ঢাকা, ২৭ জুন বৃহস্পতিবার, ২০১৯ || ১৪ আষাঢ় ১৪২৬
LifeTv24 :: লাইফ টিভি 24
১৬৮

প্যারিস-হেলেনের অমর প্রেম কাহিনী

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

প্রকাশিত: ১৯:৪৭ ১৪ মার্চ ২০১৯  


১। প্যারিস । ফ্রান্সের রাজধানী । গেল বছর ফুটবলে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে দুরন্ত  স্রোতোবহার মতো ভেসেছে । অনেকদিন  আগে থেকেই  শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতির মিলনমেলার আনন্দপুরী  হিসেবে এই নগরীর খ্যাতি  বিশ্বজোড়া । এর সাথে মণিকাঞ্চন হিসেবে নতুন করে যোগ হয়েছে ফুটবলের আনন্দ । স্থাপত্যশিল্পে বিশ্বের বিস্ময় আইফেল টাওয়ার যুগে যুগে অসংখ্য পর্যটককে এই তিলোত্তমা নগরীতে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে । পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধে হিটলার-মুসোলিনী বাহিনী এই নগরীকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। পরিশ্রমী , ঐতিহ্যপ্রেমী  প্যারিসবাসী যুদ্ধের পরে নগরীটিকে প্রায় আগের আদলে ফিরিয়ে আনে ।

২। এই নগরীর ইতিহাস অনেক পুরোনো। এই নগরীর নামকরণ নিয়ে নানা ‘মিথ ‘ আছে । তবে ‘প্যারিস’ শুধু ফ্রান্সের রাজধানীর নামই নয় অন্ধ গ্রিক কবি হোমারের অমর ধ্রুপদী সাহিত্যকর্ম ইলিয়াডের অন্যতম এক ‘চরিত্র’ । এই গল্পের  পটভূমি ‘ট্রয় নগরী’। সর্বকালের অন্যতম সেরা সুন্দরী ‘হেলেন অব  ট্রয়’ এর  নাম আমরা সবাই কমবেশী জানি । হোমারের সেই গল্প গাঁথায় ‘প্যারিস’ চরিত্রকে ঘিরে পরকীয়া প্রেম , শৌর্য  -বীরত্ব, দেশপ্রেমের মমত্বমাখা যে হৃদয় ছোঁয়া ট্রাজেডি গড়ে উঠেছিল প্যারিসকে নিয়ে এই লেখায় সেটি ফুটিয়ে তুলবার চেষ্টা করা হয়েছে ।

৩। যীশু খৃস্টের জন্মের বহুপুর্বেই যেখানে বর্তমানে তুরস্ক সেখানেই ছিল ট্রয় নগরী । রাজা প্রায়াম  তীক্ষ্ণ মেধা আর প্রজ্ঞায় ট্রয়ের শাসন করতেন । সুন্দরী রানী হেকুবার গর্ভে হেক্টরসহ অনেক পুত্র কন্যার জন্ম হয় । রানী আবার সন্তান সম্ভবা হলেন । রাজা স্বপ্ন দেখলেন রানীর গর্ভ হতে জ্বলন্ত এক মশাল বেরিয়ে এলো । সেটি সারা দেশে আগুন হয়ে সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দিল । ভীত রাজা স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানবার জন্য রাজ্যের সব বিখ্যাত সব জ্যোতিষীদের ডাকলেন । সব রাজ জ্যোতিষী একমত হয়ে বলল , ‘যে রাজকুমারের জন্ম হতে যাচ্ছে সে বড় হলে ট্রয় সাম্রাজ্যের ধ্বংসের কারণ হবে । বিদেশী শত্রুরা এই নগরী একদিন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেবে । শুধু সামরিক বাহিনীই নয় , বেসামরিক লোকজন এমন কি নারী-শিশুকে হত্যা করবে । রাজাসহ সবাই ভীত হয়ে পড়লেন । প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী যথাসময় শিশুটি ভুমিষ্ট হল । দেবশিশুর মতো দিব্যকান্ত, সৌম্য দর্শন , অপরুপ অঙ্গ সৌষ্ঠবে সবাই মোহিত হয়ে গেল । শিশুটির নাম রাখা হল ‘প্যারিস’। রাজার ইচ্ছে সত্বেও রানী নিজ সন্তানকে হত্য করতে চাইলেন না । তিনি বিশ্বস্ত এক লোককে দিয়ে প্যারিসকে বনের ধারে ফেলে আসলেন । রাজাকে তিনি বোঝালেন সেখানে কোনো বন্য পশু শিশুটিকে খেয়ে ফেলবে

৪। কোনো এক সহৃদয় ব্যক্তি প্যারিসকে কুড়িয়ে পেলেন । পুত্রস্নেহে তাকে বড় করতে লাগলেন ।প্যারিসের শরীরে রাজরক্ত । অল্প সময়ের মধ্যে তার মেধা , বুদ্ধিদীপ্তির কথা ছড়িয়ে পড়ল ।ঘোড়দৌড় , অস্ত্র পরিচালনা , তাত্ত্বিক পড়াশুনায় সবাইকে সে ছাড়িয়ে গেল । যৌবন প্রাপ্ত হলে এক প্রিয়দর্শণী জলপরীর সাথে তার বিয়ে হলো। দুই সন্তানের জনক হলেন প্যারিস । সুখেই তাদের দিন কাটছিল ।

৫। এবার গল্পের পট কিছুটা ভিন্ন । দেবতাদের ভোজসভায় সকল দেবদেবী আনন্দ ফুর্তিতে মত্ত ।এমন সময় ঝগড়ার দেবী সেখানে এসে হাজির । তাকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি এই অভিযোগে তিনি একটি সোনার আপেল সকল দেবীর উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিল । সকল দেবীরাই নিজেকে সবচেয়ে সুন্দরী দাবী করে আপেলটি চাইলেন । ঝগড়ার চূড়ান্ত  পর্যায়ে তিন দেবী তাদের দাবীতে অটল রইলেন ।তারা হেরা , এথেনী এবং আফ্রোদিতি । সম্পর্কে হেরা মা , বাকী দুইজন তাদের কন্যা । দেবীরা চির যৌবনপ্রাপ্তা । তাই বয়সের কোনো ছাপ পড়ত না । কে এই তিনজনের মধ্যে সেরা সুন্দরী বিচার করবে এমন সৌন্দর্য বিশ্লেষক এবং নিরপেক্ষ কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না । শেষে দেবীরা সিদ্ধান্ত নিল মর্তের প্যারিসই হবে সেই বিচারক ।

৬। তিন দেবী প্যারিসের কাছে এলো । বলল, তোমার দৃষ্টিতে যে সবচেয়ে সুন্দরী তুমি তাকে আপেলটি দাও ।  তিনজনের অপরুপ রুপে  বিভ্রান্ত প্যারিস ঠিক করতে পারছিল না কে সবচেয়ে বেশী সুন্দরী । এবার প্রলোভনের পালা । জ্ঞানের দেবী হেরা বললেন , আপেলটি তাকে দিলে পৃথিবীর সব জ্ঞান প্যারিসের হাতে চলে আসবে । শিল্প –সাহিত্য –সংস্কৃতি –স্থাপত্য – চিকিৎসা বিজ্ঞানে সে এককভাবে বিশ্বের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদা পাবে । ক্ষমতার দেবী  এথেনী বলল , আপেলটি তাকে দিলে প্যারিস সকল ক্ষমতা অধিকারী হবে । তার সেনাদল যেখানে যাবে সেখানেই বিজয় লাভ করবে একের পর এক দেশ দখল করে সে হবে রাজাদের রাজা । সবশেষে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি হেসে বলল , আপেলটি তাকে দিলে তামাম দুনিয়ার সেরা সুন্দরী ‘হেলেন’ এর প্রেম সে পাবে । এই কথায় প্যারিস পুরোপুরি বিভ্রান্ত হয়ে গেল । কাণ্ডজ্ঞানহীণ হয়ে আপেলটি আফ্রোদিতির হাতে তূলে দিল । হেরা এবং আথেনী ক্ষিপ্ত হয়ে ভবিষ্যতে সুযোগ বুঝে প্যারিসের ক্ষতি করবে বলে শাসিয়ে গেল। 

৭। এ দিকে প্যারিসের খ্যাতির কথা রাজা প্রায়ামের কানে পৌঁছুল । তাকে রাজপ্রাসাদে ফিরিয়ে আনা হলো । ঘটনা চক্রে জানা গেল প্যারিসই রাজার হারিয়ে যাওয়া আরেকপুত্র । সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে ভয়াবহ সেই দৈববানী সবাই যেন ভুলেই গেল ।

৮।এবার এই গল্প একেবারে অন্যদিকে মোড় নিল । ‘হেলেন’ গ্রিকরাজ মেনেলাউসের স্ত্রী । ট্রয় থেকে রাজ অতিথি হয়ে প্যারিস গ্রিকে এল । তার আতিথ্য হল মেনেলাউসের রাজপ্রাসাদে । কিছুদিন পর মেনেলাউস রাজকর্মে অন্যদেশে গেলে হেলেন স্বেচ্ছায় প্যারিসের সাথে সাগর পারি দিয়ে ট্রয়ে ফিরে এল । সুন্দরী ছেলেবৌয়ের মুখ দেখে রাজা প্রায়াম নৈতিকতার কথা ভুলে তাকে সাদরে গ্রহণ করে নিলেন ।

৯। দেশে ফিরে রাজা মেনেলাউস যখন দেখলেন , তার স্ত্রীকে প্যারিস  চুরি  করে নিজ দেশে নিয়ে গেছে তখন তিনি  ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন । প্রতিবেশী অনেক দেশের রাজন্যবর্গ তাদের সাথে যোগ দিলেন । অনেক ঘটনার ঘনঘটা ঘটিয়ে সাগর পাড়ি দিয়ে মেনেলাউসের দল ট্রয়ের প্রান্তে পৌঁছুল । আগেই খবর পেয়ে প্রায়ামের বাহিনী বিশাল রণসাজে সজ্জিত হয়ে গ্রিক বাহিনীর সাথে সন্মুখ সমরে লিপ্ত হল । ট্রয় নগরী বিশাল উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা । যুদ্ধহত প্রাচীরের বাহিরে । দিনশেষে ট্রয়ের সেনারা প্রাচীরের ভিতরে ঢুকে যেত । একদিন-দুদিন করে টানা ১০ বছর যুদ্ধ চললেও কোনো পক্ষেই জয়-পরাজয়ের নিশানা দেখা গেল না । শেষে ‘ইউলিসিস’ নামের জ্ঞানী এক সেনাপতির বুদ্ধিতে গ্রিকরা কাঠের বিশাল বড়  এক ঘোড়া বানিয়ে সেখানে লুকিয়ে থাকলো ।পরদিন ট্রয়ের যোদ্ধারা গ্রিক বাহিনীর বদলে ঘোড়া দেখতে পেল । তারা কাঠের ঘোড়াটিকে প্রাচীরের ভিতরে নিয়ে এল । গভীর রাতে ক্লান্ত ট্রয়ের সৈন্যবাহিনী যখন ক্লান্তিতে ঘুমে মগ্ন তখন গ্রিকরা অপ্রস্তুত ট্রয় বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে একের পর এক সবাইকে কচুকাটা করল । শুধু প্যারিস, রাজা প্রায়াম, সামরিক সদস্যরাই নয় নারী শিশুরাও বাদ গেল না । প্রতিশোধে উন্মত্ত গ্রিকরা ট্রয় নগরীকে পুড়িয়ে ধুলিস্মাত করে দিল । এভাবেই জ্যোতিষীদের দৈববানী ফলে গেল ।

১০।  হোমার ছিলেন অন্ধ এক চারণ কবি । মুখে মুখে বলে যাওয়া তাঁর এই অমর গল্পগাঁথা  নিয়ে রচিত  ‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডেসী’ আজও বিশ্ব ধ্রুপদ সাহিত্যের এক অনন্য মাইলফলক । বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের ভিন্নমত থাকলেও কখনই ধরে নেয়া হয় না যে, হোমারের সেই ট্র্যাজেডিমাখা চরিত্রের নামেই লাখো পর্যটকের পছন্দের নগরী প্যারিসের নামকরণ করা হয়েছে । তাই ‘প্যারিসের গল্প’ বলতে দুটি গল্পকে বোঝায় । একটি-হোমার রচিত ইলিয়াডের অন্যতম চরিত্র প্যারিস আর অন্যটি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের গল্প । প্রিয় পাঠক , আজ প্রথমটি হল । দ্বিতীয় গল্প – ‘ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস সেটি নিশ্চয়ই আরেকদিন হবে ।

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ,

উপ অধিনায়ক,

আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটরী


এই বিভাগের আরো খবর