ঢাকা, ১৪ আগস্ট শুক্রবার, ২০২৬ || ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩
good-food

যেভাবে রিয়াজকে খুঁজে পেয়েছিলেন জসিম

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৭:৩৩ ১৪ আগস্ট ২০২৬  

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অ্যাকশনধর্মী সিনেমার জনপ্রিয় মুখ চিত্রনায়ক জসিম। খলনায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে অভিষেক হলেও পরবর্তী সময়ে নায়ক হিসেবেও তুমুল জনপ্রিয়তা পান তিনি। শুধু অভিনয় নয়, নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও তার ছিল আলাদা নজর। তার হাত ধরেই ঢাকাই সিনেমায় এসেছিলেন একসময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক রিয়াজ।

আজ (১৪ আগস্ট) নায়ক জসিমের জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার নবাবগঞ্জের বক্সনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার প্রকৃত নাম আবদুল খায়ের জসিম উদ্দিন। মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন এই অভিনেতা। ১৯৭১ সালে একজন সৈনিক হিসেবে ২ নম্বর সেক্টরে মেজর হায়দারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন তিনি।

চলচ্চিত্রে জসিমের পথচলা শুরু হয় সত্তরের দশকের শুরুতে। ১৯৭২ সালে ‘দেবর’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয় শুরু করেন তিনি। পরের বছর ‘রংবাজ’ সিনেমায় অ্যাকশন পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। এরপর দেওয়ান নজরুল পরিচালিত ‘দোস্ত দুশমন’ সিনেমায় খলনায়ক চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান।

‘দোস্ত দুশমন’ ছিল ভারতের জনপ্রিয় সিনেমা ‘শোলে’র আদলে নির্মিত। এতে জসিম অভিনয় করেছিলেন গাফফার চরিত্রে। তার অভিনয় এতটাই প্রশংসিত হয়েছিল যে ‘শোলে’র গব্বর সিং চরিত্রে অভিনয় করা আমজাদ খানও জসিমের অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে খলনায়ক হিসেবেই থেমে থাকেননি জসিম। ‘সবুজ সাথী’ সিনেমায় প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এরপর একের পর এক অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় অভিনয় করে হয়ে ওঠেন দর্শকের প্রিয় নায়ক। আশির দশকে শাবানা ও রোজিনার সঙ্গে তার জুটি বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সিনেমায় তার চরিত্র দর্শকের মনে গভীর দাগ কাটে।

প্রায় দুই দশকের চলচ্চিত্রজীবনে দুই শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করেছেন জসিম। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘রংবাজ’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘সবুজ সাথী’, ‘লাইলী মজনু’, ‘জনি’, ‘সারেন্ডার’, ‘লালু মাস্তান’, ‘মাস্তান রাজা’, ‘কালিয়া’, ‘স্বামী কেন আসামি’সহ আরও অনেক সিনেমা।

তবে অভিনয়ের বাইরে জসিমের আরেকটি বড় পরিচয়-তিনি ছিলেন নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করতে পারা একজন শিল্পী। তার সবচেয়ে আলোচিত আবিষ্কার নিঃসন্দেহে চিত্রনায়ক রিয়াজ।

রিয়াজ তখনো চলচ্চিত্রের মানুষ নন। বিমানবাহিনীতে বিমানচালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর চাকরি হারিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তার চাচাতো বোন ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা। একদিন ববিতার সঙ্গে বিএফডিসিতে গিয়েছিলেন রিয়াজ। আর সেখানেই তার দিকে চোখ পড়ে জসিমের।

১৯৯৪ সালের সেই ঘটনা বদলে দেয় রিয়াজের জীবন। সুদর্শন তরুণ রিয়াজকে দেখে জসিমের মনে হয়, তাকে চলচ্চিত্রে নেওয়া যেতে পারে। তিনি রিয়াজকে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। তখন অভিনয় সম্পর্কে রিয়াজের তেমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না। জসিমের প্রস্তাবের পাশাপাশি ববিতার উৎসাহও তাকে চলচ্চিত্রে আসার সাহস জোগায়।

পরের বছরই জসিমের সঙ্গে ‘বাংলার নায়ক’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান রিয়াজ। ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে জসিম অভিনয় করেছিলেন ডন চরিত্রে, শাবানা ছিলেন রোকেয়া আর রিয়াজ অভিনয় করেন মুন্না চরিত্রে। সিনেমাটিই হয়ে ওঠে রিয়াজের চলচ্চিত্রে অভিষেক।

তবে শুধু অভিনয়ের সুযোগ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি জসিম। নবাগত রিয়াজকে অভিনয় ও অ্যাকশনের নানা কৌশলও শেখাতেন তিনি। পরে জসিমকে স্মরণ করে রিয়াজ বলেছিলেন, এফডিসিতে জসিমের শুটিং চলার সময় তিনি ফাইট প্র্যাকটিস করতেন। এমনও হয়েছে, নিজের শুটিং রেখেও জসিম তাকে ফাইট শিখিয়েছেন।

রিয়াজের ভাষায়, জসিমের কারণেই তিনি নায়ক রিয়াজ হয়ে উঠতে পেরেছেন। অর্থাৎ জসিমের জীবনে রিয়াজকে আবিষ্কারের ঘটনাটি ছিল শুধু একজন নবাগতকে সুযোগ দেওয়ার বিষয় নয়; পরবর্তী সময়ে সেটি হয়ে ওঠে ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।

‘বাংলার নায়ক’র পর অবশ্য রিয়াজকে নিজের জায়গা তৈরি করতে খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। পরবর্তী সময়ে ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’সহ একের পর এক সফল সিনেমায় অভিনয় করে নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু তার সেই দীর্ঘ চলচ্চিত্রযাত্রার প্রথম দরজাটি খুলে দিয়েছিলেন জসিমই।

ব্যক্তিজীবনেও জসিম ছিলেন আলোচিত। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন অভিনেত্রী সুচরিতা। পরে নাসরিনকে বিয়ে করেন তিনি। তাদের তিন ছেলে রাতুল, রাহুল ও সামি। তিনজনই সংগীতের সঙ্গে যুক্ত।

চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও জসিমের পরিচয় রয়েছে। পর্দায় তিনি যেমন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানুষের চরিত্রে অভিনয় করেছেন, বাস্তব জীবনেও দেশের স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন।

১৯৯৮ সালের ৮ অক্টোবর মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে মারা যান এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তার মৃত্যুর পরও চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার স্মৃতি ধরে রাখা হয়েছে। এফডিসির একটি ফ্লোর তার নামে ‘জসিম ফ্লোর’ হিসেবে পরিচিত।

আজ জন্মদিনে তাই শুধু একজন জনপ্রিয় নায়ক হিসেবে নয়, একজন মুক্তিযোদ্ধা, অ্যাকশন তারকা এবং নতুন প্রতিভার আবিষ্কারক হিসেবেও স্মরণ করা হচ্ছে জসিমকে। তার জীবনের অসংখ্য সাফল্যের গল্পের মধ্যে রিয়াজকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি যেন একটু আলাদা। কারণ একজন কিংবদন্তির চোখে সেদিন ধরা পড়েছিল আরেক ভবিষ্যৎ তারকা-আর সেই দেখাই বদলে দিয়েছিল রিয়াজের জীবন।

জসিম নেই, কিন্তু তার আবিষ্কার রিয়াজ আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে পরিচিত নাম। আর তাই জসিমের জন্মদিনে তার অভিনয়জীবনের পাশাপাশি ফিরে ফিরে আসে সেই গল্প- যেভাবে রিয়াজকে খুঁজে পেয়েছিলেন নায়ক জসিম।

বিনোদন বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর