ঢাকা, ০৪ জুলাই শনিবার, ২০২০ || ২০ আষাঢ় ১৪২৭
good-food
১৫৫

মরণনেশা সেলফি

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৫:৫১ ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

স্মার্টফোনের এই যুগে সেলফোন ব্যবহারকারীরা সেলফি তোলেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এমনকি হাঙরের শিকার হয়ে মৃত্যুর চেয়েও এ সংখ্যা বেশি বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল জানিয়েছে।

পিপল টিভি’র রিপোর্টে জানা যায়, ২০১৮ থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেড়বছরে সারাবিশ্বে সেলফি তুলতে গিয়ে মারা গেছেন ১২০৩ জন। ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মার্টিন ক্যভন বলেন, যেখানে সেখানে সেলফি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা না আনলে দিনদিন সেলফিই মানুষের মৃত্যুর একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দেশে-বিদেশে এরকম দুর্ঘটনা হরদম ঘটছে। গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় সেলফি তোলার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে এক এসএসসি পরীক্ষার্থী নিহত হয়েছে। নিহতের নাম কাওসার (১৬)। ১৩ ফেব্রুয়ারি, বিকালে রাজশাহী-জয়দেবপুর রেললাইনের সাকাশ্বর রেল ওভারব্রিজের পাশে এ ঘটনা ঘটে। নিহত কাওসার হোসেন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের কোনাবাড়ী থানার পারিজাত এলাকার হরিণাচালা গ্রামের সানোয়ার হোসেনের বড় ছেলে। দুই ভাই আর এক বোনের মধ্যে সে সবার বড়। কাওসার চলতি এসএসসি পরীক্ষায় স্থানীয় রিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল থেকে কোনাবাড়ী আরিফ কলেজ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী ছিল।

ডেইলি মেইলের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বে অন্তত ২৫৯ জন সেলফি তুলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। সেখানে হাঙরের মুখে পড়ে মৃতের সংখ্যা ৫০। ভারতের জার্নাল অব ফ্যামিলি মেডিসিন অ্যান্ড প্রাইমারি কেয়ারের রিপোর্টে দেখা যায়, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে সেলফি আসক্তি বেশি। পানিতে ডুবে, রাস্তায় দুর্ঘটনায় কিংবা খাদে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। সেলফিতে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ভারতে। এখনো পর্যন্ত সেই সংখ্যাটা ১৫৯। দুর্ঘটনা রুখতে দেশটির বিভিন্ন জায়গাকে ‘নো সেলফি জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে। তবু থামছে না সেলফি তোলাজনিত দুর্ঘটনা। শুধু মুম্বাইয়েই এ রকম ১৬টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।তবে ভারতের বাইরে ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, জার্মানি, তাইওয়ান, রাশিয়ার মতো দেশেও সেলফির কারণে মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

 সেলফি প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষ তার সর্বশেষ অবস্থান থেকে মুহূর্তে প্রিয়জনের নিকট জানান দিতে পারে। আর একারণেই সেলফি তুলতে গিয়ে কেউ কেউ অহেতুক ঝুঁকি নিয়ে নিচ্ছে। যেমন যানবাহন  চালানো অবস্থায় সেলফি মুহূর্তে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে জেনেও সেই ঝুঁকি অনেকে নেয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের কারণে প্রিয়জনদের মধ্যে দূরত্ব এতো কমে গেছে যে, চাইলে সারাক্ষণ তার প্রিয়জনদের সাথে মুহূর্তগুলো শেয়ার করতে পারে। ফলে মানুষের হূদয়ে জমে থাকা ছোট ছোট কথা, সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো নষ্ট হয়ে যেতে বসেছে। মানবিক সম্পর্ক চর্চার জন্য যেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে মানুষ প্রিয়জনের জন্য শুভ কামনায় অপেক্ষা করতো, ছোট ছোট জমানো স্মৃতিময় অনুভূতি জানানোর আকাঙ্ক্ষায় প্রতিটি মুহূর্তে প্রিয়জনকে মিস করতো। আজকে সেই অপেক্ষা-অনুভূতি-আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি শুধুই অতীত। কিন্তু এটি মনে রাখা দরকার যে, প্রযুক্তির যথেচ্ছার ব্যবহারে আমাদের সামাজিক জীবনে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন বলে মনে করি। ফেসবুক এবং সেলফি প্রচুর সময় ব্যয়, তরুণ-তরুণীদের পড়াশোনা বিমুখ করে তুলছে। অতীতে ছাত্র-ছাত্রীরা অবসরে কোথায় বেড়াতে গেলে বিখ্যাত লেখকদের উপন্যাস পড়ে সময় কাটাতো। এতে তাদের মধ্যে শুভ চিন্তার উদয় হতো এবং নৈতিক মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হতো। কিন্তু এখন ব্যাপারটা হয়ে গেছে উল্টো। বিভিন্ন ভ্রমণে তরুণ-তরুণীরা কেবলি ফেসবুকে সময় কাটিয়ে এবং সেলফি তুলেই ভ্রমণকে উপভোগ করতে চায়। অন্যের লাইক প্রত্যাশা করে। এতে অনেক সময় নানা ধরনের বিপত্তি হতে পারে। যেমন বাসস্থান থেকে দূরে অবস্থানের সংবাদে শত্রুরা তার পরিবারের বড় ধরনের ক্ষতি করে বসতে পারে। আবার চাকরিরত ব্যক্তিদের তাদের কর্মস্থল থেকে অনুমতি ছাড়া দূরে ভ্রমণে গিয়ে সেলফি পোস্ট করায় কর্তৃপক্ষের তিরস্কার সহ্য করতে হতে পারে। সেলফির মাধ্যমে  বাহ্যিক সৌন্দর্য প্রকাশের এই প্রতিযোগিতায় ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য এবং গুণাগুণও ক্রমশ লোপ পাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়। সেলফির সচেতন এবং কার্যকর ব্যবহার অবশ্যই করা যেতে পারে। বিপজ্জনক সেলফি যেমন দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে, তেমনি সারাদিন সেলফি তোলার ব্যস্ততা তরুণ-তরুণীদের জীবনীশক্তিকে শেষ করে দিতে পারে। তাই সেলফি জেনারেশন হলেই কেবল চলবে না, দায়িত্বশীল মানুষও হতে হবে।