ঢাকা, ২৪ নভেম্বর মঙ্গলবার, ২০২০ || ১০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭
good-food
১০৯

সেই হলুদ সাংবাদিকতাটা যেন না থাকে: প্রধানমন্ত্রী

লাইফ টিভি 24

প্রকাশিত: ১৯:১৭ ২৫ অক্টোবর ২০২০  

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নীতিহীন সাংবাদিকতা কোনও দেশের কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না উল্লেখ করে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেছেন, জাতিকে বিভ্রান্ত করতে পারে-এমন কোনও সংবাদ পরিবেশন করবেন না। এমন রিপোর্ট করবেন না, যেটা মানুষের মধ্যে বা সমাজে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে, মানুষ বিপথে যায়। সেদিকে আপনাদের বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে আমি অনুরোধ জানাচ্ছি।

 

রোববার নিজের সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটি’র (ডিআরইউ) রজতজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে দেয়া প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। 

 

প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিক সমাজের উদ্দেশে বলেন, আপনাদের বলব, আপনারা দায়িত্বশীলতা নিয়ে, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, মানুষের কল্যাণের কথা চিন্তা করে কাজ করবেন। কারণ, এই রিপোর্টগুলো অনেক সহযোগিতা করে। বিভিন্ন পত্রিকায় অনেক সময় বিভিন্ন ঘটনা আসে, সেসব রিপোর্ট পড়ে সাথে সাথে আমরা অনেক অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। আবার অন্যায় ঘটনা ঘটলে সেটার প্রতিকার করতে পারি। অনেক দোষীকে শাস্তি দিতে পারি এবং দিয়ে থাকি। 

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক সময় আপনারা অনেক ঝুঁকি নিয়ে রিপোর্ট করেন, সেজন্য আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

 

নীতিহীন সাংবাদিকতা পরিহারের জন্য জাতির পিতার এক ভাষণের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সাংবাদিকতায় আমরা নিরপেক্ষতা চাই, বাস্তবমুখিতা চাই এবং দেশ ও জাতির প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে যেন এটা হয়, সেরকমই আমরা চাই। নীতিহীন সাংবাদিকতা কোনও দেশের কল্যাণ আনতে পারে না। বরং ক্ষতি করে।

 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবাদপত্র হচ্ছে সমাজের দর্পণ। সেই সমাজের দর্পণ যেটা হবে, সেটা চিন্তা চেতনায় এবং দেশপ্রেমে যেন উদ্বুদ্ধ হয়। তাদের ভেতর মানবতাবোধ যেন থাকে। তারা যেন মানুষের কল্যাণে কাজ করেন।

 

অতীতের উদাহারণ টেনে তিনি বলেন, একসময় আমাদের দেশে ছিল যতই দুর্নীতি হোক, যতই অন্যায় হোক সেগুলোকে ধামাচাপা দেয়া হতো। আর সমস্যাগুলো-ঐ যে কথায় বলে-কার্পেটের তলে লুকিয়ে রাখা। আমাদের সরকারে কিন্তু আমরা তা করছি না।

 

সরকার প্রধান বলেন, যেখানে যা রিপোর্ট হচ্ছে বা আমরা খবর পাচ্ছি, কোথাও কোনও দুর্নীতি বা অন্যায় হলে, আমরা কিন্তু এটা চিন্তা করি না- এর পেছনে আমাদের দল জড়িত, এখানে সরকারের বদনাম কিংবা দলের বদনাম হবে। আমরা চিন্তা করি, এখানে অন্যায় হয়েছে সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

তবে এটা নিতে গেলে হয় অনেক সময় দোষটা আমাদের ওপর এসে পড়ে। অনেকে বলে আওয়ামী লীগ সরকারই বুঝি দুর্নীতি করছে, ঘটনা তা নয়। কারণ, দুর্নীতির বীজ বপণ করে গেছে ’৭৫ এর পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সরকারগুলো, বলেন তিনি।

 

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, প্রথমে জিয়াউর রহমান, এরপর এরশাদ, পরে খালেদা জিয়া। তারা দুর্নীতিকে কেবল প্রশ্রয়ই দেয়নি বরং নিজেরাও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিল এবং একে লালন-পালনই করে গেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারে আসার পর আমরা কিন্তু সেটা করছি না।

 

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আওয়ামী লীগ যেখানে দুর্নীতি পাচ্ছে, সে দলের যত বড় (নেতা), কর্মী হোক যেই হোক, আমরা কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি। হ্যাঁ, তাতে অবশ্য আমাদের বিরোধীদের বলার বা লেখার সুযোগ হচ্ছে যে-আওয়ামী লীগ দুর্নীতি করছে। কিন্তু এই কথাটা কেউ চিন্তা করছে না, আওয়ামী লীগ দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না। সে যেই হোক তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রী নিজেকে সাংবাদিক পরিবারেরই সদস্য উল্লেখ করে বলেন, জাতির পিতা নিজেও জীবনে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সাপ্তাহিক মিল্লাত এবং ইত্তেহাদ পত্রিকায় এবং পরে দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিকতা করেন। নতুন দিন নামে আওয়ামী লীগের জন্য নিজেও একটি পত্রিকা বের করেন।

 

বঙ্গবন্ধু সাপ্তাহিক বাংলার বাণীও বের করেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সাংবাদিকতার সঙ্গে তার (বঙ্গবন্ধু) সবসময় একটা সম্পর্ক ছিল। সেদিক থেকে দাবি করতে পারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সন্তান হিসেবে আমি নিজেও সাংবাদিক পরিবারেরই একজন।

 

প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশ পুনর্গঠনকালে জাতির পিতার সংবাদপত্র শিল্পেরও পুনরুজ্জীবনের তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ’৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হওয়ার পর তারা অনেক পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দেয় এবং প্রত্যেকটিতে হামলা চালায়।

 

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটা অবস্থা হয়, এসব পত্রিকা চালানো সংবাদপত্র মালিকদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। তখন বঙ্গবন্ধুই উদ্যোগ নিয়ে সাংবাদিকদের সরকারি চাকরি দিয়েছিলেন। সরকারি বেতন সবাই পেতেন। সরকারি চাকরির মর্যাদাটা জাতির জনক দিয়েছিলেন।

 

প্রোপাগান্ডার রাজনীতিতে সেটা অন্যভাবে দেখা হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেটাকে অন্যভাবে দেখা হয়, উনি সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছেন। ঘটনা কিন্তু তা নয়, তখন কারো (সংবাদপত্র মালিক) সাংবাদিকদের বেতন দেয়ার মতো বা সংবাদপত্র চালানোর আর্থিক সেই ক্ষমতা ছিল না। সেই দায়িত্বটা জাতির পিতাই নিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য এটা আমার নিজের দেখা যারা সরকারি চাকরি পেয়েছিল, তারাই বেশি সমালোচনা করতো।

 

বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন হওয়ার ৯ মাসের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন করেন, এর ৩৯ অনুচ্ছেদে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উল্লেখ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট লিখেছেন-চিন্তা, বিবেক এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে।

 

শেখ হাসিনা বলেন, এই চিন্তা, বিবেক এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাটা ভোগ করতে গেলে অপরের প্রতি যে দায়িত্ববোধ, দেশের প্রতি যে দায়িত্ববোধ, রাষ্ট্রের প্রতি যে দায়িত্বরোধ সেই দায়িত্বরোধটাও থাকতে হবে।

 

প্রধানমন্ত্রী এসময় সংবাদ শিল্পের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ উল্লেখ করে বলেন, জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা এবং গণমাধ্যম কর্মীদের চাকরির সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা সরকার প্রণয়ন করেছে। যা আগে কখনও ছিল না। তাছাড়া স্বাধীন সম্প্রচার কমিশনও সরকার গঠন করে দিয়েছে। এই সম্প্রচার কমিশন গঠনের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নেরও কাজ চলছে। যাতে বাস্তবমুখী কাজ হয় এবং অহেতুক মানুষকে বিভ্রান্ত করে সেই হলুদ সাংবাদিকতাটা যেন না থাকে। আর অনলাইনেও মানুষের কল্যাণমুখী দৃষ্টি যেন থাকে এবং সেই ধরনের সাংবাদিকতাই যেন হয়।

 

তিনি বলেন, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১২ হাজার ২৪১ জন সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। গত ১২ বছরে প্রেস ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে ৩০ হাজারের অধিক সাংবাদিককে প্রশিক্ষণসহ মফস্বল সাংবাদিকদের জন্য দেশের তৃণমুল পর্যায় পর্যন্ত প্রশিক্ষণ কাযক্রম সম্প্রসারিত করা হয়েছে।

 

শেখ হাসিনা বলেন, পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাটা যেন একটা উচ্চাসন সম্পন্ন হয়, মর্যাদা সম্পন্ন হয়; সেজন্যই সরকার এসব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে। যাতে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব হয়। সেজন্যই সংবাদপত্রকে শিল্প হিসেবেই তার সরকার ঘোষণা করেছে।

 

তিনি অতীতে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আগে মামলা হলেই চট করে সাংবাদিকদের গ্রেফতার করা হতো। আমরা কিন্তু সেক্ষেত্রেও পেনাল কোড সংশোধন করেছি। যাতে সাংবাদিকদের হয়রানির সম্মুখীন হতে না হয়।