ঢাকা, ০৭ জানুয়ারি বুধবার, ২০২৬ || ২৪ পৌষ ১৪৩২
good-food
৩৬

বাসচালক থেকে প্রেসিডেন্ট, ভেনেজুয়েলায় যা যা করেছেন মাদুরো

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২০:৩৬ ৪ জানুয়ারি ২০২৬  

যে জীবনকাহিনি যেকোনো রাজনৈতিক উপন্যাসকেও হার মানায়, সেটিই নিকোলাস মাদুরোর। একসময় যে হাত কারাকাসের রাস্তায় বাসের স্টিয়ারিং হুইল নিয়ন্ত্রণ করত, সেই হাতই এক দশকের বেশি সময় ধরে আঁকড়ে রেখেছে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রক্ষমতা। হুগো চাভেজের ভাবশিষ্য হিসেবে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ, আর তারপর দেশজুড়ে গভীর অর্থনৈতিক সংকট, মানবিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে টিকে থাকার এক বিতর্কিত অধ্যায় রচনা করেছেন তিনি। শ্রমিক নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ যাত্রাপথে ভেনেজুয়েলাকে মাদুরো কী দিয়েছেন, তা নিয়েই আজকের আলোচনা।

চাভেজের উত্তরসূরি হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে

নিকোলাস মাদুরোর রাজনৈতিক উত্থানের মূলে ছিলেন ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতা হুগো চাভেজ। সাধারণ বাসচালক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা থেকে মাদুরো ধীরে ধীরে চাভেজের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে প্রবেশ করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি জাতীয় পরিষদের ডেপুটি স্পিকার হন এবং ২০০৬ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, যা তিনি চাভেজের মৃত্যু পর্যন্ত পালন করেন। চাভেজ তাকে এতটাই বিশ্বাস করতেন যে, মৃত্যুর আগে মাদুরোকেই নিজের উত্তরসূরি হিসেবে ঘোষণা করে যান।

চাভেজের মৃত্যুর পর ২০১৩ সালে মাদুরো প্রথমে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হন এবং পরে এক হাড্ডাহাড্ডি ও বিতর্কিত নির্বাচনে সামান্য ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে প্রথম মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হন।

এক দশকের বিতর্কিত শাসন ও সংকট

ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মাদুরোর শাসনকাল তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার দাবি করলেও, সেই নির্বাচনকে দেশে ও বিদেশে অনেকেই প্রহসন বলে আখ্যা দেয়। তার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ, তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছেন, বিরোধী মতকে কঠোর হাতে দমন করেছেন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন।

২০১৪ সাল থেকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তেলের দামে পতন, দুর্নীতি আর ভুল নীতি দেশকে ঠেলে দেয় এক অভূতপূর্ব সংকটের দিকে। আকাশছোঁয়া মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এর ফলে ভেনেজুয়েলার লাখ লাখ নাগরিক দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, যা লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী সংকট তৈরি করে।

কর্তৃত্ববাদ ও আন্তর্জাতিক চাপ

বিরোধীদের মতে, ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে মাদুরো নানা কৌশল অবলম্বন করেন। ২০১৭ সালে সংবিধান সংশোধনের জন্য তিনি একটি নতুন সাংবিধানিক পরিষদ গঠন করেন, যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তার এই পদক্ষেপকে অনেকেই একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হিসেবে দেখে।

মাদুরোর শাসনের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব কঠোর অবস্থান নেয়। তার সরকার, স্ত্রী এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ওপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ভেনেজুয়েলার ওপর সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিও দেওয়া হয়, যা অঞ্চলটিতে তীব্র উত্তেজনা তৈরি করে। একদিকে যখন আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছিল, অন্যদিকে মাদুরোও ক্ষমতা ছাড়লে নিজের ও সহযোগীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। এই অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, যার ফলে ভেনেজুয়েলা আজও এক রাজনৈতিক ও মানবিক সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।