৃত কম ঢুকছে নদ-নদীতে। যেসব কারণে ইলিশ তার গতিপথ বদলায়, সেসব বাড়তে শুরু করলে দেশের রুপালি ইলিশের সুবাস ছড়ানো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফুরিয়ে যেতে পারে স্বাদগন্ধময় রুপালি ইলিশের দিন? 

ইলিশের দিন ফুরাবে কি ফুরাবে না, সে কথা পরে। আগে ইলিশ ধরার একটা ছোট পরিসংখ্যানের দিকে চোখ দিলে অনেক কিছু আন্দাজ করা যাবে। টানা ২০ বছর ইলিশের রেকর্ড উৎপাদনের পর, তিন বছর ধরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমতে শুরু করা

ও ইলিশের গড় ওজনও আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার মধ্যে অনেক সংকট নিহিত আছে বলে মনে করছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা । এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে ইলিশ আহরণ বাড়ছিল। তারপর হঠাৎ করেই কমতে শুরু করে। এ ব্যাপারে মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ ৪২ হাজার টন কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টন।

গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ২৯ হাজার টন। ইলিশ কি সত্যিই তাহলে ভিন্ন পথে চলে যাচ্ছে? চাঁদপুর জেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডারের ১০০ কিলোমিটার, ভোলা জেলার মদনপুর থেকে চর পিয়াল ৯০ কিলোমিটার, ভোলার ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালী জেলার চর রুস্তমের ১০০ কিলোমিটার, শরীয়তপুরের পদ্মার নিম্নাংশের ২০ কিলোমিটার আর বরিশালের হিজলার ৮২ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত।

এ ছাড়াও ইলিশের বড় বিস্তার এখন মেঘনা ও এর উপকূলজুড়ে। কিন্তু সেখানে বড় বড় প্রতিবন্ধকতা ইলিশের গতিপথকে রুদ্ধ করে ফেলছে বলে গবেষকদের অনেকেই বলছেন। জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীতে নাব্যতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে, নৌকা আটকে যায়। মাছ আসবে কোথা থেকে? চাঁদপুরের মৎস্য বণিক সমিতির নেতা আবদুল বারী জমাদারের কয়েক পুরুষের মাছের ব্যবসা।

তার ধারণা, ইলিশের বিচরণক্ষেত্রই এখন নিরাপদ নয়। তিনি বলছিলেন, শুধু এ বছর নয়, প্রায় চার বছর ধরে ক্রমাগতভাবে ইলিশের উৎপাদন কম হচ্ছে। আর এ বছরের উৎপাদন গতবারের অন্তত অর্ধেক। তার কারণ ইলিশ আসার পথ কোনো না কোনোভাবে সংকটাপন্ন, নতুবা ইলিশ আসবে না কেন? চাঁদপুরের জেলে জুড়ান জলদাস বলেন, ‘ইলিশের সমস্যা অনেক, বলতে পারেন পথে পথে বাধা।

ইলিশ ঢোকার পথগুলো ভরাট হলেও তা খনন করা হচ্ছে না। এ ছাড়া জলে জলযান ও নগরায়ণের বর্জ্য মিশছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়ছে জলের ঘনত্ব। সব মিলে এক বিরূপ পরিবেশে ইলিশ আসার পথ ও পরিবেশ সংকুল হচ্ছে। এ কারণে গতিপথ বদলাচ্ছে ইলিশ।’

সম্প্রতি মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও পদ্মা নদীতে মোট ১৭টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলোতে মা ইলিশ ও জাটকার যাতায়াত বাধাগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে মেঘনা নদীতেই রয়েছে ১৪টি স্থান। দুটি পদ্মা নদীর আর একটি তেঁতুলিয়া নদীর। ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও শরীয়তপুর জেলার মধ্যে পড়েছে এসব এলাকা। মা ইলিশ ও জাটকার ‘ইলিশ মাইগ্রেশন রুট’ সম্পর্কিত সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনা; চাঁদপুর, ভোলা, পটুয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের নানা অংশে অসংখ্য ডুবোচর ও চর ইলিশের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত করছে।

স্থানীয় জেলেরা জানান, আগের মতো আর মাছ উজানে ওঠে না। বর্ষাকালে প্রবল স্রোতের সময় কিছুটা ইলিশ এলেও শুষ্ক মৌসুমে নদী ইলিশশূন্য হয়ে যায় জলের অভাবে। ভোলার দৌলতখান, পটুয়াখালীর দশানাচর বা চাঁদপুরের হাইমচর সব জায়গাতেই একই কথা, ‘পানি কম, চর বেশি, মাছও কম।’ একাধিক মৎস্য গবেষক গণমাধ্যমে বলেছেন, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াই এর অন্যতম কারণ। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় ডুবোচরের সংখ্যা সাম্প্রতিক দশকে বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।

জোয়ারে কিছুটা ডুবে গেলেও ভাটায় এই চরগুলো মাছের গতিপথ বন্ধ করে দেয়। বিশেষত মা ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুমে নদীর স্রোতের সঙ্গে মিল রেখে উজানে যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি জোয়ারের পানিতেও চর পেরোতে গিয়ে অনেক মাছ জালে আটকা পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই দশকে অভ্যন্তরীণ নদীগুলোতে ইলিশ উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে, বিপরীতে সামুদ্রিক উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।

একই সঙ্গে প্রধান প্রজনন ক্ষেত্রগুলো হাতিয়া, সন্দ্বীপ ও ভোলার মতো নিম্ন মোহনা অঞ্চলের দিকে সরে গেছে। কিছু এলাকায় পানির গভীরতা মাছের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে নেমে গেছে। ফলে সেখানে শুধু নৌ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা নয়, ইলিশের চলাচলেও বাধা তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মৎস্য অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে একাধিক প্রতিবন্ধক স্থান চিহ্নিত করেছে, যেখানে ইলিশের চলাচল আংশিকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চর জেগে ওঠা, গভীরতা কমে যাওয়া এবং সরু চ্যানেল তৈরি হওয়ায় সাগর ও প্রজননক্ষেত্রের মধ্যে মাছের যাতায়াত সীমিত হয়েছে। ফলে ইলিশের টিকে থাকা এখন ক্রমেই কয়েকটি নাজুক পরিবেশগত করিডরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

জেলেদের বর্ণনায় জানা যায়, ইলিশের জীবনচক্রে নদীর গভীরতা ও পানির স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডুবোচর ও চর বৃদ্ধি পেলে গভীরতার ঘাটতি তৈরি হয়, আর দূষণ পানির স্বচ্ছতা নষ্ট করে। ভারত ও নেপালের বিভিন্ন বাঁধ ও পানি প্রত্যাহারের ফলে পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদীর প্রবাহ বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ব্যাপকভাবে কমেছে। প্রবাহ কমে গেলে নদীতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ বাড়ে, যা ইলিশের স্বাভাবিক অভিবাসন চক্র ব্যাহত করে।

আমেরিকান জার্নাল অব ক্লাইমেট চেঞ্জ নামক সাময়িকীতে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যানথ্রোপোজেনিক ইন্টারফেয়ারেন্সেস ফর দ্য মরফোলজিক্যাল চেঞ্জেস অব দ্য পদ্মা রিভার ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তনের ফলে বন্যার ধরনে যে পরিবর্তন ঘটে, তা পদ্মা নদীর ভূ-আকৃতিকে প্রভাবিত করতে পারে। বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা নদীর পলির পরিমাণও বদলে দেয়। ফলে নদীকে তার প্রবাহের ধরন ও ভূ-আকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

ইলিশ বলতে পদ্মার ইলিশকেই মনে করা হতো একসময়। কিন্তু পদ্মার সেই সুদিন আর নেই। নদীটি এখন অনেক বেশি বিপর্যস্ত। নদীর প্রবাহে টান পড়ায় ইলিশের উৎপাদন যে অনেক কমে গেছে, তা পাওয়া গেছে এশিয়ান ফিশারিজ সায়েন্স নামের সাময়িকীতে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই বৈশ্বিক প্রবণতায় বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ বিশেষ করে ইলিশ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং নরওয়েজিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের একটি যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় সর্বত্র বৃষ্টির পরিমাণ কমে গেছে।

আর সেই সঙ্গে বেড়েছে তাপমাত্রা। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ‘ক্লাইমেটিক অ্যান্ড অ্যানথ্রোপোজেনিক ফ্যাক্টরস চেঞ্জিং স্পনিং প্যাটার্ন অ্যান্ড প্রোডাকশন জোন অব হিলসা ফিশারি ইন দ্য বে অব বেঙ্গল’- গবেষণায় বলা হয়েছে, মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড, জলবায়ু পরিবর্তন, পলি জমা এবং নদী অববাহিকার পরিবর্তনের কারণে ইলিশের অভিবাসন পথ ও প্রজননক্ষেত্র ব্যাহত, স্থানচ্যুত কিংবা ধ্বংস হয়েছে। গবেষণার ফল বলছে, পদ্মা নদীর কাছে চাঁদপুর স্টেশনে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে শিল্পবর্জ্য, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও প্লাস্টিক বর্জ্যরে কারণে নদীতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাচ্ছে, যা মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস ও খাদ্য সংগ্রহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ইলিশের অন্যতম অভয়াশ্রম চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডারে প্রায় তিন বছর ধরে অন্তত একবার করে মাছের মড়ক দেখা দিয়েছে। কিন্তু গত শুকনা মৌসুমে দুই দফায় মাছের মড়ক দেখা যায়। পদ্মা ও মেঘনা নদীতে ইলিশের বিচরণক্ষেত্রে পানির গুণগত মানের অবনতি হচ্ছে।

সেই সঙ্গে কমছে ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাবারের পরিমাণ। এ ছাড়া নদীর তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, গভীরতা, অক্সিজেনের মাত্রা, বৃষ্টিপাত এবং জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে ইলিশ তার চলাচলের সংকেত পায়। এসব সংকেত পরিবর্তিত হলে ইলিশও তার চলাচলের পথ, সময় এবং প্রজননক্ষেত্র পরিবর্তন করতে পারে। এই সুত্র নির্ভরশীলতাই এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বাংলাদেশের নদী ও মোহনাগুলো ক্রমবর্ধমান চাপে রয়েছে, তখন দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ কি টিকে থাকতে পারবে?

ভবিষ্যতের উষ্ণতর বাংলাদেশে ইলিশের ভবিষ্যৎ শুধু নিষেধাজ্ঞার সময় কতজন জেলেকে মাছ ধরা থেকে বিরত রাখা হলো তার ওপর নির্ভর করবে না, বরং বাংলাদেশে ইলিশ ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় জলজ পরিবেশ কতটা উপযোগী রাখতে পারে, তার ওপর। কারণ ইলিশনীতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবে না, সে অনুসরণ করবে কেবল পানির সংকেত।