ঢাকা, ২৮ অক্টোবর বুধবার, ২০২৬ || ১২ কার্তিক ১৪৩৩
good-food
১২

মোগলাই পরোটা কার: মোগল না ব্রিটিশদের?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ০১:০৫ ২৮ অক্টোবর ২০২৬  

ডুবো তেলে ভাজা মচমচে পাতলা খোলস। ভেতরে ডিম, মুরগি বা খাসির মাংসের সুস্বাদু পুর। ময়দার খামির দিয়ে খামের মতো ভাঁজ করা এই শৈল্পিক খাবার দেখলে যে কারও জিভে জল চলে আসে। ভোজনরসিকদের কাছে এটি মোগলাই পরোটা নামে পরিচিত। 

চারকোণা করে কেটে শসা ও পেঁয়াজের সালাদসহ পরিবেশন করার রীতি অনেক পুরোনো। নামের মধ্যেই ইঙ্গিত রয়েছে, এই মুখরোচক খাবারের উৎস মোগল রসুইঘর। তবে এর পেছনে রয়েছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে (১৫৬৯-১৬২৭) তার বাবুর্চি আদিল হাফিজ উসমান এই খাবারটি প্রথম তৈরি করেছিলেন। শাহেনশাহ প্রতিদিন একই ধরনের পরোটা খেয়ে বিরক্ত হয়ে উসমানকে মাত্র ১০ দিনের মধ্যে নতুন কোনো পরোটা উদ্ভাবনের নির্দেশ দেন। সম্রাটের আদেশে দিশেহারা হলেও চেষ্টা থামাননি উসমান। নবম দিনেই ‘জাবির ফালা’ বা ডিম পরোটা নিয়ে সম্রাটের সামনে হাজির হন তিনি। সেই খাবার খেয়ে সম্রাট এতটাই মুগ্ধ হন যে উসমানকে ১০০১টি স্বর্ণমুদ্রা ও বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে একটি জায়গির উপহার দেন। একবার ভাবুন, একটিমাত্র পরোটার আবিষ্কারের জন্য ১৬ শতকে ১০০১ স্বর্ণমুদ্রা পুরস্কার!

উসমানের আদি ভিটা ছিল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে। দিল্লি বা লক্ষ্ণৌর মোগল রাঁধুনিদের কাছেও তিনি এই রন্ধনপ্রণালি গোপন রেখেছিলেন। এমনকি নিজের ছেলে যেন অন্য বাবুর্চিদের কাছে এ তথ্য প্রকাশ না করে, সেই কড়াকড়ি নির্দেশও ছিল। এভাবে যুগের পর যুগ উসমানের পরিবারের কাছেই লুকিয়ে ছিল জাবির ফালার আসল রহস্য। 

পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে তার বংশধরেরা পুরো বাংলাজুড়ে এই সুস্বাদু পরোটা বিক্রি শুরু করেন।

তবে মোগলাই পরোটার মূল শিকড় আরও সুদূরপ্রসারী। ১২০১ সালে সেনাপতি বখতিয়ার খিলজির অভিযানের পর ১২০৪ থেকে ১২২৭ সাল পর্যন্ত বাংলা শাসন করে খিলজি রাজবংশ। তুর্কিরা ভারতে নিয়ে এসেছিল ‘গোজলেমে’ নামের এক বিশেষ খাবার, যা ময়দার খামিরে মশলা ও মাংসের কিমা দিয়ে তৈরি করা হতো। অনেকটা মোগলাই পরোটার মতো দেখতে এই খাবারকে এর আদি রূপ বলা চলে। আবার মহারাষ্ট্রের ‘বায়দা রোটি’, বার্মার ‘পালাতাস’ বা আরব বণিকদের মাধ্যমে আসা মধ্যপ্রাচ্যের নানা রুটিজাতীয় খাবারের সঙ্গেও এর স্পষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে।

মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাবে ব্রিটিশ শাসনের বহু আগেই পূর্ববঙ্গের অভিজাতদের খাবারের তালিকায় কিমার ব্যবহার চালু হয়েছিল। সে কারণে অনেকের ধারণা, বর্তমানের এই মোগলাই পরোটা ঢাকা থেকেই কলকাতায় ছড়িয়ে পড়েছিল।

কলকাতায় পূর্ববঙ্গের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশনের জন্য ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘অনাদি কেবিন’ আজও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। বলরাম জেনার প্রতিষ্ঠিত এই রেস্তোরাঁর গরম-গরম মোগলাই পরোটা ও ঝুরি করা আলুর তরকারির স্বাদ নিতে এখনও ভিড় জমায় খাদ্যরসিকেরা।

ইতিহাসবিদ ড. পুস্পেশ পন্তের মতে, ব্রিটিশরাই মূলত ‘মোগলাই খাবার’ নামটি জনপ্রিয় করে তুলেছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের গুণী বাবুর্চিরা বিভিন্ন ছোট রাজ্যে আশ্রয় নেন ও স্থানীয় রন্ধনশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করেন।

একবিংশ শতাব্দীতে অজস্র পশ্চিমা ফাস্টফুডের ভিড়েও ঢাকা ও কলকাতার মানুষের পছন্দের তালিকায় নিজের আলাদা জায়গা বজায় রেখেছে মোগলাই পরোটা। রাজপ্রাসাদের রাজকীয় সৃষ্টি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের নাস্তার টেবিল—মোগলাই পরোটার এই দীর্ঘ যাত্রাপথ বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য অংশ হয়ে রয়ে গেছে।