ঢাকা, ১৮ জুন শুক্রবার, ২০২১ || ৪ আষাঢ় ১৪২৮
good-food
৭০

বাজেট শিল্পবান্ধব, কিন্তু স্বাস্থ্যবান্ধব নয়

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১০:২৯ ৫ জুন ২০২১  

সরকার ঘোষিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট এক কথায় শিল্পবান্ধব। কোভিড উদ্ভূত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার মূল হাতিয়ার হিসেবে নেওয়া হয়েছে শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে। রপ্তানিনির্ভর এবং দেশীয় বাজারনির্ভর উভয় প্রকার শিল্পের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো কাঁচামালের ওপর শুল্ক কমানো, শিল্পে উৎপাদিত শিল্পপণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক কিংবা সারচার্জ কমানো, ভ্যাট কমানো- এসব উদ্যোগে শিল্পের বিকাশকে উৎসাহিত করবে। বাজেট প্রদত্ত এই সুবিধাগুলো নানান শিল্পের জন্য দেওয়া হয়েছে।

 

ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদনকারী শিল্প, ওষুধ শিল্প, কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, খেলনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগি মাছের খাবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, স্যানিটারি ন্যাপকিন অর্ডার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ নানান শিল্পের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার কথা বলা হয়েছে এই বাজেটে। এগুলো কাজে লাগিয়ে শিল্পগুলোর বিকাশ ঘটা সম্ভব। এর মধ্যে অনেকগুলো শিল্প সরকারের শিল্প ও রপ্তানি পলিসির প্রাধিকারভুক্ত শিল্প তালিকার অন্তর্ভুক্ত। এদের কলেবর বাড়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

 

আর কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চ্যালেঞ্জ এই সময় সরকার সম্মুখীন হচ্ছে তা মোকাবিলায় বড় হাতিয়ার হবে নানামুখী শিল্পের বিকাশ। এতে প্রচুর শিক্ষিত বেকারের চাকরির সম্ভাবনা থাকবে। তবে একটু লক্ষণীয় যে, এই সুযোগ-সুবিধাগুলো নিতে পারবে মূলত মাঝারি থেকে বড় শিল্পগুলো। অতিক্ষুদ্র কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ কোনো কিছু এই বাজেটে নেই। তারা হয়তো পরোক্ষভাবে কাঁচামালের ওপর শুল্কের সুবিধা পাবেন, তবে তাদের অনেকেরই পুঁজির সহায়তা দরকার হবে। তাই এই বাজেটে মূলত শিল্পের বহুমুখীকরণের প্রচেষ্টা থাকলেও তাতে অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

 

হয়তো কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং সামগ্রী প্রস্তুতকারী অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান কিছুটা উপকার পাবেন। অন্যান্য খাতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসতে তাদের জন্য পুঁজি প্রাপ্তি সহজলভ্য হতে হবে। এই বাজেটে বিভিন্ন রকম শিল্পের জন্য যেসব সুবিধা দেওয়া হয়েছে তাতে শিল্প ও রপ্তানির বহুমুখীকরণের সুবিধা হবে।

 

বর্তমান বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত টার্নওভারের ওপরে তাদের কর দিতে হবে না। এই সুবিধা নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায় উৎসাহিত করবে। তা ছাড়া ডে-কেয়ার সেন্টার যারা গড়ে তুলতে চান, এমন নারী উদ্যোক্তারা কিছু সুবিধা পাবেন, যা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে নারীর অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায়। সরকার নিজেও আরও বেশিসংখ্যক ডে-কেয়ার সেন্টার গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে যা শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণকে সুবিধাজনক করবে।

 

এ ছাড়া রান্নাঘরের নানা সামগ্রীর উৎপাদনে সরকারের কর সহায়তার ফলে এসব পণ্যের দাম কমবে। এতে করে হোমমেকার হিসেবে যারা আছেন, যার অধিকাংশই নারী, তারা উপকৃত হবেন। তবে মোবাইল আর্থিক সেবার খরচ যদি বাড়ে, তা হলে অনলাইন প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে যেসব নারী ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, তাদের ব্যবসার অর্থ আদান-প্রদানের খরচ বাড়বে। তা ছাড়া তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকসহ বিভিন্ন খাতে যে শ্রমিকরা মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের বেতন পেয়ে থাকেন এবং সে বেতন গ্রামে থাকা তাদের পরিবারে এই মাধ্যমে প্রেরণ করেন, তাদেরও খরচ বাড়বে। কাজেই এই খাতের করপোরেট কর বৃদ্ধি এখন না করাই উচিত।

 

স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ গত বছরের মতোই আছে এবং লক্ষ্যগুলো একইরকম। এর মূল কারণ হলো চলমান গত বছর বাজেট ঘোষণার সময় স্বাস্থ্য খাতের জন্য যে কার্যক্রমের টার্গেট করা হয়েছিল, তার অনেকগুলোই বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে আইসিইউসহ অন্যান্য আধুনিক স্বাস্থ্য সুবিধা দেওয়া, সেই সংক্রান্ত লোকজনের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয় এখনো অর্জিত হয়নি। তাই নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য যে বরাদ্দ তাতে সেই পুরনো অঙ্গীকারগুলো আবার এসেছে। আর আমরা যদি গত বছরের বাস্তবায়নের হার দেখি তবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি নিয়ে খুব উৎসাহিত হওয়ার কিছু নেই, যদি না তা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয় এবারও।

 

স্বাস্থ্য খাতে টিকাদান কর্মসূচির বাস্তবায়ন যত দ্রুত হবে তত আমরা অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পথে এগোতে পারব। তবে স্বাস্থ্য সচেতনতা, বিশেষ করে করোনার ঝুঁকি কমানোর স্বাস্থ্য গাইডলাইন মেনে চলার সামাজিক সচেতনতা সারা বছর ধরে চালু রাখতে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল। এ ছাড়া দরিদ্র মানুষের কাছে মাস্ক, হাত ধোয়ার সামগ্রী ইত্যাদি বিনামূল্যে বিতরণের জন্য কর্মসূচি দরকার ছিল।

 

প্রস্তাবিত বাজেটে নারীর স্বাস্থ্য কথা বিবেচনা করে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে করি। সে ক্ষেত্রে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ফলে স্যানিটারি ন্যাপকিনের মূল্য কমবে। তবে এই খাতে ভর্তুকি দিতে হবে, যাতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের মূল্য প্রান্তিক নারীদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসে।