ঢাকা, ২৬ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার, ২০২৬ || ১৪ ফাল্গুন ১৪৩২
good-food

সুপারফুড আসলেই কি এত শক্তিশালী?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২০:২৪ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  

আজকাল স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মুখে একটি শব্দ প্রায়ই শোনা যায় আর তা হলো সুপারফুড। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে ডায়েট চার্ট পর্যন্ত সবখানে এই সুপারফুডের জয়জয়কার। আমরা অনেকেই মনে করি সুপারফুড মানেই এমন কোনো খাবার যা খেলে রাতারাতি শরীর বদলে যাবে অথবা সব রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু এই সুপারফুড বিষয়টি কি আসলেও কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য নাকি এটি কেবল কোম্পানিগুলোর চড়া দামে পণ্য বিক্রির একটি কৌশল চলুন জেনে নেই সুপারফুড নিয়ে প্রচলিত সব ধারণা এবং এর পেছনের প্রকৃত বিজ্ঞান।

সুপারফুড শব্দের আদি কথা

সুপারফুড শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে। সেই সময় পুষ্টিবিদরা এমন কিছু খাবারের কথা বলতেন যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। মূলত শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক পুষ্টি উপাদান সরবরাহকারী খাবারগুলোকেই তখন এই নামে ডাকা হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে এই শব্দের অর্থ পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন এটি মূলত একটি মার্কেটিং বা বিপণন কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বড় বড় খাদ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো সাধারণ কিছু খাবারকে জাদুকরী ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রচার করে অনেক বেশি দামে বাজারে বিক্রি করছে। বিজ্ঞাপনে এমনভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয় যেন মনে হয় এই খাবারগুলো খেলে আপনি কোনোদিন অসুস্থ হবেন না। এই প্রচারণার ভিড়ে আসল সত্য আর বিপণন কৌশল আলাদা করা সাধারণ মানুষের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সুপারফুড

মজার বিষয় হলো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সুপারফুড নামক কোনো শব্দের সুনির্দিষ্ট বা আনুষ্ঠানিক সংজ্ঞা নেই। তবে বিজ্ঞানীরা একমত যে এই ধরণের খাবারগুলোতে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের তালিকায় আছে ক্যারোটিনয়েড, ফ্লাভোনয়েড এবং ফেনোলিক কম্পাউন্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আমাদের শরীরে প্রতিনিয়ত কিছু ক্ষতিকর কণা বা ফ্রি র‍্যাডিক্যাল তৈরি হয় যা আমাদের কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয় এবং মানুষকে দ্রুত বুড়ো করে ফেলে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মূলত এই ক্ষতিকর কণাগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে।

অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নিয়ে বিশ্বে অসংখ্য গবেষণা হয়েছে। অধিকাংশ গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি এবং ফলমূল খান তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি অনেক কম। তবে বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন যে এই সুফল কি কেবল অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কারণে নাকি খাবারের মধ্যে থাকা অন্যান্য সব উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে ঘটে। অর্থাৎ কেবল একটি উপাদানকে হিরো বানিয়ে সেটিকে জাদুকরী বলা বিজ্ঞানের ভাষায় কিছুটা ভুল হতে পারে।

সাপ্লিমেন্ট বনাম প্রাকৃতিক খাবার

সুপারফুডের জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে বাজারে এখন নানা ধরণের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট বা পিল পাওয়া যায়। অনেকে ভাবেন ফলমূল খাওয়ার চেয়ে একটি ট্যাবলেট খেয়ে নেওয়া বোধহয় বেশি কার্যকর। কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে বড় বিপদ। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন যে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যেমন গবেষণায় দেখা গেছে যে অতিরিক্ত বিটা ক্যারোটিন সাপ্লিমেন্ট যারা ধূমপান করেন তাদের ফুসফুসে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। একইভাবে অতিরিক্ত ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে প্রোস্টেট ক্যান্সার এবং স্ট্রোকের আশঙ্কা বৃদ্ধি পায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো এই ঝুঁকিগুলো কেবল ল্যাবে তৈরি সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আপনি যদি সরাসরি প্রাকৃতিক খাবার যেমন ফল বা সবজি থেকে এই পুষ্টি গ্রহণ করেন তবে এমন কোনো ঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রকৃতিতে প্রতিটি পুষ্টি উপাদান এমন এক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে যা আমাদের শরীরের জন্য নিরাপদ। তাই ট্যাবলেট খেয়ে পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করার চেয়ে থালায় রঙিন সবজি রাখা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

তাহলে কি সুপারফুড খাবেন না

সুপারফুড বিপণনকারীদের দাবি অনুযায়ী হয়তো জাদুকরী নয় তবে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। আপনি আপনার প্রতিদিনের ডায়েটে এই ধরণের খাবার অবশ্যই রাখবেন কারণ এগুলো দীর্ঘমেয়াদে আপনাকে রোগমুক্ত রাখতে সাহায্য করবে। তবে তার জন্য আপনাকে আপনার বাজেটের সব টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে আসা আসাই বেরি বা গোজি বেরির মতো দামী খাবার কিনতে হবে না।

আমাদের হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন অনেক সাধারণ খাবারই আসলে সুপারফুড। যেমন ব্রকলি, লাল ক্যাপসিকাম, পালং শাক, বাদাম এবং টমেটো। এই খাবারগুলোতে যে পরিমাণ পুষ্টি আছে তা পৃথিবীর দামী যেকোনো সুপারফুডের সমান। এছাড়া ব্লুবেরি বা স্ট্রবেরির বদলে আমাদের দেশীয় মৌসুমি ফলগুলো যেমন পেয়ারা বা আমলকীও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের দারুণ উৎস।

সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে যা ভাববেন

সাপ্লিমেন্ট কখনো আপনার সুষম খাদ্যের বিকল্প হতে পারে না। তাছাড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সাপ্লিমেন্ট অন্যান্য ওষুধের সাথে বিক্রিয়া করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান তারা যদি ভিটামিন ই সাপ্লিমেন্ট নেন তবে শরীরের ভেতর রক্তপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই যেকোনো ধরণের সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আপনি যদি নিয়মিত টাটকা শাকসবজি আর ফলমূল খান তবে আপনার আলাদা করে কোনো সুপারফুড বা দামী ওষুধের প্রয়োজন নেই। সুস্বাস্থ্যের রহস্য কোনো দামী প্যাকেটের ভেতরে নয় বরং প্রকৃতির দেওয়া সহজলভ্য খাবারের মাঝেই লুকিয়ে আছে। খাবার দাবারের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য বজায় রাখুন এবং কৃত্রিম বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ না হয়ে মাটির কাছের খাবারগুলো গ্রহণ করুন। মনে রাখবেন সুস্থ জীবন যাপনের জন্য কোনো শর্টকাট নেই বরং সঠিক খাদ্যাভ্যাস আর সচেতনতাই হলো আসল সুপার পাওয়ার। আজ থেকেই নিজের খাবারের থালাকে রঙিন সবজিতে সাজিয়ে তুলুন এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ বাঁচিয়ে সুস্থ থাকুন। আপনার সচেতনতাই আপনার সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি।