ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার, ২০২৬ || ১০ আশ্বিন ১৪৩৩
good-food
২২২

আদালতে অঝোরে কাঁদলেন রামিসার মা

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:১৬ ২ জুন ২০২৬  

আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার সময় সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদলেন রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশু রামিসা আক্তারের মা পারভীন আক্তার। এসময় আদালতের পরিবেশ ভারী হয়ে যায়।

মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাক্ষ্য দিতে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায় ওঠেন পারভিন আক্তার।

এদিন সকাল পৌনে ১১টার দিকে বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। শুরুতেই সাক্ষ্য দেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। এরপর তাকে জেরা করেন  আসামি পক্ষের স্টেট ডিফেন্স মুসা কালিমুল্যাহ। এরপর দ্বিতীয় সাক্ষী মামলার প্রত্যক্ষদর্শী পারভীন আক্তারের জবানবন্দি শুরু হয়।

জবানবন্দিতে পারভীন আক্তারে বলেন, “আমি সকালে রান্না করছিলাম। আমার বড় মেয়ে স্কুলে গেলেও ছোট মেয়ে স্কুলে যায়নি। আমি রান্না করে থাকায় রামিসা যে স্কুলে যায়নি এটা বুঝতে পারিনি। রান্নাঘর থেকে বের হয়ে দেখি আমাদের গেট খোলা। বললাম যে মেয়ে দুটো গেটটা খুলে রেখে স্কুলে চলে গেল। বড় মেয়ে স্কুল থেকে একা আসলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি তুমি একা কেন রামিসা কোথায়? বলে রামিসাতো স্কুলে যায় নাই। এরপর তাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করি।”

এক পর্যায়ে আসামিদের বাসার দরজার সামনে রামিসার জুতা দেখতে পান জানিয়ে তিনি আদালতকে আরও বলেন, “আসামিদের বাসার গেটের সামনে মেয়ের জুতা দেখি। জোরে জোরে ধাক্কা দিলেও তারা দরজা খোলে না। তখনই আমার সন্দেহ  হয়। এরাই কি তবে আমার মেয়েকে আটকে রেখেছে? অনেক লোকজন জড়েো হয়। আমার স্বামীকে ফোন করি। দরজা ভেঙে বাথরুমে গিয়ে দেখি রক্ত আর রক্ত। বাথরুমে মেঝেতে আমার মেয়ের দেহ থেকে মাথা আলগা করা দেখি। এসময় আসামি স্বপ্নাকে বাসায় হাঁটাহাটি করতে দেখি। জড়ো হওয়া মানুষ বলাবলি করেছে,  মেয়েটাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।”

এরপর আসামিপক্ষের আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ তাকে জেরা করেন।

এর আগে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা জবানবন্দিতে বলেন, “ঘটনার সময় আমি অফিসে ছিলাম। আমার স্ত্রীর পারভীন আক্তারের ফোন পেয়ে আমি দ্রুত বাসায় আসি। এসে বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো দেখতে পাই। আমার স্ত্রী আমাকে জানায় যে আমাদের ফ্ল্যাটের উল্টা পাশের আসামিদের ফ্ল্যাটে আমার মেয়ে আছে। আমরা দরজা খোলার চেষ্টা করি, কিন্তু দরজাটি ভেতর থেকে লক করা।”

তিনি বলেন, “এরপর হাতুড়ি দিয়ে পেটালে দরজার লকটি খুলে যায়। লকের ছিদ্র দিয়ে আমি এক মহিলাকে দেখি। লোকজন দরজাটা খুলে ফেলে। ভেতরে গিয়ে কমন রুমের দরজার সামনে আমি রক্ত দেখতে পাই। এ রুমে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্ন থাকে। টয়লেটের ভেতরে মেয়ের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।”

এই মামলায় সাক্ষ্য দিতে আদালতে ১৬ জন উপস্থিত হয়েছেন। আসামিদের উপস্থিতিতেই সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান গত ২৪ মে প্রসিকিউশন বিভাগে অভিযোগপত্র জমা দেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে অভিযোগপত্রটি উপস্থাপন করা হয়। এরপর চার্জশিটটি আমলে গ্রহণ করে বিচারের জন্য ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বদলির আদেশ দেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হক। 

গত ১৯ মে সকালে আসামিদের ঘর থেকে শিশুটির মাথা বিচ্ছিন্ন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় সেদিনই শিশুটির বাবা দুইজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। এরপর ২০ মে প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালতে দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন। একইদিন তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এদিকে শিশুটিকে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তির আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২১ মে রাতে তিনি শিশুটির মিরপুরের বাসায় গিয়ে শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

এই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ছাত্র-শিক্ষক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ দ্রুতবিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। 

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান পবিত্র হজ পালন শেষে সোমবার দেশে ফিরে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ওয়াদা অনুযায়ী ১৫ কর্মদিবসে এই ঘটনার বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায়কে কার্যকর করার জন্য হাইকোর্টে পাঠাতে হবে। 

তিনি আসামির পক্ষে কোনো আইনজীবীকে না দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমি অনুরোধ করব- আত্মস্বীকৃত এই ধরনের বদমাইশদের পক্ষে কোন আইনজীবী যেন আদালতে না যায়। এটা নিয়ে কেউ যেন কোন রাজনীতি না করে, এটা আমাদের ইজ্জত বাঁচানোর লড়াই।”

অপরাধ বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর