ঢাকা, ২৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২১ || ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭
good-food
৬৯

মিশরের ইতিহাস প্রাচীন, সমৃদ্ধ ও রহস্যময়

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:৪০ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১  

মিশরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন, সমৃদ্ধ, এবং রহস্যময়। শত শত বছর ধরে মিশরে প্রচলিত ছিল বিভিন্ন ভাষা, আর তাই মিশরেরও ছিল বিভিন্ন নাম। বর্তমানে এর প্রাতিষ্ঠানিক নাম জমহুরিয়া মিশর আল-আ্যারাবিয়া বা আরব প্রজাতান্ত্রিক মিশর।  


এক পর্যায়ে রোসেটা স্টোন এর সহায়তায় মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক্সের গুপ্ত সংকেতসমূহের পাঠোদ্ধারের মাধ্যমে সেই রহস্যের খানিকটা উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়। পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্যের মধ্যে একটি হল মিশরের দ্যা গ্রেট পিরামিড অব গিজা। তাছাড়া মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার সুবিখ্যাত পাঠাগারটিই ছিল সেই সময়ের একমাত্র লাইব্রেরি।


অন্তত ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরে নিল নদ উপত্যকায় প্রথম মানব বসতি স্থাপন করা হয়। ৩১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম রাজবংশের 'ফারাও' রাজা নারমার অধীনে প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতায় উর্ধ্ব ও নিম্ন মিশরকে একই রাজ্যের আওতাভুক্ত করা হয়। মিশরের স্থানীয় আদিবাসীদের শাসন খ্রিস্টপূর্ব ষোড়শ শতকে হাখমানেশি সাম্রাজ্য বা আকিমিনীয় সাম্রাজ্যের আক্রমণের আগ পর্যন্ত টিকে ছিল।


খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সনে মেসিডেনীয়ান শাসক আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট হাখমানেশিদের পরাস্ত করে মিশর দখল করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন হেলেনীয় টলেমাইক রাজবংশের শাসন, যার প্রথম শাসক ছিলেন আলেকজান্ডারের প্রাক্তন জেনারেলদের একজন টলেমি আই সোটার।

 

কিন্তু টলেমাইক শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে এবং অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের কারণে এই রাজত্বের পতন ঘটে যে কারণে রোমান শাসকদের জন্য মিশর দখল করার পথ প্রশস্ত হয়ে যায়। ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর পরে মিশরের নামমাত্র স্বাধীনতটুকুরও অবসান ঘটে যার ফলে মিশর রোমান সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশ হয়ে ওঠে।


মিশরে রোমান সাম্রাজ্যের শাসন ৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৬৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর মাঝে অবশ্য ৬১৯-৬২৯ সনের সাসানীয় সাম্রাজ্যের সংক্ষিপ্ত শাসনকালও বিদ্যমান।


মুসলিম শাসকদের হাতে রোমনদের পতনের মাধ্যমে মিশরে মুসলিম শাসনামল শুরু হয়। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রা.-র যুগে সেনাপতি হযরত আমর ইবনুল আস রা. এর নেতৃত্বে ৬৪১ সনে মিশর জয় করেন। আমর ইবনুল আস রা. মিশরীয় রাজধানী "ফুসতাত"-র গোড়াপত্তন করেন এবং এর কেন্দ্রে বিখ্যাত আমর ইবনে আস মসজিদ নির্মাণ করেন|

 

এরপর থেকে মিশরে খেলাফতে রাশেদা(৬৩২-৬৬১), উমাইয়া খেলাফত(৬৬১-৭৫০), আব্বাসী খেলাফত(৭৫০-৯৩৫), ফাতেমী খেলাফত (৯০৯-১১৭১), আউয়ুবী সালতানাত (১১৭১-১২৬০),  মামলুক সালতানাত(১২৫০-১৫১৭) এবং উসমানী শাসন (১৫১৭-১৮৬৭) অব্যাহত থাকে।


১৮৬৭ নাগাদ মিশর পুরোপুরি উসমানী সাম্রাজ্যের শাসনাধীনই থাকে শুধু মাঝখানের ১৭৯৮ থেকে ১৮০১ খ্রিস্টাব্দব্যাপী ফ্রেঞ্চ আগ্রাসন বাদে। ১৮৬৭ এর শুরুর দিকে মিশর একটি নামমাত্র স্বায়ত্তশাসিত ট্রিবিউটারি রাজ্যে পরিণত হয় যার নাম দেওয়া হয় মিশরীয় খেদিভেত। ১৮৮২ সনে অ্যাংলো-ইজিপশিয়ান যুদ্ধের মাধ্যেমে মিশর ব্রিটিশদের অধীনে চলে আসে।

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯১৯ সনে সংঘটিত মিশরীয় অভ্যুত্থানের পর মোহাম্মদ আলী রাজবংশের হাতে 'মিশর-রাজ্য' প্রতিষ্ঠা হয়। যদিও এই সময় মিশরের বহিরাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। এভাবে ১৯৫৪ সাল নাগাদ অ্যাংলো-ইজিপশিয়ান চুক্তি সহকারে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণ স্থায়ী হয়।


আধুনিক গণপ্রজাতন্ত্রী মিশর প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে। আর ব্রিটিশ সৈন্যরা সম্পূর্ণরূপে মিশর ছেড়ে যায় ১৯৫৬ সনে সুয়েজ খালে সংঘটিত  ইসরায়েল, ব্রিটেন ও ফ্রান্স কর্তৃক ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসনের পরাজয়ের পরে যা সুয়েজ সংকট নামে পরিচিত।

 

এর পর থেকেই মিশর সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন এবং এর নিজস্ব অধিবাসীদের হাতে শাসিত একটি রাষ্ট্ররূপে পরিগণিত হয়। অভ্যন্তরীণ শাসক জামাল আব্দুন নাসের (১৯৫৬-১৯৭০ নাগাদ রাষ্ট্রপতি) মিশরে অনেক পরিবর্তন আনেন এবং তিনিই সিরিয়ার সাথে স্বল্পমেয়াদী ইউনাইটেড আরব রিপাবলিক(১৯৫৮-১৯৬১) গঠন করেন।

 

১৯৬৪ সালের গঠিত প্যালেস্টাইন লিবারেশান ফ্রন্ট (পিএলও)-র প্রতিষ্ঠায় তিনি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিলেন। জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যামের সংগঠনেও নাসেরের ভূমিকা প্রধান ছিল। ১৯৬৪ সালের গঠিত প্যালেস্টাইন লিবারেশান ফ্রন্ট (পিএলও)-র প্রতিষ্ঠায় নাসের প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিলেন।


তার পরবর্তী রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতও(১৯৭০-১৯৮১) মিশরে অনেক পরিবর্তন আনেন। নাসেরবাদের অনেক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধারাকে বিদায় দিয়ে বহুদলীয় প্রথার প্রবর্তন করেন এবং ইনফিতাহ নামক অর্থনীতি চালু করেন। ১৯৭৩ সালে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ উদ্ধারের জন্য ইয়ম কিপুর যুদ্ধে তিনি মিশরের নেতৃত্ব দেন।

 

১৯৬৭ সালে ছয়দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল তা দখল করে নিয়েছিল। এ কারণে মিশর ও আরব বিশ্বে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এরপর তিনি ইসরায়েলের সাথে আলোচনায় বসেন এবং মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির কারণে আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিম শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। চুক্তির ফলে মিশর সিনাই উপদ্বীপ ফিরে পায়।


বর্তমান মিশরের ইতিহাস সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসনি মুবারকের ত্রিশ বছরের শাসন পরবর্তী ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত। ২০১১-র মিশর বিপ্লবের মাধ্যমে হোসনি মুবারক পদত্যাগ করেন এবং মিশরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিকভাবে একজন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন যিনি হলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি মুহাম্মাদ মুরসি।

 

মুহাম্মাদ মুরসি তার বিজয়ভাষণে ঘোষণা দেন, তিনি মিশরের বর্তমান আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, প্রত্যক্ষ ভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলবেন এবং ভূরাজনীতিকভাবে ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনযোগী হবেন। তিনি সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ও বিদ্রোহীদের সাহায্য করার জন্য বিশ্ববাসীকে আহ্বান করেন।