ঢাকা, ০৪ মার্চ সোমবার, ২০২৪ || ২১ ফাল্গুন ১৪৩০
good-food
১৮৭

আমাদের কালের নবান্ন

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:০৮ ২০ ডিসেম্বর ২০২৩  

শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর। ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বেজে গেলেও চারিদিক কুয়াশার চাদরে অন্ধকারে ঢাকা। ফলে সুয্যি মামার অভাবে পৌষের মিষ্টি রোদের দেখাও নাই। তখনো লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। মায়ের হাঁকডাকে আড়ষ্টতা ভেঙে লেপের ভেতর থেকে উঁকি দিতেই হেঁশেলে আগুনের জ্বলজ্বল শিখা চোখে পড়ল। মা বললেন, ‘উঠ, ধুপি (ভাপা পিঠা) ঠান্ডা হয়ে গেল যে’। 

 

চুন-সুরকী, কাঠের তীর-বর্গা দিয়ে তৈরী আমাদের একতলা বাড়িটা প্রধান সড়ক লাগোয়া উত্তর-দক্ষিণে লম্বালম্বি। তার ঠিক উল্টোদিকে কাঁচা ইটের তৈরী ভাঁড়ার ঘর, ঘরের নিচেই টালির তৈরী একচালাতে হেঁশেল। সেখানে চলে রান্না-বান্নার আয়োজন। বাড়ির মধ্যিখানের আঙিনার একদিকে পানির নলকূপ, প্রশ্রাব-পায়খানা-গোসলখানা; আর অন্যদিকটা খোলা। সেই খোলা আঙিনায় বরিন্দের জমি থেকে আসা আমন ধানের উঁচু স্তুপ। ঘরের বারান্দার এক কোনে ছিল প্রকান্ড একটা মাটির গোলা। সেই গোলায় সারা বছরের জন্য ধান মজুত রাখা হতো।  

 

পুরো বাড়িময় আমন ধানের সোঁদা গন্ধে ভরপুর। এসময় গৃহস্থ বাড়িতে বাড়িতে চলে নবান্নের উৎসব। বাড়ির ছেলে-মেয়েরাও শুরু করত পিঠা-পুলি খাওয়ার বায়না। নবান্ন উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন, বিশেষত মামাত-ফুফাত-খালাত ভাই-বোনদেরও দাওয়াত করা হতো। তাই নবান্নের প্রস্তুতি হিসেবে ক’দিন আগেই কুট্টিকে (যারা ঢেঁকিতে ধান ভানে) চাল করার জন্য ধানের সাথে বাড়তি ধানও দেয়া হয়েছে পিঠা, পুলি, পায়েস, ক্ষীর-ধুপি খাওয়ার জন্য। 
কত-শত বাহারী সব নাম এসব পিঠা-পুলির।

 

খেজুর গুড় বা তিলের পুর দেয়া পিঠা, আন্ধাসা (তেল পিঠা, পাকোয়ান পিঠা), রস পিঠা, চিতাই পিঠা, দুধ পিঠা, পাটিসাপটা, ক্ষীর-পায়েস, আঁইখার ক্ষীর, গড়গড়্যা (শিশু সন্তান তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারবে বলে খাওয়ানো হয়), মুঠা (হাতের মুঠের আকৃতিতে তৈরী এক ধরণের মিষ্টি), ঝাল (সুঁট বা শুকনো আদা মিশ্রিত পিঠা; যা সদ্য প্রসুতির উপকারার্থে খাওয়ানো হয়), পুরি (গুড়-বুটের ডাল মিশ্রিত পুর দিয়ে তৈরী ভাজা পিঠা), রহম বা জোরা (চাল-গুড়-দুধ মিশ্রিত এক ধরণের মিষ্টি, যা জমিতে ফসল বেশী হবে আশায় মসজিদে বিতরণ করা হতো), আটার লাড়ু ইত্যাদি।    

 

গতদিন বিকেলেই কুট্টি ধুপির আটা দিয়ে গেছে। তাই চলছে ধুপি খাওয়ার আয়োজন। হেঁশেলে মাটির আখার (চুলা) চারিদিকে আমরা সব ভাই-বোনেরা কাঠের পিঁড়ি নিয়ে গোল হয়ে বসে গেছি। নানি ধুপি বানাচ্ছে। বাড়ির তৈরী ধুপি বেশ বড়-বড়। তাতে আবার খেজুরের গুড় দেয়া। একটা খেতেই কুপোকাত। খুব খায়েশ হলে আর একটা। আমার গুড় ছাড়া ধুপিই প্রিয়। তখন অবশ্য নারিকেল দিয়ে ধুপি খাওয়ার রেওয়াজ হয়নি। 

 

বেশ ক’দিন ধরেই চলত এসব পিঠা-পুলি খাওয়ার উৎসব। একেকদিন চলত একেক ধরণের পিঠার উৎসব। বাড়ির মা-বোনেরা রাত জেগে এসব পিঠা-পুলি তৈরী করতেন। আবার বেড়াতে আসা আত্মীয়-স্বজনেরাও হাত লাগাতেন। সকালে উঠে সেই পিঠা নিয়ে বসে পড়ত বাড়ির সব বয়সী সদস্যরা। আর বেশ আয়েশ করে চলত এসব পিঠা খাওয়া। দেওয়া হতো আত্মীয় স্বজনের বাড়িতেও। হারানো সেই স্মুতিজাগরুক স্মৃতিগুলো আবেগী মনকে এখনো বড্ড স্মৃতিকাতর করে ফেলে। জ্বলজ্বলে স্মৃতিগুলো এখনো মানসপটে ভেসে ওঠে, মাঝে-মাঝে করে তোলে বড্ড উদাসী।

 

লেখক: আবুল বাশার বাদল

ফ্রিল্যান্সার রিপোর্টার