ঢাকা, ১৪ জুলাই রোববার, ২০২৪ || ৩০ আষাঢ় ১৪৩১
good-food
৫৬১

সংকটে সাংবাদিকতা: সংবাদকর্মীদের বানানো হচ্ছে বিজ্ঞাপনকর্মী!

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ২০:৩১ ৯ আগস্ট ২০২৩  

বাংলাদেশে বেশিরভাগ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান মফস্বল সাংবাদিকদের (জেলা প্রতিনিধিদের) বিজ্ঞাপন প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে চাপ প্রয়োগ করছে।  এমনকি শর্ত দিয়ে, বিজ্ঞাপনের টার্গেট দিয়ে নিয়োগ দিচ্ছে৷  নিয়োগ দিচ্ছে এই শর্তে যে সাংবাদিক হিসেবে বা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হলে প্রতি মাসে বিজ্ঞাপন দিতে হবে। এই অভিযোগ বেশ কিছুদিন ধরেই শুনে আসছি মফস্বল সাংবাদিকদের নিকট।

 

আজ ঢাকা থেকে প্রকাশিত কয়েকটি পত্রিকার চিঠি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পেলাম। এসব চিঠিতে একেবারে মাসিক টার্গেট দেওয়া হয়েছে বিজ্ঞাপন সংগ্রহের। বলা হয়েছে এসব টার্গেট বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে দিলে বিজ্ঞাপন বাবদ প্রাপ্ত টাকার উপর নির্ধারিত কমিশন উক্ত সংবাদিককে দেওয়া হবে। আমাদের দেশে সংবাদ অর্থনীতির প্রচলিত ধারাটা ছিলো পত্রিকা বিক্রির মাধ্যমে আয় ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় থেকে পত্রিকার অর্থ উপার্জন করে পত্রিকা পরিচালন ব্যয়, সংবাদিকদের বেতন মেটানো।

 

এরপর যা থাকতো তা পত্রিকার লভ্যাংশ। এজন্য সার্কুলেশন ও বিজ্ঞাপন বিভাগ রয়েছে পত্রিকা অফিসগুলোর। বিজ্ঞাপন বিভাগগুলিই মূলতঃ বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করে। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের কোন কর্ম ছিলো না সংবাদ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও প্রকাশ ছাড়া। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করলে সাংবাদিক আর সাংবাদিক থাকে না। তারা শুধু বিজ্ঞাপনকর্মীই হন না, এই বিজ্ঞাপন তথ্য ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কখনো কখনো ভয়ংকর সাংবাদিকতারও উদ্ভব হয়। সাংবাদিকতা হয়ে দাঁড়ায় 'সাংঘাতিকতা'।

 

যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বিজ্ঞাপন দিবে সে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান টাকাওয়ালা বা প্রভাবশালী বা ক্ষমতাশালী নিশ্চয়ই। এর মধ্যে আবার অনেক দুর্নীতিবাজ আছেই। বিজ্ঞাপন নিয়ে কি দুর্নীতির সংবাদ করা যায়? যায় না। সাংবাদিকের সঙ্গে বিজ্ঞাপনদাতাদের আপোসরফা হলে সত্য উদঘটন সরাসরি পক্ষাঘাতে জর্জরিত হয়।  বিজ্ঞাপন বিভাগ বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করলেও সত্য প্রকাশে চাপ থাকে।  কিন্তু সাংবাদিকদের মাধ্যমে সরাসরি বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করলে সাংবাদিকতার কিছুই থাকে না৷

 

মফস্বল সাংবাদিকদের বেতন দেয় না হাতেগোনা কিছু গণমাধ্যম ছাড়া। বিজ্ঞাপনের টার্গেট দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। সাংবাদিকতা পেশায় যারা আসেন আর দীর্ঘসময় সাংবাদিকতা করেন তারা জ্ঞানগতভাবে ও দক্ষতার দিক থেকে অন্য অনেক পেশাজীবীদের থেকে অ্যাডভান্স থাকেন। বিশেষ করে লিখনি শক্তি তাদের বড় দক্ষতা। এসব সাংবাদিকদের যখন বিজ্ঞাপনকর্মী বানানো হচ্ছে তখন নিশ্চয় অসহায় বোধ করছেন তারা।

 

এ অবস্থায় সাংবাদিকতা চলতে পারে না। এই ধরনের সাংবাদিকতাকে সাংবাদিকতাও বলা যায় না। আমি কিছুদিন আগে বগুড়া প্রেসক্লাবে মতবিনিময় করছিলাম  কিছু সাংবাদিকদের সঙ্গে। এক টেলিভিশন সাংবাদিক জানালেন যে বিজ্ঞাপনের জন্য চাপতো তার প্রতিষ্ঠান দেয় এরসাথে টিভি লাইভ করতে বলে। আর প্রতি লাইভে উক্ত টিভি চ্যানেল পাঁচ হাজার টাকা নেয় ওই সাংবাদিকের কাছে।

 

মানে সাংবাদিক যাকে নিয়ে লাইভ করবে তার কাছ থেকে টাকা নিবে কিছু আর সেখান থেকে উক্ত টাকা দিবে ঢাকার তার টিভি চ্যানেলকে। এই হচ্ছে এখনকার  "ঢাকা সাংবাদিকতা" বা গোপন সাংবাদিকতা। করোনার আগে থেকেই নিউ মিডিয়ার প্রভাবে মুদ্রণ মাধ্যমসহ সকল গণমাধ্যম আর্থিক সংকটের মধ্যে পড়ে। করোনাকালে বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, এই সংকট আরো ঘনীভুত হয়। করোনাকাল শেষ হলে কিছু গণমাধ্যম ঘুড়ে দাঁড়ায়। কিন্তু গণমাধ্যমের সংখ্যা ক্রমশঃ বৃদ্ধি এবং অনলাইন বিজ্ঞাপন বেড়ে যাওয়ায় সনাতন বিজ্ঞাপন ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যামে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, বঞ্চিত হচ্ছে সনাতন সংবাদ মাধ্যম। 

 

একটা পত্রিকা চলে পত্রিকা বিক্রি ও বিজ্ঞাপনের টাকায়। দুটি প্রক্রিয়ায় পত্রিকার তথ্যমূল্য নির্ধারিত হয়। প্রতি ব্যবহারকারীর গড় আয় (Average Revenue per user-ARPU) এবং অন্যদিকে প্রতিহাজার দর্শকের জন্য বিজ্ঞাপনদাতাদের নিকট থেকে প্রাপ্ত আয় (Revenue per Mile-RPM)।  বাংলাদেশে ১২-১৬ পৃষ্ঠার একটা পত্রিকার কপি বিক্রি করে পায় ৫,১০, ১২ বা ১৫ টাকা। কিন্তু এক কপি পত্রিকার কাগজমূল্য ও পরিচালনা ব্যয় ৫০ বা ৬০ টাকা। কোন কোন পত্রিকার প্রতি কপির উৎপাদন ব্যয় আরো বেশি। 

 

গণমাধ্যমের সংকট মোকাবেলায় সনাতন সংবাদ অর্থনীতি আজ আর কাজ করছে না। সনাতন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গণমাধ্যম চালোনার ব্যবসা মডেল এখন বিশ্বে কাজ করছে না। ২০২১ সালে নিউওয়ার্ক টাইমসের ডিজিটাল ও মুদ্রণ গ্রাহকের নিকট থেকে আয় (প্রায় ১৪ লক্ষ ডলার) এবং বিজ্ঞাপন থেকে আয় ( পাঁচ লক্ষ ডলার) থেকে অনেক বেশি। বিজ্ঞাপন নির্ভর আয় ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। এদেশের সম্পাদক- ব্যবসায়ীগণ নতুন সৃজনশীল সংবাদ অর্থনীতির বিষয়টি এখনো অনুধাবন করতে পারছেন বলে মনে হয় না। সৃজনশীল পন্থা ও পথে যেতে ব্যর্থ হয়ে অনৈতিক পথে হাঁটছেন তারা।

 

বেঁচে থাকার জন্য অপেশাদার সংবাদ অর্থনীতি সৃজন করা হয়েছে, সংবাদকর্মীকে বিজ্ঞাপনকর্মী বানানো হচ্ছে। বিরুদ্ধ সংবাদকে হাতিয়ারও বানানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপন না দিলে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান হয়, সংবাদ হয়। বিজ্ঞাপন দিলে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সাধুবাবা বানানো হয়। এসব সাংবাদিকতাও নয়, সংকট মোকাবেলার পথও নয়। সাংবাদিকতার সংকট মোকাবেলায় নতুন সংবাদ অর্থনীতির পথ অনুসন্ধান করতে হবে। সাংবাদিকতায় উদ্ভাবন বাড়াতে হবে।

 

কনটেন্টকে king এ পরিণত করতে হবে। পঞ্চ-ই সাংবাদিকতা অথার্ৎ পরীক্ষামূলক সাংবাদিকতা (experimental  journalism), ব্যাখ্যামূলক সাংবাদিকতা (explanatory journalism), বাস্তব অভিজ্ঞতাসৃজনী সাংবাদিকতা (experiencial journalism), আবেগঘন সাংবাদিকতা (emotional journalism) এবং মিতব্যায়ী সাংবাদিকতার (economical journalism) চর্চা করে অর্থ উপার্জনের সৃজনশীল পথ ও পন্থা বের করতে হবে। আধেয় প্রতি অর্থ (paywall) অনুসন্ধান করতে হবে বা এক্ষেত্রে freemium পদ্ধতিও প্রয়োগ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে দু-একটি পত্রিকা শুরু করেছে অনলাইন সাবক্রিপশন। আধেয়ের paywall বা freemium পদ্ধতিতে যেতে হবে, শুধু বিজ্ঞাপন নির্ভর হলে হবে না। এসব কথা বলেছি আমি ২০১৬ সালে আমার প্রথম গ্রন্থ "সাংবাদিকতা অফলাইন অনলাইন" গ্রন্থে। 

 

প্রতিদিন বিশ্বে যখন কমপক্ষে একটি সংবাদপত্রের মৃত্যু হচ্ছে তখন বাংলাদেশে নতুন নতুন সংবাদপত্র হাজির হচ্ছে বাংলাদপশের সংবাদ জগতে। এটা অবশ্যই সাংবাদিকতার জন্য শুভলক্ষণ যদি তা পরিচালিত হয় সৎ সাংবাদিকতা করে। আর যদি একটা পত্রিকা watchdog না হয়ে petdog হয় এবং চাঁদাবাজির হাতিয়ার হয়, তাহলেও তা আর সাংবাদিকতা থাকে না, সাংঘাতিকতায় পরিণত হয়। অনেকে প্রোপাগান্ডা চালায় যে বঙ্গবন্ধু মাত্র চারটি পত্রিকা রেখে সকল পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তথ্যটি অপপ্রচার।

 

কারণ ১৬ জুন ১৯৭৫ তারিখের এক অধ্যাদেশে বলা হয় তখন দেশে  দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ ১২৪ টি বিভিন্ন ধরনের পত্রিকা বহাল ছিল। আজ ২০২৩ সাল। দেশে পত্রিকার সংখ্যা কত? ২৭ জুলাই ২০২৩ সরকারের ফিম্ম ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী  দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা ঢাকায় ২৭৭টি ও ঢাকার বাইরে ৩০৩টি। দৈনিক, সাপ্তাহিক ও অন্যান্য পত্রিকা মিলে বর্তমানে মোট পত্রিকার সংখ্যা ৭০৭টি। এসব পত্রিকা এই অধিদপ্তরের মিডিয়া তালিকাভুক্ত। মিডিয়া তালিকাভুক্ত মানে এসব পত্রিকা নিদির্ষ্ট ক্যাটাগরিতে সরকারী বিজ্ঞাপন পায়।

 

মিডিয়া তালিকাভুক্ত পত্রিকার বাইরেও শত শত পত্রিকা আছে।  এসব পত্রিকার নাম কয়জন জানেন? এতো পত্রিকা কেন? সবইকি watchdog হিসেবে কাজ করে নাকি petdog বা extortion collection dog হয়ে যায়? এসব উত্তর প্রকৃত সাংবাদিকদের ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধান করতে হবে। সমাধানের পথ ও পন্থা বের করতে হবে সাংবাদিকদের, গণমাধ্যম মালিকদের ও সরকারের নীতি নির্ধারকদের সম্মিলতভাবে। নতুবা সাংবাদিকতা জাদুঘরের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

 

লেখক: মাহামুদুল হক

শিক্ষক,  গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি)।