ঢাকা, ১৩ জুলাই সোমবার, ২০২৬ || ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
good-food
১৭

দেশের ১৪ জেলায় বন্যার আশঙ্কা

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৪:০০ ১৩ জুলাই ২০২৬  

আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মার মতো দেশের প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও তা বিপৎসীমার নিচ দিয়েই প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) সাপ্তাহিক পূর্বাভাসে বলা হয়, দেশের অন্তত ১৪ জেলায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব অথবা বর্তমান পরিস্থিতির কিছুটা অবনতি হতে পারে। বিশেষ করে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

রবিবার (১২ জুলাই) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীন বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে এ বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। মূলত আগামী ১৯ জুলাই পর্যন্ত দেশের প্রধান নদী অববাহিকার সম্ভাব্য পরিস্থিতি এবং বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিশ্লেষণ করে এ আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত এবং প্রয়োজনীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রস্তুতি গ্রহণে সহায়তা করা।

প্রতিবেদনের বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলে সামগ্রিকভাবে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। সপ্তাহের প্রথমভাগে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার বাংলাদেশ সংলগ্ন উজানে স্থানভেদে সর্বোচ্চ ২৫০ থেকে ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে। 

ফলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা, কংস, সারিগোয়াইন ও যাদুকাটা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কিছু স্থানে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদী বন্যা দেখা দিতে পারে। পরবর্তী ৭২ ঘণ্টা পর যা হ্রাস পেতে শুরু করবে।

আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও নদীর পানি সমতল

গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তিস্তা নদীর পানি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। 

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় চট্টগ্রাম বিভাগের ফেনী জেলার মুহুরী ও সেলোনিয়া নদী এবং খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রামের হালদা ও ফেনী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে। 

তবে আশার কথা হলো, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদী এবং মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জের মনু ও খোয়াই নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আগামী ২৪ ঘণ্টায় উন্নতি হতে পারে।

নীতিগত চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক প্রভাব

এ পূর্বাভাসে বড় নদীগুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তির খবর রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদ-নদীর পানি আগামী ৯ থেকে ১০ দিন সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও তা বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে। তবে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদী বন্যাও স্থানীয় কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। 

বিশেষ করে আমন চাষের এ মৌসুমে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলে কৃষকের বীজতলা বা ফসলের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে স্থানীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়বে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ও নীতি কাঠামো পর্যবেক্ষণ করছেন এমন বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে এই প্রতিবেদনের কিছু সীমাবদ্ধতা নজরে পড়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র পানি সমতলের বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস দিলেও এ সম্ভাব্য বন্যার কারণে স্থানীয় অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা সাধারণ নাগরিকদের সুরক্ষায় কী ধরনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। 

পূর্বাভাস প্রদান ও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের মধ্যে যে নীতিগত দূরত্ব থাকে, তা দূর করার কোনো স্পষ্ট কৌশল প্রতিবেদনে অনুপস্থিত। কোন কোন বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, সেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতে উহ্য রয়েছে। নীতিনির্ধারকদের এখন নিশ্চিত করতে হবে, এ বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস যেন কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত মাঠপর্যায়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় রূপান্তর করা যায়।

এ বিশেষ পূর্বাভাস স্বল্পমেয়াদী দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সতর্কবার্তা। আগামী দিনগুলোতে উজানের বৃষ্টিপাতের প্রকৃত পরিমাণ এবং স্থানীয় নদীগুলোর পানি বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসন ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কতটা কার্যকর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর সুরক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারছে কিনা, তা-ই এখন দেখার বিষয়।