ঢাকা, ১৯ আগস্ট বুধবার, ২০২৬ || ৪ ভাদ্র ১৪৩৩
good-food
১১৫

সাত জোড়া তরুণ-তরুণীর যৌতুকবিহীন বিয়ে

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:৫৩ ৪ জুলাই ২০২৬  

সন্ধ্যা গড়াতেই একে একে অতিথিবৃন্দ ভিড় করতে থাকেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই লালমনিরহাট জেলা পরিষদ অডিটোরিয়াম কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। বর-কনের স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও আমন্ত্রিত অতিথিদের পদচালনায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সবার চোখ মঞ্চের দিকে। 

একে একে মঞ্চে ওঠেন সাতজন বর ও সাতজন কনে। তাদের ঘিরে শুরু হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। এ সময় শিল্পীরা পরিবেশন করেন রংপুর অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গীত। লোকসংগীতের সুরে মুখর হয়ে ওঠে অডিটোরিয়াম। করতালি, হাসি আর শুভকামনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় সাত জোড়া নবদম্পতির যৌতুকমুক্ত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা।

সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধ এবং যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে শুক্রবার রাতে যৌতুকবিহীন বিয়ের ওই ব্যতিক্রমী আয়োজন করে ‘আলোকিত লালমনিরহাট কমিটি’। জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত ওই যৌতুকবিহীন গণবিবাহ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের সাতজন বর ও সাতজন কনে এ আয়োজনে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করে ‘আলোকিত লালমনিরহাট কমিটি’।

নবদম্পতিদের একজন আলমগীর হোসেন বলেন, “যৌতুক ছাড়া বিয়ে করতে পেরে আমি গর্বিত। আমরা চাই সমাজ থেকে এই কুপ্রথা চিরতরে বিদায় নিক। যৌতুকবিহীন সংসারে পারস্পরিক সম্মান ও ভালোবাসা বেশি থাকবে বলেই আমি বিশ্বাস করি।”

তার স্ত্রী তামান্না খাতুন বলেন, “আমার বাবা-মাকে বিয়ের জন্য একটি টাকাও খরচ করতে হয়নি। এত সুন্দর আয়োজনে আমার বিয়ে হবে, তা কখনো ভাবিনি। আলোকিত লালমনিরহাটের এই উদ্যোগ আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে।”

আরেক বর সমর চন্দ্র রায় বলেন, “যৌতুকের কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে বাবা-মাকে অসহনীয় চাপের মধ্যে পড়তে হয়। যৌতুকবিহীন বিয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে সেই দুশ্চিন্তা অনেকটাই দূর হবে।”

সমরের স্ত্রী বিথী রানী বলেন, “আমার বিয়ে নিয়ে বাবা-মা খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু এখানে এসে কোনো আর্থিক চাপ ছাড়াই সম্মানের সঙ্গে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পেরেছি। যৌতুক ছাড়া সংসার শুরু করার আনন্দই আলাদা। সমাজের সব মেয়েই যেন এমনভাবে বিয়ে করতে পারে, এটাই আমার কামনা।”

বিথীর বাবা দীনেশ চন্দ্র রায় বলেন, “মেয়ের বিয়ের জন্য যৌতুকের টাকা জোগাড় করতে পারছিলাম না। খুব অসহায় লাগছিল। ‘আলোকিত লালমনিরহাট কমিটি’ আমাদের সেই দুশ্চিন্তা দূর করেছে। যদি সমাজে এমন আয়োজন নিয়মিত হতো, তাহলে কোনো বাবাকেই মেয়ের বিয়ে নিয়ে এত কষ্ট করতে হতো না। যৌতুক একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেয়। এই অভিশাপ সমাজ থেকে দূর হওয়া উচিত।”

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, “যৌতুক আমাদের সমাজের অন্যতম বড় সামাজিক ব্যধি। এর কারণে অসংখ্য নারী নির্যাতনের শিকার হন, অনেক পরিবার ভেঙে যায়, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। যৌতুকমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আলোকিত লালমনিরহাটের এই উদ্যোগ শুধু সাতটি বিয়ে নয়, এটি সমাজের প্রতি একটি শক্তিশালী বার্তা।”

তিনি আরও বলেন, “যখন একটি পরিবার যৌতুকমুক্ত হয়, তখন সম্পর্কের ভিত্তি হয় ভালোবাসা ও সম্মানের। আমরা চাই লালমনিরহাট থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক। যৌতুকমুক্ত পরিবারই পারে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে।”

বিচিত্র বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর