ঢাকা, ২৪ জানুয়ারি সোমবার, ২০২২ || ১১ মাঘ ১৪২৮
good-food
৪৯

জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ: দরকার গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকা

।। অনোয়ার হক।।

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৪:১০ ১৩ জানুয়ারি ২০২২  

জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাস মানবাধিকার ও উন্নয়ন-অগ্রগতির সরাসরি প্রতিবন্ধক। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আনলে এ কথা বলা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে পবিত্র ধর্মকে অপব্যবহার করে সন্ত্রাসী-জঙ্গিরা সাধারন ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। বিপথে নিয়ে যায় তরুণ-যুবক সমাজকে। সৃষ্টি করে সামাজিক-রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা। এর সমন্বিত প্রতিরোধ দরকার। আর এ ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারে শক্তিশালী গণমাধ্যম।     

 

জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন জাতীয় সমন্বিত উদ্যোগ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, কর্মপদ্ধতি নির্ধারন, ব্যাপক প্রচারণা এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি। আর এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের গণমাধ্যম রাখতে পারে গুরুত্বপূর্ণ কার্যকর ভূমিকা। 
গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে দরকার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, পরিবার ও ধর্মীয় সমাবেশ - সকল ক্ষেত্রেই জঙ্গি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আলোচনা, দিকনির্দেশনা। 

 

ব্যাপক গণসংযোগের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনাসহ সংবাদ, বিশেষ ফিচার-কলাম, পোস্টার, লিফলেট, অনুষ্ঠান, নাটক-সাহিত্য, বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ইত্যাদি গণমাধ্যম তথা ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। 

 

মিডিয়ায় সমন্বিতভাবে সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন চালানো গেলে তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নেয়া কার্যক্রমগুলো মিডিয়ায় প্রচার দরকার। পত্রিকা-রেডিও-টেলিভিশন-অনলাইন মিডিয়া ও সিনেমা-থিয়েটার-নাটকসহ অন্যান্য গণমাধ্যম এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

 

এছাড়া সাংবাদিক সংগঠনগুলোও গ্রহণ করতে পারে ব্যাপক বহুমাত্রিক কার্যক্রম।  বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে সুস্পষ্ট জঙ্গি-সন্ত্রাসবিরোধী বক্তব্য তুলে ধরতে হবে। ক্রমাগত জনসংযোগ করার ফলে দুর্বল মন:স্তত্ত্বের অধিকারী এবং অর্বাচীন যুবারা স্বার্থান্বেষীর পাতা ফাঁদে পড়া হতে রক্ষা পেতে পারবে। 

 

নিয়মিতভাবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি গ্রহণ, বিবিধ পুরষ্কার এবং সামাজিক অনুশাসনের চর্চাও এক্ষেত্রে জরুরি। 
শিক্ষার আমূল সংস্কার করে মুক্তচিন্তা, যুক্তিতর্ক এবং মানবীয় গুণাবলী, মানবতা বা গণতন্ত্র, সাম্য ও সমতার দর্শন শিক্ষা দেয়া হলে তা নতুন প্রজন্মকে সঠিক পথনির্দশনা দিতে পারে। দরকার, ঘৃণা ও পরনিন্দার স্থলে মানবপ্রেম ও পরমত সহিষ্ণুতার শিক্ষা প্রদান।

 

আলোকিত আদর্শের পাশাপাশি আলোকিত ব্যক্তিবর্গের জীবন থেকে শিক্ষা নেয়া। দরকার ধর্মীয় ও সামাজিক মুল্যবোধের উদার এবং গভীর স্বরূপ আলোচনা এবং শিক্ষা দান। পাড়া-মহল্লায় গণপাঠাগার স্থাপন এবং সনদের জন্য নয় - শিক্ষাকে তথা জ্ঞানার্জনকে জীবনের অনুষঙ্গ করে তোলা খুবই জরুরি। 

 

পারিবারিক পরিমন্ডলহীন বিচ্ছিন্নতা ও একাকীত্ব, স্বার্থপরতা, নির্দয়তা, দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচার, সব স্তরে নেতৃত্বের প্রতি আস্থাহীনতা, বয়োজেষ্ঠদের কথা ও কাজের বৈপরীত্য, স্বপ্নহীনতা ও হতাশা, মাদক ও মাফিয়ার ছোবল, মত প্রকাশে বাধাদান ইত্যাদি জঙ্গি-সন্ত্রাস বিকাশে বিশেষ সহায়ক হয়ে থাকে। সমাজে এসবের অবসান জরুরি। 
আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনও আমাদের সমাজকে ব্যাপকভাবে কলুষিত করছে। 

 

জঙ্গি-সন্ত্রাস কবলিত সমাজে ব্যাপক ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য সুযোগের প্রেক্ষাপটে সংক্ষেপে গণমাধ্যমের অনেক করণীয় রয়েছে।  সত্যের সঠিক উপলব্ধি ও সঠিক উপস্থাপন, প্রয়োজনে অধিকতর তথ্যানুসন্ধান, অন্যের বরাতে সম্ভাব্য ভুল-ভুয়া প্রচার হতে বিরত থাকা, মিথ্যা-গুজব প্রচার সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ায়। যা সন্ত্রাস সহায়ক। 
জ্ঞানভিত্তিক ও সহনশীল সমাজ নির্মানের জন্য শিক্ষা, দর্শন, মুক্তচিন্তা, যুক্তিতর্ক, মানবীয় মহৎ গুণাবলী, গণতন্ত্র, সাম্য ও সমতার কথা সর্বত্র তুলে ধরা জরুরি। 

 

এক্ষেত্রে সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব বজায় রাখাও খুব জরুরি। জ্ঞানার্জন, পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে একজন গণমাধ্যমকর্মীর উচিত রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে সঠিকভাবে কাজ করা। অসত্য তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে দায়িত্বও গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

 

সন্ত্রাসবাদের উৎস অনুসন্ধান করে এক দিকে যেমন অনুসন্ধানী রিপোর্ট করতে হবে, অন্যদিকে সন্ত্রাসবাদের মহাবিপদের মাত্রা তুলে ধরতে হবে। যাতে পাঠক-দর্শক তথা দেশ ও জাতি সচেতন, সজাগ হতে পারে।  সংবাদপত্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পরিবর্তে ধর্মীয় মৌলবাদী সাম্প্রদায়িকতার চর্চা না হয়, সে ব্যাপারেও খেয়াল রাখতে হবে।  মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান প্রতিরোধে সমন্বিত কাজ করতে হবে।

 

মনে রাখতে হবে, মৌলবাদী-জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের কোন ভৌগলিক সীমারেখা নেই।   আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার প্রয়োগে সিদ্ধহস্ত তারা। এরা শান্তির ধর্ম ইলামের নামে বর্বর হত্যাকাণ্ড করে বিশ্বব্যাপী ইসলাম তথা মুসলমানদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে উন্নয়ন ও সভ্যতাকে ধ্বংস করে অন্ধকারের পথ নির্দেশ করছে। এই অবস্থায় সব প্রগতিশীল গণতন্ত্রকামী দেশেপ্রেমিক জনগণ এবং মিডিয়াকে দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ থেকে সমগ্র দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে পরিচালনার নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও শক্তিসমূহের পাশাপাশি সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমেই পারে সব ধরনের প্রতিকূলতা প্রতিরোধ করে জাতিকে এগিয়ে নিতে । 

 

মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখতে দরকার মনের সুকুমারবৃত্তির পরিচর্যা । হিংসা দিয়ে যে জীবন তৈরি হয়, তাতে আর যা-ই হোক কাঙ্ক্ষিত মানবসভ্যতাকে লালন করা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন যে কোনো সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সচেতন প্রয়াস। প্রয়োজন, এর ভয়ংকর পরিণাম সম্পর্কে সর্বস্তরের সামাজিক জাগরণ। প্রয়োজন শক্তিশালী গণমাধ্যমের যথার্থ ও সময়োপযোগী ব্যবহার।

 

লেখক: আনোয়ার হক

সাংবাদিক ও জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ