ঢাকা, ০৩ আগস্ট মঙ্গলবার, ২০২১ || ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮
good-food
৭৯

ম্যাঁক্রো, ইমরান খান, রাহুল গান্ধীসহ পেগাসাস তালিকায় কে কে আছেন?

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:০১ ২১ জুলাই ২০২১  

ইসরায়েলি স্পাইওয়্যার `পেগাসাস ম্যালওয়্যার’ ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবী ও রাজনীতিবিদদের স্মার্টফোনে নজরদারি চালানোর ঘটনা ফাঁস হবার পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে। হ্যাকিং সফটওয়্যার পেগাসাস ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশের কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো এই নজরদারি চালাচ্ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা-গুঞ্জন। 

 

ফাঁস হওয়া পেগাসাস ম্যালওয়্যারের তালিকায় রয়েছেন বিশ্বের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি। এ তালিকায় রয়েছেন : ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ও পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানসহ বিভিন্ন দেশের ১৩ সরকারপ্রধান। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন, ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

 

এছাড়াও এখন পর্যন্ত ৩৪টি দেশের কূটনীতিক, সামরিকপ্রধান ও জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদেরাও রয়েছেন এ তালিকায়।


ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান বলছে, ইসরায়েলি এনএসও গ্রুপের পেগাসাস ম্যালওয়্যারের নিশানায় থাকার অর্থ এই নয় যে, এসব নম্বর সফলভাবে হ্যাক করা হয়েছে। 

 

এনএসও বলছে, ফাঁস হওয়া তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে এই কোম্পানির কোনো সম্পর্ক নেই কিংবা কোনো গ্রাহক ম্যাঁক্রোকে হ্যাকিংয়ের টার্গেট করেনি।

 

সফটওয়্যার কোম্পানিটির এই অস্বীকার করার অর্থ হচ্ছে, পেগাসাস ব্যবহার করে কাদের ওপর নজরদারি করা হবে, তা এনএসও ঠিক করে দেয়। 

 

ফাঁস হওয়া তালিকায় বিশ্বজুড়ে যেসব রাজনীতিবিদের নম্বর আছে –

 

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। ২০১৯ সালে রুয়ান্ডায় তাকে হ্যাংকিংয়ের তালিকায় রাখা হয়েছিল।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানম গেবররিয়াসুস। ২০১৯ সালে মরোক্কো থেকে তার প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করা হয়েছিল।

 

সাদ হারিরি। গত সপ্তাহে তিনি লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল।

 

ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি চার্লস মিশেল। ২০১৯ সালে মরক্কো থেকে তাকে নিশানা করা হয়। তখন তিনি বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

 

মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ। ২০১৯ সালে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল। নিজের দেশের নিরাপত্তা বাহিনীই তার ওপর নজরদারি করতে চেয়েছিল।

 

মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী সাদ উদ্দিন উসমানি। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে তার ওপর নজরদারি করতে চাওয়া হয়েছিল। আর সেটা করা হয়েছিল তার নিজ দেশ থেকেই।

 

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ২০১৯ সালে প্রতিবেশী ভারত থেকে তিনি টার্গেট হয়েছিলেন।

 

মেক্সিকোর সাবেক প্রেসিডেন্ট ফেলিপ কাল্ডডারোন। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তার ওপর নজরদারি করতে চাওয়া হয়েছিল। তার স্ত্রী মার্গারিটা জাভালা যখন দেশটি সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পদটির জন্য লড়ছিলেন, তখন তাকে নিশানা করা হয়।

 

দীর্ঘ সময়ের মার্কিন কূটনীতিক রবার্ট ম্যালিই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রি ও ইরান চুক্তির প্রধান আলোচক ছিলেন। ২০১৯ সালে মরোক্কো থেকে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল।

 

এনএসও বলছে, তাদের গ্রাহকেরা মার্কিন নম্বরে নজরদারি করতে পারবে না। কারণ কারিগরিভাবে তা অসম্ভব।

 

এদিকে এই হ্যাকিংয়ের লক্ষ্যবস্তু তালিকায় পাশের রাষ্ট্র ভারতের অন্তত ৩০০ রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, বিজ্ঞানীর নাম থাকার কথা জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম দি ওয়্যার। 

 

খবরে বলা হয়েছে, ওই তালিকায় ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কিশোরও রয়েছেন। তবে ভারত সরকার এই আড়ি পাতায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 

 

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দি গার্ডিয়ানসহ ১৬টি সংবাদপত্র এই হ্যাকিংয়ের ঘটনা ফাঁস করেছে।

 

ফাঁস হওয়া একটি ডাটাবেসে এই ফোন নম্বরগুলো প্রথমে পায় প্যারিসভিত্তিক সংস্থা ফরবিডেন স্টোরিজ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। পরে তারা দি গার্ডিয়ান, ওয়্যারসহ ১৬টি সংবাদমাধ্যমকে তা জানায়। তারা সবাই মিলে এই অনুসন্ধানের নাম দিয়েছে 'পেগাসাস প্রজেক্ট'।

 

ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এসএসও গ্রুপ পেগাসাস নামে এই ম্যালওয়্যার তৈরি করেছে, যা আইফোন কিংবা অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ঢুকে ব্যবহারকারীর মেসেজ, ছবি, ই-মেইল পাচার করতে যেমন সক্ষম, তেমনি কল রেকর্ড এবং গোপনে মাইক্রোফোন চালুও রাখতে পারে।

 

এনএসও দাবি করেছে, অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি চালাতে তাদের এই স্পাইওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। তবে তা গোপনে ব্যবহার করতে বিভিন্ন দেশের সরকার এনএসওর গ্রাহক হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাইবার সিকিউরিটি ল্যাব পরিচালনাকারী ক্লডিও গুয়ারনিয়েরি গার্ডিয়ানকে বলেন, 'যদি কোনো ফোনে (স্মার্টফোন) পেগাসাস সফটওয়্যারটি ঢোকানো যায়, তবে এনএসওর গ্রাহক পুরো ফোনটির দখলই পেয়ে যাবে। ফোনের মালিকের মেসেজ, কল, ছবি, ই-মেইল সবই দেখতে পাবে, এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যালের বার্তাগুলোও পড়তে পারবে। গোপনে ক্যামেরা কিংবা মাইক্রোফোন চালুও করতে পারবে।'

 

গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া ডাটাবেসে ৫০ হাজারের বেশি ফোন নম্বর পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০১৬ সাল থেকে এনএসওর গ্রাহক এদের বিষয়ে তৎপর ছিল।

 

ওই তালিকায় এ ফোন নম্বরগুলো থাকার মানে এটা নিশ্চিত নয় যে, ওই স্মার্টফোনটি পেগাসাস দিয়ে হ্যাক করা হয়েছে। তবে 'পেগাসাস প্রজেক্ট' এটা দৃঢ়ভাবে মনে করে যে, এনএসওর গ্রাহক সরকারগুলোর লক্ষ্যবস্তু ছিল ওই নম্বরগুলো। এই নম্বরগুলোর কিছু ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষায় অর্ধেকের বেশিগুলোতে পেগাসাস ম্যালওয়্যারের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে গার্ডিয়ান জানিয়েছে।

 

বিশ্বজুড়ে নজরদারির মুখে থাকা এই ব্যক্তিদের মধ্যে আর কারা কারা রয়েছেন, তাদের নাম অচিরেই প্রকাশ করবে 'পেগাসাস প্রজেক্ট'। এই ব্যক্তিদের মধ্যে সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনীতিক ছাড়াও ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, এমনকি মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর ফোন নম্বরও রয়েছেন। 

 

দি ওয়্যার বলছে, ভারতের ৩০০টি নম্বরের মধ্যে ৪০ জন সাংবাদিক, বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় তিন নেতা, এক বিচারপতি, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সংস্থার সাবেক ও বর্তমান ব্যক্তিদের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের দুই মন্ত্রীর নম্বরও রয়েছে। 

 

তথ্য বিশ্নেষণ করে ওয়্যার জানিয়েছে, এ নম্বরগুলো ২০১৮ ও ২০১৯ সালে আড়ি পাতার লক্ষ্যবস্তু ছিল। ২০১৯ সালেই ভারতে লোকসভা নির্বাচন হয়েছিল।

 

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে নজরদারিতে অন্তত দুইবার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে এসব ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া ওই নেতার দুই স্টাফ শচীন রাও ও অলঙ্কার স্বাবির ওপর নজরদারি করা হয়। ফরেনসিক বিশ্নেষণে দেখা গেছে, চলতি বছর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোট কুশলী প্রশান্ত কিশোরের ফোনেও আড়ি পাতা হয়েছে।

 

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রহদ্মাদ সিং প্যাটেল ও সম্প্রতি শপথ নেওয়া আরেক মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও ওই তালিকায় রয়েছেন। ইসরায়েলি পেগাসাস স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে ভারতে ফোনে আড়ি পাতার প্রথম অভিযোগ উঠেছিল দুই বছর আগে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিষেণ রেড্ডি বলেছিলেন, দেশের স্বার্থে ফোনে আড়ি পাতা হয়। সেই আইনি বৈধতা সরকারের রয়েছে। ২০০০ সালের তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৯ ধারায় সেই অধিকার কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

 

তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন - দি ওয়্যারের দুই সম্পাদক ও তিন সাংবাদিক, যাদের ফোনে আড়ি পাতার চেষ্টা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন রোহিনী সিং, যিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর ছেলে জয় শাহর বিপুল সম্পত্তি বৃদ্ধি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছিলেন। এ ছাড়া হিন্দুস্থান টাইমস, ইন্ডিয়া টুডে, দি হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দি ওয়্যারের অন্তত ৪০ সাংবাদিককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। আর যারা এই গোপন খবর ফাঁস করেছে, তাদের অন্যতম 'দি ওয়্যার'র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদারাজান ও এম কে ভেন্যুও ছিলেন গোপন এই নজরদারিতে। আরও রয়েছে নির্বাচন কমিশন, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কাশ্মীর নিয়ে খবর করা সাংবাদিকদের কেউ কেউ যারা প্রথম শ্রেণির দৈনিকের সঙ্গে যুক্ত।

 

দি ওয়্যার বলেছে, আড়ি পাতার অভিযোগ অস্বীকার করলেও ইসরায়েলি পেগাসাস সফটওয়্যার কেনার বিষয়টি সরাসরি নাকচ করেনি দিল্লি।