ঢাকা, ১৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার, ২০২৬ || ৩০ পৌষ ১৪৩২
good-food

সন্তানের বিয়েতে যা যা করা উচিত মা-বাবার

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৬:৪৪ ১৩ জানুয়ারি ২০২৬  

সন্তান যখন বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আনন্দের পাশাপাশি মা–বাবার মনে তৈরি হয় নানা ভাবনা। সমাজ-সংস্কৃতি, আত্মীয়তার সমীকরণ আর সম্পর্কের বাস্তবতা সবকিছু মিলিয়ে বিয়ের আয়োজন যেমন আবেগের, তেমনি দায়িত্বেরও। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মা–বাবার সব সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ভারসাম্যপূর্ণ, সংযত এবং বাস্তবসম্মত। সন্তানের নতুন জীবনের ভিত্তিটাকে শক্ত করে তোলাই এখানে প্রধান লক্ষ্য।

সন্তানের মতামতের প্রাধান্য

বাংলাদেশে এখনও বহু পরিবারে বিয়েকে সামাজিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বিয়ে মূলত দুই ব্যক্তির জীবনের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি। তাই পাত্র বা পাত্রী সম্পর্কে সন্তান কী ভাবছে, তার পছন্দ-অপছন্দ কী, ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন এসব বিষয়ে তাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মা–বাবার অভিজ্ঞতা মূল্যবান, তবে সে অভিজ্ঞতার উপর ভর করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে সম্পর্কের ভিত্তিতেই দুর্বলতা থেকে যেতে পারে। সন্তানের স্বচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই মা-বাবার প্রথম বিবেচনা হওয়া উচিত।

দুই পরিবারের মানসিক সামঞ্জস্যতা

একটি বিয়ে তখনই সুষ্ঠুভাবে এগোয়, যখন দুই পরিবারের মূল্যবোধ ও জীবনধারা মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। এটি সব ক্ষেত্রে এক হওয়া জরুরি নয়, তবে পারস্পরিক সম্মানবোধ, সংস্কৃতির প্রতি সহনশীলতা, রুচি-বোধের ভারসাম্য এসব বিষয় ভবিষ্যতের সম্পর্ককে সহজ করে দেয়। অনেক সময় অভিভাবকরা ‘পারফেক্ট ম্যাচ’ খুঁজতে খুঁজতেই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তের সুযোগ হারিয়ে ফেলেন। জীবনসঙ্গী ও তার পরিবার কেমন হবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা জরুরি হলেও অযথা সন্দেহ বা অতিরিক্ত যাচাই কখনও কখনও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করে। সুষম দৃষ্টিভঙ্গিই এখানে সবচেয়ে কার্যকর।

যথাযথ আর্থিক পরিকল্পনা

বিয়েকে ঘিরে আড়ম্বরের প্রবণতা সমাজে চোখে পড়ার মত। কোন পরিবার কত বড় আয়োজন করল এ নিয়ে চলে এক নিরব প্রতিযোগিতা। আভ্যন্তরীণ এ প্রতিযোগিতা অনেক সময় সম্পর্কের উষ্ণতা নষ্ট করে দেয়। অনেকেই সমাজের চোখে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে ধার-দেনা করে হলেও বিয়ের জাকজমকপূর্ন আয়োজন করেন। অথচ বিয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি ব্যয়ের পরিমাণ নয়, সম্পর্কের মান। তাই মা–বাবার উচিত আগে থেকেই বাজেট নির্ধারণ করা। অপ্রয়োজনীয় খরচ, বিলাসিতার প্রদর্শন বা সামাজিক চাপের কারণে ব্যয় বাড়ানো ভবিষ্যতে আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। সাদামাটা, পরিমিত এবং সুশৃঙ্খল আয়োজনই সন্তানের নতুন জীবনের জন্য অর্থবহ উপহার হয়ে উঠতে পারে।

যৌতুকের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান

যৌতুক বাংলাদেশে এখনো একটি সামাজিক ব্যাধির মতো টিকে আছে। বিয়ের কথাবার্তার মধ্যেই কখনো কখনো আর্থিক শর্ত, উপহার বা সামাজিক মর্যাদার কথিত নিরিখ সামনে চলে আসে। অথচ যৌতুক শুধু আইনগতভাবে অপরাধই নয়, সম্পর্কের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। তাই মা–বাবার উচিত সন্তানের বিয়ের ক্ষেত্রে যৌতুকের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। যে সম্পর্ক শুরুতেই শর্তের ওপর দাঁড়ায়, সেখানে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের জায়গা কমে যায়।

সন্তানের মানসিক প্রস্তুতি ও দায়িত্ববোধ

এখনকার তরুণ সমাজ অনেক বেশি স্বাধীনচেতা, ফলে সম্পর্কের দায়িত্ববোধের বিষয়ে সচেতনতা তাদের মধ্যে সবসময় সমানভাবে গড়ে ওঠে না। বিয়ে একটি মানসিক প্রতিশ্রুতি , এতে মানিয়ে নেওয়া, সমঝোতা, সময় দেওয়া সবই প্রয়োজন। মা–বাবার উচিত সন্তানকে বোঝানো যে বিয়ে মানে শুধু অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িত যৌথ জীবনের বাস্তবতা। কাজ, ক্যারিয়ার, সংসার সবকিছুর ভারসাম্য রক্ষা করতে মানসিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি।

পাত্র–পাত্রী সম্পর্কে যুক্তিযুক্ত তথ্য যাচাই

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে মানুষের চরিত্র, আচরণ, জীবনধারাসহ অনেক কিছুই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তবে যাচাই-বাছাই মানে সন্দেহ নয়; এটি সচেতনতার অংশ। পাত্র বা পাত্রী পড়াশোনা, তাদের পেশা এবং তার পরিবার সম্পর্কে জানা জরুরী। তবে প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে বিরক্তিকর বা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে শালীন ও যুক্তিসঙ্গত অনুসন্ধানই যথেষ্ট।

ক্যারিয়ার ও শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা

বিয়ের পর মেয়েরা পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার থামিয়ে দেবে এ ধারণাটি এখনও অনেক পরিবারেই বিদ্যমান। কিন্তু আজকের যুগে বিয়ে আর ক্যারিয়ার একে অপরের পরিপন্থী নয়। বরং পরিবারের সমর্থন থাকলে দুই পক্ষই ক্যারিয়ারকেই এগিয়ে নিতে পারে। বিয়ের পরও সন্তান যেন তার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে পারে, পছন্দসই পেশা বা শিক্ষাযাত্রা এগিয়ে নিতে পারে সে বিষয়টি আগেই মা–বাবার নিশ্চিত করা উচিত।

বিয়ের আয়োজন পরিকল্পনায় সংযম

অতিথি তালিকা থেকে শুরু করে সাজসজ্জা, খাবার, ফটোগ্রাফি সবকিছুতেই এখন বাণিজ্যিকতার ছোঁয়া। কিন্তু আসল আনন্দ থাকে সুষ্ঠু আয়োজন ও প্রিয় মানুষদের উপস্থিতিতে। মা–বাবার উচিত দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া এবং আয়োজনকে পরিমিত রাখা। জীবনের নতুন অধ্যায়ের আনন্দ যেন বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে হারিয়ে না যায়।

বিয়ের পর সহায়ক ভূমিকা

নতুন দম্পতির সম্পর্কের প্রথম বছরগুলোতে মা–বাবার সমর্থন অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে এই সমর্থন যেন হস্তক্ষেপে রূপ না নেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। প্রয়োজন হলে পরামর্শ দিন, কিন্তু সিদ্ধান্ত সন্তানের হাতে থাকুক। শ্রদ্ধা, দূরত্ব এবং বোঝাপড়া এই তিনটি মিলে গড়ে দেয় সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক।

সন্তানের বিয়ে মা–বাবার জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি নতুন ধরনের দায়িত্বেরও। আবেগের সঙ্গে বাস্তবতার ভারসাম্য, যুক্তির সঙ্গে সমঝোতা সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একটি স্থিতিশীল, সুখী ও সম্মানজনক সম্পর্কের ভিত্তি। সেই ভিত্তি গড়ে দেওয়ার কাজটি শুরু হয় মা–বাবার সচেতন সিদ্ধান্ত থেকেই।

লাইফস্টাইল বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর